চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) নগর ভবনে সন্ত্রাসী ওয়াকিল হোসেন বগাকে গ্রেপ্তারের জন্য পুলিশের চালানো অভিযান এবং সেই প্রক্রিয়ায় মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেনের বাধার বিষয়টি এখন প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
গত মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) রাত সাড়ে ৯টার দিকে খুলশী থানা পুলিশ বগাকে গ্রেপ্তারের উদ্দেশ্যে নগর ভবন ঘিরে ফেলে। পুলিশের এই আকস্মিক তৎপরতায় চসিক এলাকায় চরম উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। পুলিশি তথ্যানুসারে, ওয়াকিল হোসেন বগা পুলিশের তালিকাভুক্ত একজন সন্ত্রাসী। তার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা এবং বিস্ফোরকসহ বিভিন্ন অপরাধের অভিযোগে মোট ১৭টি মামলা দায়ের করা হয়েছে।
পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীদের দেওয়া তথ্যে জানা গেছে, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে নগর ভবনে বগার অবস্থান শনাক্ত করে খুলশী থানা পুলিশের একটি দল পুরো ভবনটি চারপাশ থেকে ঘিরে ফেলে। অভিযানের এক পর্যায়ে কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তা ভবনের ভেতরে প্রবেশ করার চেষ্টা করলে চসিক মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন তীব্র আপত্তি জানান। তিনি পুলিশ কর্মকর্তাদের অবিলম্বে ভবন ত্যাগ করার নির্দেশ দেন। মেয়রের এই কঠোর বাধার মুখে পুলিশ শেষ পর্যন্ত বগাকে গ্রেপ্তার করতে unable হয়ে নগর ভবন এলাকা ছেড়ে চলে যায়।
উল্লেখ্য, এর আগে গত ৪ সেপ্টেম্বর ভোরে খুলশীর ওয়্যারলেস মোড় এলাকায় বগাকে গ্রেপ্তারের জন্য পুলিশ অভিযান চালিয়েছিল। তবে সেই সময় পুলিশের ওপর হামলা এবং পুলিশের গাড়ি ভাঙচুরের সুযোগ নিয়ে বগা একটি বসতঘরের গোপন পথ দিয়ে পালিয়ে যেতে সক্ষম হন।
যদিও সংশ্লিষ্ট উভয় পক্ষই এই ঘটনাটিকে স্বাভাবিক বলে দাবি করছেন, তবে মেয়রের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিবর্গ এবং চসিকের অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারী বিষয়টিকে সাধারণ পুলিশি অভিযান হিসেবে দেখছেন না। নাম প্রকাশ না করার শর্তে চসিকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, মেয়র এই বিষয়ে মন্তব্য করতে নিষেধ করেছেন। তবে পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে তিনি বলেন, “ঘটনাটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ঘটানো হয়েছে। উদ্দেশ্য যদি সত্যিই বগাকে গ্রেপ্তার করা হতো, তাহলে পুরো ভবন ঘেরাওয়ের প্রয়োজন ছিল না। নগর ভবন থেকে বের হওয়ার দুটি পথ রয়েছে। সেখানে অবস্থান নিলেই তাকে গ্রেপ্তার করা যেত। এতে মনে হচ্ছে, কোনো একটি মহল উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে এই পরিস্থিতি তৈরি করতে চেয়েছিল।”
প্রায় একই ধরনের মত প্রকাশ করেছেন নগর বিএনপির একাধিক জ্যেষ্ঠ নেতা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপি সমর্থিত এক রাজনৈতিক নেতা এই ঘটনার নেপথ্যে দুটি সম্ভাব্য কারণ থাকার কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, “প্রথমত ঘটনার দিন দুপুরে সড়কে অবৈধ পার্কিং সংক্রান্ত বিষয়ে মেয়র এক ট্রাফিক সার্জেন্টকে তিরস্কার করেছিলেন। এর জেরে পুলিশের পক্ষ থেকে এক ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখানোর চেষ্টা হয়ে থাকতে পারে।”
তিনি আরও বলেন, “দ্বিতীয়ত দলীয় অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক প্রতিপক্ষও প্রশাসনের মাধ্যমে এ ঘটনায় ইন্ধন জুগিয়ে থাকতে পারে।” সামনে চসিক নির্বাচন সামনে থাকায় রাজনৈতিক গুঞ্জন রয়েছে যে, সরকারের প্রভাবশালী কোনো প্রতিনিধি মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে আগ্রহী। এছাড়া নগরীর বিভিন্ন এলাকায় বিএনপির জনপ্রিয় ও জ্যেষ্ঠ নেতাদের কোণঠাসা করতে একটি বিশেষ বলয় সক্রিয় রয়েছে এবং দলীয় আধিপত্য বিস্তারে প্রশাসনিক প্রভাব ব্যবহারের চর্চা চলছে বলে তিনি দাবি করেন।
এই পুরো ঘটনার বিষয়ে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) সহকারী কমিশনার (জনসংযোগ) আমিনুর রশীদ জানান, “আমাদের তালিকাভুক্ত এক আসামি সেখানে অবস্থান করছেন এমন সংবাদের ভিত্তিতেই পুলিশ সিটি করপোরেশন এলাকায় অবস্থান নেয়। তবে অনুসন্ধানের পর তাকে পাওয়া যায়নি।”
অন্যদিকে, মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি পুলিশকে বাধা দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, “সেখানে ওয়াকিল হোসেন বগা উপস্থিত ছিলেন না। বিগত স্বৈরাচার সরকারের আমলে বাকলিয়া থানার তৎকালীন ওসি এবং বর্তমানে খুলশী থানার ওসি আব্দুর রহিমের বিরুদ্ধে হয়রানিমূলক মামলার অভিযোগ জানাতে বগার দুই ভাই এসেছিলেন। চসিক মেয়র হিসেবে আমি কেবল তাদের অভিযোগ শুনেছি। এর বাইরে অন্য কিছু ঘটেনি।”
এদিকে সম্প্রতি সীতাকুণ্ডে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে বিএনপির দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছিল। ওই ঘটনার পর চট্টগ্রাম-৪ (সীতাকুণ্ড) আসনের সংসদ সদস্য আসলাম চৌধুরী তার বক্তব্যে ইঙ্গিত দিয়ে বলেছিলেন, সরকারের একজন ‘ছোটখাটো মন্ত্রী’ সীতাকুণ্ডের স্থানীয় রাজনীতিতে অস্থিরতা তৈরি করছেন। তবে এই মন্তব্যের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর কেউ সরাসরি কোনো নাম উল্লেখ করতে রাজি হননি।