সন্তানসম্ভবা স্ত্রীকে রেখে গত বছরের শেষ দিকে সৌদি আরবে পাড়ি জমিয়েছিলেন শামীম হোসেন। এরপর জন্ম হয় তাঁর একমাত্র কন্যাসন্তানের। দূর প্রবাসে থেকেও প্রতিদিন ভিডিও কলের মাধ্যমে মেয়েকে দেখতেন শামীম। শিশুটি কথা বলতে না পারলেও তার সঙ্গে গল্প করতেন, আদর দিতেন বাবা। মনে মনে লালন করেছিলেন এক স্বপ্ন—আগামী রোজার ঈদে দেশে ফিরে নিজের আদরের মেয়েকে প্রথমবার কোলে নেবেন। কিন্তু নিয়তির নির্মম পরিহাসে সেই স্বপ্ন আর পূরণ হলো না শামীমের।

মেয়ের জন্মের মাত্র ৩৪ দিন পর গত ১০ আগস্ট সৌদি আরবের রিয়াদে নিজ কর্মস্থলে এক ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে শামীম হোসেনসহ ১৬ জন প্রাণ হারান। অগ্নিকাণ্ডের পর মরদেহ শনাক্তকরণ প্রক্রিয়ায় জটিলতা দেখা দেওয়ায় মরদেহ দ্রুত দেশে পাঠানো সম্ভব হয়নি। দীর্ঘ ৮২ দিন পর আজ শনিবার কফিনবন্দী হয়ে একমাত্র সন্তানের মুখোমুখি হলেন শামীম।

গত ১০ আগস্ট রিয়াদের ওই কারখানায় অন্য সহকর্মীদের সঙ্গে ঘুমিয়ে ছিলেন শামীম। হঠাৎ কারখানায় আগুন ধরে যায়। তবে কারখানার মূল ফটক তালাবদ্ধ থাকায় ভেতরে থাকা শ্রমিকরা বের হওয়ার পথ পাননি। এই মর্মান্তিক অগ্নিকাণ্ডে নওগাঁ, নাটোর ও রাজশাহীর মোট ১৬ জন শ্রমিকের মৃত্যু হয়।

শামীমের বাড়ি নাটোরের নলডাঙ্গা উপজেলার খাজুরা ইউনিয়নের দীঘিরপাড় গ্রামে। তিনি ওই গ্রামের জাকির হোসেনের একমাত্র পুত্র। ২০১৬ সালে পাঁচ লাখ টাকা ধারদেনা করে সৌদি আরবে গিয়েছিলেন শামীম। পাঁচ বছর পর দেশে ফিরে বিয়ে করেন। এরপর পাঁচ বছর দেশে অবস্থানের পর ২০২৫ সালের শেষ দিকে তিনি পুনরায় সৌদি আরবে যান। সেই সময় তাঁর স্ত্রী মিতু খাতুন সন্তানসম্ভবা ছিলেন।

শামীমের স্বজনদের সূত্রে জানা গেছে, রিয়াদের একটি সোফা তৈরির কারখানায় কর্মরত ছিলেন তিনি। গত ১০ আগস্ট সকালে সহকর্মীদের সঙ্গে কারখানায় ঘুমানোর সময় হঠাৎ আগুনের সূত্রপাত হয়। মূল ফটক তালাবদ্ধ থাকায় কেউ জীবন বাঁচাতে বাইরে বের হতে পারেননি। এই ঘটনায় নওগাঁ, নাটোর ও রাজশাহীর ১৬ জন শ্রমিকের মৃত্যু হয়। নিহতদের মধ্যে সাতজনের মরদেহ আগস্ট মাসেই দেশে পাঠানো হয়েছিল। তবে শনাক্তকরণে সমস্যা হওয়ায় শামীমসহ বাকি নয়জনের মরদেহ ডিএনএ পরীক্ষার পর আজ শনিবার দেশে পৌঁছায়।

দুপুরে শামীমের লাশবাহী গাড়ি গ্রামে প্রবেশ করতেই স্বজনরা কান্নায় ভেঙে পড়েন। প্রতিবেশীসহ স্থানীয়দের ভিড়ে শামীমের বাড়ি শোকাতুর হয়ে ওঠে। কান্নাজড়িত কণ্ঠে শামীমের স্ত্রী মিতু খাতুন বলেন, “স্বামীর সঙ্গে আমার মাত্র কয়েক মাসের সংসার। ছাপা (একমাত্র মেয়ে) পেটে আসার কয়েক মাস পর সে চলে যায়। ছাপার জন্মের পর সে (শামীম) প্রতিদিন অন্তত দুবার ভিডিও কলে কথা বলত। বেশির ভাগ সময় মেয়ের সঙ্গে কথা বলত, মেয়ে কথা বলতে না পারলেও গল্প করত, আদর দিত।”

মিতু মুক্তকণ্ঠকে জানান, শামীমের পাঠানো টাকা দিয়ে মেয়ের আকিকা সম্পন্ন করে নাম রাখা হয়েছিল। স্বামী জানিয়েছিলেন, আগামী রোজার ঈদে তিনি দেশে ফিরবেন। মেয়েকে কোলে নেবেন এবং সোনার চুড়ি বানিয়ে দেবেন। কিন্তু সেই শখ আর পূরণ হলো না। বাস্তবে বাবা ও মেয়ের আর দেখা বা কথা হলো না।

বিকেলে দীঘিরপাড় গ্রামের মসজিদ চত্বরে জানাজা শেষে স্থানীয় কবরস্থানে শামীমের দাফন সম্পন্ন হয়। জানাজায় উপস্থিত ছিলেন নলডাঙ্গা উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) শামীম হোসেনসহ অনেকে। শামীমের বাবা জাকির হোসেন বলেন, “আমার ছ্যালিডা খুব বেশি পুড়ি গিছে। ওকে চেনার উপায় নাই। তবু ওর দাফন–কাফন করতে পেরে শান্তি পাইছি।”

একই অগ্নিকাণ্ডে খাজুরা ইউনিয়নের শ্রীপুর গ্রামের গোলাম রাব্বানীর ছেলে সাব্বির আহমেদও প্রাণ হারিয়েছেন। আজ দুপুরে তাঁর মরদেহও বাড়িতে পৌঁছেছে। মরদেহ পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গে পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে।

বাবা গোলাম রাব্বানী জানান, প্রায় সাড়ে চার বছর আগে তাঁর ছেলে সৌদি আরবে গিয়েছিলেন। আড়াই বছর আগে ভিডিও কলের মাধ্যমে ছেলের বিয়ে দেন তিনি। ইচ্ছা ছিল, আগামী রোজার ঈদে ছেলে বাড়ি ফিরলে আনন্দ-উৎসবের মাধ্যমে পুত্রবধূকে বাড়িতে উঠিয়ে আনবেন। কিন্তু তার আগেই ছেলের নির্মম মৃত্যু ঘটে। পুত্রবধূকে আর বাড়িতে নিয়ে আসার স্বপ্ন অপূর্ণ রয়ে গেল।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে গোলাম রাব্বানী বলেন, “বাঁচি থাকতে ওদের মধ্যে ভিডিও কলে কথা হতো। আজ ছ্যালি বাড়িত আসল। কিন্তু বাক্সবন্দী হয়া। ওদের দেকা হলো না, কতাও হলো না। এ যে কত বড় কষ্ট, আমি বুজাতে পারছিনি। আমাক খুব অপরাধী মনে হচ্ছে।”