লাল গ্রহ মঙ্গল নিয়ে মানুষের কৌতূহল দীর্ঘদিনের। এই গ্রহের আকাশে রহস্যময় দানবীয় মেঘের আবির্ভাব এবং তা দ্রুত মিলিয়ে যাওয়ার কারণ উদঘাটনে দীর্ঘ সময় ধরে গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছিলেন বিজ্ঞানীরা। অবশেষে ফ্রান্সের সোরবন ইউনিভার্সিটির একদল বিজ্ঞানী এই রহস্যের সমাধান করেছেন। তাঁদের দাবি, মঙ্গল গ্রহের পাতলা বায়ুমণ্ডল এবং কিছু অদ্ভুত ভৌত প্রক্রিয়ার কারণেই এই মেঘের সৃষ্টি ও দ্রুত বিলুপ্তির ঘটনা ঘটে।
গবেষকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলের অন্যতম বড় রহস্য ছিল সেখানকার বিশাল আকৃতির মেঘ। ২০১৮ সালে গ্রহটির ২০ কিলোমিটার উচ্চতার আর্সিয়া মন্স আগ্নেয়গিরির পাশে এই বিশেষ মেঘ শনাক্ত করা হয়। সাধারণত বসন্ত ও শরৎকালে প্রতিদিন সকালে এই মেঘের জন্ম হয় এবং তা দ্রুত ১ হাজার ১২০ মাইল পর্যন্ত বিস্তৃত হয়ে মুহূর্তের মধ্যেই অদৃশ্য হয়ে যায়। প্রচলিত কোনো বৈজ্ঞানিক নিয়মের সাথে এই মেঘের আচরণের মিল না থাকায় বিজ্ঞানীরা একে 'আর্সিয়া মন্স ইলংগেটেড ক্লাউড' বা 'এএমইসি' (AMEC) নামে অভিহিত করেছেন।
সোরবন ইউনিভার্সিটির বিজ্ঞানী জর্জ হার্নান্দেজ–বের্নাল জানান, কম্পিউটার মডেলিংয়ের মাধ্যমে পদার্থবিদ্যার বিশেষ কিছু নিয়ম প্রয়োগ করে এই রহস্য ভেদ করা সম্ভব হয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন যে, পদার্থবিদ্যার এই নিয়মগুলো সাধারণত তাত্ত্বিক হিসেবেই গণ্য করা হয় এবং প্রকৃতিতে এর বাস্তব অস্তিত্ব খুব একটা দেখা যায় না। তবে কম্পিউটারের সিমুলেশনে এই বিশেষ তত্ত্বটি যুক্ত করার পর কাঙ্ক্ষিত এএমইসি মেঘের আকৃতি তৈরি হতে দেখা যায়। পৃথিবীসহ অন্য কোনো গ্রহের বায়ুমণ্ডলে এর আগে এমন ঘটনার প্রমাণ পাওয়া যায়নি। পৃথিবীতে সাধারণত 'হেটেরোজেনিয়াস নিউক্লিয়েশন' প্রক্রিয়ায় মেঘ তৈরি হয়, যেখানে জলীয় বাষ্প বায়ুমণ্ডলে ভাসমান ধূলিকণার ওপর ঘনীভূত হয়। কিন্তু মঙ্গলের ক্ষেত্রে এই প্রচলিত নিয়মটি কার্যকর হয় না।
'নেচার জিওসায়েন্স' সাময়িকীতে প্রকাশিত গবেষণাপত্রে বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, এএমইসি মেঘের ক্ষেত্রে পানির ফোঁটা কোনো বাহ্যিক কণার সাহায্য ছাড়াই সরাসরি ঘনীভূত হয়। বিজ্ঞানী জর্জ হার্নান্দেজ–বের্নাল এই প্রক্রিয়াটিকে “হোমোজেনিয়াস নিউক্লিয়েশন” বলে অভিহিত করেছেন। তাঁর মতে, “বায়ুমণ্ডলে কোনো মধ্যবর্তী ধাপ ছাড়াই জলীয় বাষ্প সরাসরি বরফ কণা বা মেঘে পরিণত হয়।” গবেষণায় দেখা গেছে, আর্সিয়া মন্স আগ্নেয়গিরির ওপর দিয়ে বাতাস বয়ে যাওয়ার সময় একটি শক্তিশালী তরঙ্গের সৃষ্টি হয়। এই তরঙ্গ আর্দ্র বাতাসকে অত্যন্ত দ্রুত গতিতে কয়েক মাইল ওপরে টেনে তোলে। এর ফলে বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রা মাত্র ১০ মিনিটের মধ্যে ৫৪ ডিগ্রি ফারেনহাইট বা ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত হ্রাস পায় এবং আপেক্ষিক আর্দ্রতা চরম পর্যায়ে পৌঁছে যায়।