প্রতিবছরই বাড়ছে প্রবাসী শ্রমিকদের মৃত্যুর সংখ্যা। সাধারণত তরুণ এবং কর্মক্ষম ব্যক্তিরাই প্রবাসের শ্রমবাজারে কাজ করতে যান। এই বাস্তবতায় বিভিন্ন দেশ থেকে গড়ে প্রতিদিন ১৪টির বেশি প্রবাসী শ্রমিকের মরদেহ দেশে ফিরে আসার ঘটনাকে কোনোভাবেই স্বাভাবিক হিসেবে গণ্য করা যায় না। পাশাপাশি, প্রবাসী শ্রমিকদের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে যে দীর্ঘসূত্রতা বা কালক্ষেপণ করা হয়, তা অত্যন্ত অগ্রহণযোগ্য।

ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের তথ্যের ওপর ভিত্তি করে মুক্তকণ্ঠ জানাচ্ছে, ২০১৮ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত গত পাঁচ বছরে দেশে মোট ১৮ হাজার ১৬৬টি মরদেহ এসেছে। এর অর্থ দাঁড়ায়, গড়ে প্রতিবছর দেশে ফিরে এসেছে ৩ হাজার ৬০০ জনের মরদেহ। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মাত্র ৯ মাসে প্রবাসী শ্রমিকের মরদেহ এসেছে ৪ হাজার ৬০টি। এই পরিসংখ্যানই স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, প্রবাসে বাংলাদেশিদের মৃত্যুর হার কতটা আশঙ্কাজনকভাবে ঊর্ধ্বমুখী।

প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুসারে, মরদেহের সঙ্গে আসা কাগজপত্রে ৬৬-৭০ শতাংশ ক্ষেত্রে মৃত্যুর কারণ হিসেবে 'স্বাভাবিক মৃত্যু' উল্লেখ করা হয়। বাকি ৩০-৩৪ শতাংশ ক্ষেত্রে দুর্ঘটনা বা অন্যান্য কারণ উল্লেখ করা হয়। তবে অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক বিষয় হলো, কর্মীরা যে দেশে মৃত্যুবরণ করেন, সেই দেশ মৃত্যুর কারণ হিসেবে যে তথ্য প্রদান করে, তা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বাংলাদেশের পক্ষ থেকে যাচাই করা হয় না।

বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিবছর ২৩-২৪ লাখ তরুণ দেশের শ্রমবাজারে যুক্ত হচ্ছেন। এর মধ্যে ১২-১৩ লাখ তরুণের কর্মসংস্থান দেশের ভেতরেই হয়। বাকি তরুণদের জীবিকার তাগিদে প্রবাসে পাড়ি জমাতে হয়। আনুষ্ঠানিক পথে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স বৈদেশিক মুদ্রার ভান্ডারকে শক্তিশালী রাখছে। এছাড়া অনানুষ্ঠানিক পথেও তাঁরা বিপুল পরিমাণ অর্থ দেশে পাঠাচ্ছেন। ফলে দেশের অর্থনীতির চাকাকে সচল রাখতে যাঁরা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন, তাঁদের প্রতি এমন অবহেলা কোনোভাবেই কাম্য নয়।

বাংলাদেশের সবচেয়ে বেশি শ্রমিক কাজ করেন সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে এবং সবচেয়ে বেশি মরদেহও আসছে সৌদি আরব থেকে। মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশি শ্রমিকদের বেশির ভাগই অবকাঠামো নির্মাণ খাতে নিয়োজিত। সেখানে দিনের বেলা প্রচণ্ড গরমের মধ্যে তাঁদের কাজ করতে হয়। এ ধরনের চরম আবহাওয়ায় দীর্ঘ সময় কাজ করলে দীর্ঘস্থায়ী স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হয়। অভিবাসন খাতের গবেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশি শ্রমিকদের এত বেশি মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ হলো অতিরিক্ত তাপ। আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, এমন বৈরী পরিবেশে কাজ করার কারণে ২০-৩০ বছর বয়সী তরুণদেরও মৃত্যু হচ্ছে। ফলে এই বিষয়টি কর্মপরিবেশ এবং শ্রমিকের নিরাপত্তার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। এসব অকালমৃত্যু ঠেকাতে হলে প্রকৃতপক্ষে কী কারণে মৃত্যু হচ্ছে, তা বের করা অত্যন্ত জরুরি।

আমরা মনে করি, প্রবাসী কর্মীদের মৃত্যুর কারণ ‘স্বাভাবিক’ বলে উল্লেখ করা হলো আর সেটা যাচাই না করে গ্রহণ করার চর্চা থেকে প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়কে অবশ্যই বেরিয়ে আসতে হবে। প্রবাসে থাকা স্বজনদের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানার অধিকার পরিবারগুলোর আছে। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, এভাবে দায়সারাভাবে মৃত্যুর কারণ বলে দেওয়াটা পরিবারগুলোর জন্যও অপমানজনক। এর ফলে অনেক সময় পরিবারগুলো যথাযথ ক্ষতিপূরণ ও বিমাসুবিধা থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে।

ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, কর্মক্ষেত্রে যাওয়া-আসার পথে সড়ক দুর্ঘটনা, কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনা ও অগ্নিকাণ্ডে অনেক শ্রমিকের মৃত্যু হচ্ছে। এ ছাড়া কর্মক্ষেত্রে নির্যাতন, হত্যা, যৌন নিপীড়ন ও আত্মহত্যার মতো ঘটনাও ঘটছে। বিশেষ করে নারী শ্রমিকদের নিরাপত্তার প্রশ্নটি এখন অনেক বেশি জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আমাদের বিশ্বাস, প্রবাসী বাংলাদেশিদের কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা নিশ্চিতে প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের নিষ্ক্রিয় ভূমিকার অবসান হতে হবে। পাশাপাশি অনিয়মিত কর্মীদের মরদেহ আনার ক্ষেত্রেও যেন আর কালক্ষেপণ করা না হয়।