একাধারে কবি, প্রাবন্ধিক, অনুবাদক এবং ধ্রুপদি সাহিত্যের অধ্যাপক হিসেবে বিশ্বজুড়ে পরিচিত অ্যান কারসন। তাঁর কাব্যিক সৃষ্টিতে ঐতিহ্য ও আধুনিকতার এক অনন্য মেলবন্ধন দেখা যায়। বহুস্তর অর্থবহ তাঁর কবিতাগুলো কোনো নির্দিষ্ট সংজ্ঞায় সীমাবদ্ধ থাকে না। শব্দের প্রচলিত অর্থকে অবলীলায় ভেঙে নতুন মাত্রা দেওয়ার ক্ষমতা তাঁর। এই উদ্দেশ্যে তিনি বেছে নেন অলংকারহীন, সহজ ও নির্ভার ভাষা এবং রূপক। অনেক ক্ষেত্রে তিনি গদ্য ও কবিতার মধ্যকার সীমারেখাকে মুছে দেন, যা তাঁর কবিতাকে এক ব্যাখ্যাহীন অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দেয়। এই বিশেষ বৈশিষ্ট্যের কারণে তাঁর কাজকে ‘সহজতম ভাষায় লেখা দুরূহতম কবিতা’ হিসেবে অভিহিত করা হয়। বিপুল পাঠকনন্দিত এই কবি অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মাননা পেলেও নিজের ভেতরে এক ধরণের ‘বৈষ্ণব-বিনয়’ লালন করেন। এমনকি নিজেকে লেখক হিসেবে দাবি করতেও তিনি দ্বিধাবোধ করেন। এই বিষয়ে তিনি বলেন, “এখনো নিজেকে লেখক বলতে পারব কি না জানি না। শুধু জানি, আমাকে কিছু একটা তৈরি করতেই হয়।” অ্যান কারসনের এই কবিতাগুলো বাংলায় অনুবাদ করেছেন জুয়েল মাজহার।

অনূদিত কবিতাগুলোর মধ্যে ভালোবাসার সুখানুভূতি নিয়ে লেখা অংশে ফুটে উঠেছে—
“ঘুম থেকে জেগেই আমি তোমার কথা ভাবি, দিনের পর দিন;বাতাসে রত্নের মতন কে যেন গুঁজে দিয়ে গেছে পাখির ডাক।”

মৃত্যু নিয়ে তাঁর উপলব্ধিতে লেখা আছে—
“হাত দুটোকে বুকের ওপর আড়াআড়ি রেখে ঘুমাতে যাইআমার হাত দুটোকে ঠিক এভাবেই সাজিয়ে রাখবে ওরা;দেখে মনে হবে, উড়ে যাচ্ছি নিজের ভেতরে”

‘শুকনো-ডাল-ভেঙে-পড়া শব্দের শহর’ কবিতায় ফুটে উঠেছে এক ভিন্ন রূপ—
“ওদের মুখগুলোকে আমার মনে হতো ছুরি;ওগুলো দিয়ে এভাবেই ওরা আমাকে নিশানা বানিয়েঅপেক্ষা করত।শিকারি সে-ই, যে কান পেতে শোনে;শিকারের নেশায় বুঁদ হয়ে সে তার নিজেরঅস্ত্রটি বের করে আনে আর বিদ্ধ করেনিজেরই শরীরে”

বিখ্যাত চিত্রশিল্পী ভ্যান গঘকে নিয়ে তাঁর লেখায় উঠে এসেছে এক অদ্ভুত দৃশ্যপট—
“আমি মদ খাই হলদে-রং আকাশটাকে, হলদে-রং বিশাল আকাশটাকে বুঝতে চাই বলে—বলেছিলেন ভ্যান গঘ। পৃথিবীর দিকে যখন তিনি চোখ মেলে তাকাতেন, দেখতে পেতেন সেই পেরেকগুলোকে, যেগুলো বস্তুর গায়ে আটকে রাখে রং। আর তিনি দেখতে পেতেন, পেরেকগুলো যন্ত্রণায় কাতর।”

পেছনপানে হাঁটার বিষয়ে তাঁর স্মৃতিচারণ—
“মা আমাদের পেছনপানে হাঁটতে বারণ করতেন। তিনি বলতেন,মৃতেরাই ওভাবে হাঁটে। তিনি কোত্থেকে পেয়েছিলেন এমন ধারণা?হয়তো-বা বাজে কোনো অনুবাদ থেকে। মৃতেরা তো আর পেছনপানেহাঁটে না, তবে তারা হেঁটে চলে আমাদের পেছনে পেছনে।তাদের ফুসফুস নেই, সে কারণে ডাকতে পারে না তবে তারা চায়যেন আমরা তাদের দিকে ফিরে তাকাই। তারা, অনেকেই,হয়েছিল প্রেমের শিকার।”

বিমানের উড়ান শুরুর অনুভূতি নিয়ে তিনি লিখেছেন—
“জানো তো, ভাবছি হয়তো একেই বলে প্রেম যা দুহাত তুলে ছুটে আসছে আমারজীবনের দিকে চেঁচিয়ে বলছে, ‘চলো এটা কিনে ফেলি, কী সস্তা!’”

আশ্রয় বিষয়ে তাঁর ভাবনাগুলো এভাবে প্রকাশিত হয়েছে—
“দেয়ালে মাছের হৃৎপিণ্ড দিয়ে লেখা যায়, কেননা এতে রয়েছে ফসফরাস। এটা তারা খায়; নদীর ঢাল বরাবর এ রকম ঝুপড়িঘর আছে। এ কথা লিখছি, তোমার কাছে নিজেকে যতটা সম্ভব ভুলভাবে তুলে ধরার ছলে। তাতে লেখা—‘চলে যাবার সময় দরজাটা বদলে দিয়ে যেয়ো’ এবার তুমিই বলো, এ কথা কতটা ভুল। এটা কতক্ষণ ধরে জ্বলজ্বল করতে থাকে। বলো আমাকে।”

‘কনে-দেখা শহর’ কবিতায় ফুটে উঠেছে এক নিঃসঙ্গ দুপুর—
“দিনের আলোর কালোয় ঝুলছেভেতরে-মানুষহীন ঠান্ডা, ঝলমল ওভারকোটের মতো—‘দাবিদার’ দুপুরটি আমারই পথ চেয়ে ছিল।”

সবশেষে আত্মসুখবাদ বিষয়ে তাঁর গভীর উপলব্ধিতে লেখা—
“সৌন্দর্য আমাকে আশাহত করে। কেন করে, তাতে আমার কিছুযায় আসে না; আমি স্রেফ পালিয়ে যেতে চাই। প্যারিস শহরটিরদিকে তাকালেই ইচ্ছে করে, একে দু-পায়ে পেঁচিয়ে ধরে থাকি।তোমাকে নাচ করতে দেখলে, নিথর সাগরে ভেসে চলা একলানাবিকের মতো মনে মমতাহীন বিশালতার অনুভব জাগে; গোলপিচফলের মতো কামনারা সারা রাত ফলে ওঠে আমার ভেতরে;যা কিছুই টুপ করে পড়ুক, আমি সেসব আর যাই না কুড়াতে।”