সৌদি আরবে বাংলাদেশিসহ প্রবাসী শ্রমিকদের ওপর অমানবিক নির্যাতন, নিপীড়ন, বিচারপ্রক্রিয়ার নামে মৃত্যুদণ্ড, শিরোচ্ছেদ এবং নারী শ্রমিকদের ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়ন বন্ধ করতে বাংলাদেশ সরকারের প্রতি কঠোর কূটনৈতিক পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক জননেতা সাইফুল হক।

বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) সকালে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে বিপ্লবী শ্রমিক সংহতির উদ্যোগে আয়োজিত এক বিক্ষোভ সমাবেশে তিনি এই দাবি জানান। সম্প্রতি সৌদি আরবে বিচারের নামে দুই বাংলাদেশির শিরশ্ছেদের প্রতিবাদে এবং প্রবাসী শ্রমিকদের হত্যাকাণ্ড বন্ধ, জীবন ও নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং নারী শ্রমিকদের ওপর যৌন নিপীড়ন বন্ধের দাবিতে এই কর্মসূচি পালন করা হয়।

বক্তব্যের এক পর্যায়ে সাইফুল হক বলেন, "যেসব দেশ শ্রমিকদের ন্যূনতম মানবিক ও শ্রম অধিকার নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হচ্ছে, সেসব দেশে শ্রমিক পাঠানোর বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারকে প্রয়োজনে সাময়িক নিষেধাজ্ঞা দিতে হবে।"

তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, সৌদি আরবের বিভিন্ন কারাগারে বর্তমানে সাত হাজারের বেশি বাংলাদেশি শ্রমিক বন্দি হয়ে আছেন। এই শ্রমিকদের আইনি সহায়তা প্রদান এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব। তবে আক্ষেপ করে তিনি বলেন, শ্রমিকদের বিমানে তুলে দিতে পারলেই সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নিজেদের দায়িত্ব শেষ বলে মনে করছেন। শ্রমিকদের নিরাপদ কর্মপরিবেশ, আইনি সুরক্ষা এবং মানবিক মর্যাদা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও দূতাবাসগুলোর কার্যকর ভূমিকা পরিলক্ষিত হচ্ছে না।

প্রবাসীদের অবদান স্মরণ করে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "যে শ্রমিকেরা রেমিট্যান্স পাঠিয়ে আমাদের বাঁচিয়ে রেখেছেন, সেই শ্রমিকদের অমানবিক ও বিভীষিকাময় জীবন কোনোভাবেই তা মেনে নেওয়া যায় না।"

প্রবাসী শ্রমিকদের সুরক্ষায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট দূতাবাসগুলোর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার দাবি জানান তিনি। বিশেষ করে প্রবাসী নারী শ্রমিকদের করুণ অবস্থার কথা তুলে ধরে সাইফুল হক বলেন, প্রবাসে নারী শ্রমিকদের জীবন ও ইজ্জত সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করতে যাওয়া অনেক নারীকে নিয়োগকর্তার পরিবারের সদস্যদের দ্বারাও নির্যাতনের শিকার হতে হয়। কেউ কেউ অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় দেশে ফিরতে বাধ্য হচ্ছেন। এসব নারীর জীবন, ভবিষ্যৎ এবং অনাগত সন্তানের দায়িত্ব কে নেবে—এই প্রশ্নটি তিনি উত্থাপন করেন।

সৌদি আরবসহ বিভিন্ন দেশে শ্রমিকদের ন্যূনতম অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে কর্মী পাঠানো সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার বিষয়টি বিবেচনার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক পর্যায়ে আলোচনা করে শ্রমিকদের মর্যাদা, নিরাপত্তা এবং শ্রম অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।

পাশাপাশি বিদেশে কর্মী পাঠানোর নামে অতিরিক্ত অর্থ আদায় এবং রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর সিন্ডিকেটের তীব্র সমালোচনা করেন সাইফুল হক। তিনি বলেন, মালয়েশিয়ায় যেতে শ্রমিকদের কাছ থেকে ছয় সাত লাখ টাকা পর্যন্ত নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। সরকার এক্ষেত্রে কার্যকর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারছে না।

একই সমাবেশে বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির নেত্রী বহ্নিশিখা জামালী বলেন, প্রবাসী শ্রমিকদের মধ্যে নারী শ্রমিকদের জীবন ও ইজ্জত সবচেয়ে নিরাপত্তাহীন। অনেক প্রবাসী নারী শ্রমিককে প্রবাসে যৌন দাসত্বের এক অসহনীয় ভয়ংকর জীবন পার করতে হয়। তাদের ন্যূনতম অধিকারের কোনো বালাই নেই।

তিনি আরও বলেন, "প্রতিদিন দেশে ১৬ জন শ্রমিকের লাশ আসে। কিন্তু শ্রমিকদের এই অনিশ্চিত জীবন দেশের কারো মাথাব্যথা আছে বলে মনে হয় না।"

এই ভয়াবহ পরিস্থিতি বন্ধে তিনি দ্রুত সরকারের কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানান।

সংগঠনের সভাপতি মীর মোফাজ্জল হোসেন মোশতাকের সভাপতিত্বে এবং যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. ফিরোজ আলীর সঞ্চালনায় এই বিক্ষোভ সমাবেশে আরও বক্তব্য রাখেন বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির রাজনৈতিক পরিষদের সদস্য বহ্নিশিখা জামালী, বিপ্লবী গার্মেন্টস শ্রমিক সংহতির সভাপতি মাহমুদ হোসেন, বিপ্লবী শ্রমিক সংহতির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল ইসলাম, বিপ্লবী যুবসংহতির সদস্য সচিব মীর রেজাউল আলম, শ্রমজীবী নারী মৈত্রীর সহসভাপতি রাশিদা আক্তার এবং নৌযান শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি আনিসুর রহমান মাস্টার প্রমুখ।