চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেনের সরাসরি ও কঠোর সমালোচনার মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) খুলশী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শেখ আবদুর রহিমকে।

বুধবার (৭ অক্টোবর) সন্ধ্যায় সিএমপির পক্ষ থেকে জারি করা একটি প্রশাসনিক আদেশে তাকে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন স্পেশাল ব্রাঞ্চে (সিটিএসবি) বদলি করা হয়েছে। একই আদেশে আকবরশাহ থানার ওসি কামরুজ্জামানকে খুলশী থানার নতুন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব প্রদান করা হয়েছে।

এই বদলির বিষয়টি নিশ্চিত করে সিএমপি কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী বলেন, ‘ওসি আবদুর রহিমকে সিটিএসবিতে বদলি করা হয়েছে।’ মেয়রের তীব্র সমালোচনার মুখে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে কমিশনার বিষয়টিকে একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, ‘এটি একটি নিয়মিত বদলি প্রক্রিয়া। মেয়র কী বলেছেন, তা আমি দেখিনি।’

পুলিশ প্রশাসন যদিও এই ঘটনাটিকে ‘রুটিন বদলি’ হিসেবে দাবি করছে, তবে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে যে, চসিক মেয়র এবং সিএমপির মধ্যে সাম্প্রতিক টানাপোড়েন ও বেশ কিছু বিতর্কিত ঘটনারই প্রভাব এই দ্রুত বদলির সিদ্ধান্তের পেছনে রয়েছে।

এর আগে বুধবার সকালে নগরের ঈদগাঁহ রূপসা বেকারি এলাকায় পরিচ্ছন্নতা অভিযান চলাকালীন খুলশী থানার ওসি আবদুর রহিমের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন। তিনি অভিযোগ করে বলেন, ‘আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বাকলিয়া থানার ওসি থাকা অবস্থায় আবদুর রহিম বিএনপির নেতাকর্মীদের হয়রানি করেছেন। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পরও তিনি কীভাবে খুলশী থানার ওসির দায়িত্ব পান?’ মেয়রের দাবি, ওসি রহিম আওয়ামী লীগের চিহ্নিত অপরাধীদের গ্রেপ্তার না করে বরং ছাত্রদল ও যুবদলের নেতাকর্মীদের হয়রানি করে চলেছেন।

সম্প্রতি সাবেক স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা এবং ‘সেভেন স্টার’ কিশোর গ্যাং পরিচালনার অভিযোগে অভিযুক্ত ওয়াকিল হোসেন ওরফে ‘বগা’কে কেন্দ্র করে মেয়র ও পুলিশের মধ্যকার সংঘাত নতুন মাত্রা পায়। মঙ্গলবার রাতে ওয়াকিলকে গ্রেপ্তারের উদ্দেশ্যে পুলিশ নগর ভবনে অভিযান চালায়। তবে ওই অভিযানের পরপরই গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে যে, মেয়র নিজের গাড়িতে করে আসামিকে সরিয়ে দিয়েছেন।

এই বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘ওয়াকিল হোসেন বগা সেখানে ছিলেন না। বিগত সরকারের আমলে বাকলিয়া থানার তৎকালীন ওসি (বর্তমানে খুলশী থানার ওসি) আবদুর রহিমের হয়রানির অভিযোগ জানাতে বগার দুই ভাই এসেছিলেন। মেয়র হিসেবে আমি কেবল তাদের অভিযোগ শুনেছি। এর বাইরে কিছু ঘটেনি।’

তিনি আরও অভিযোগ করেন যে, পুরো বিষয়টি পরিকল্পিত। আগামী চসিক নির্বাচনকে সামনে রেখে একটি নির্দিষ্ট চক্র ষড়যন্ত্র করছে এবং তাদের সঙ্গে যোগসাজশ করেই ওসি আবদুর রহিম কাজ করছিলেন। তিনি বলেন, ফ্যাসিবাদের সময় বাকলিয়া থানার ওসি থাকার সময় শহীদ জিয়াউর রহমানের মৃত্যুবার্ষিকীর মেজবানের খাবার পর্যন্ত বাজেয়াপ্ত করেছিলেন আবদুর রহিম। এখনও তিনি একই ধরনের আচরণ করছেন।

ষড়যন্ত্রকারীদের পরিচয় জানতে চাইলে মেয়র বলেন, ‘যথাযথ স্থানেই তাদের বিষয়ে জানানো হবে।’

উল্লেখ্য, খুলশী থানার বিদায়ী ওসির বিরুদ্ধে বিতর্ক এটাই প্রথম নয়। গত সেপ্টেম্বর মাসে স্থানীয় এক ব্যবসায়ী ও বিএনপি নেতার বাড়িতে ভাঙচুর, লুটপাট ও চাঁদাবাজির অভিযোগে ওসি আবদুর রহিমসহ নয়জনের বিরুদ্ধে আদালতে একটি ফৌজদারি মামলা দায়ের করা হয়। আদালত উক্ত অভিযোগটি তদন্ত করার জন্য সিআইডিকে নির্দেশ দিয়েছেন।

পুলিশ প্রশাসন একে স্বাভাবিক বদলি বলে দাবি করলেও মেয়রের বক্তব্যের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সিদ্ধান্ত কার্যকর হওয়ায় নগর রাজনীতিতে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। নতুন ওসি কামরুজ্জামান দায়িত্ব নেওয়ার পর খুলশী এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ এবং চসিকের সঙ্গে কার্যকর সমন্বয় বজায় রাখা তাঁর জন্য অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ হবে বলে মনে করা হচ্ছে।