তুরস্কের সুফি সাধক নাসিরুদ্দিন হোজ্জা যেমন বুদ্ধিমান, তেমনি কৌতুকপ্রিয়। দ্বাদশ শতাব্দীতে তাঁর জন্ম। জ্ঞানচর্চার প্রতি ছিল তাঁর প্রবল অনুরাগ। ত্রয়োদশ শতাব্দীর মধ্যভাগ থেকেই তাঁর জীবন ও কর্মকাণ্ড নিয়ে নানা গল্প প্রচলিত হতে শুরু করে। সেই গল্পগুলো মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ে মধ্যপ্রাচ্য থেকে চীন হয়ে সমগ্র এশিয়াজুড়ে। শিশু থেকে বৃদ্ধ—সব বয়সের মানুষের কাছেই তিনি অত্যন্ত জনপ্রিয়। হোজ্জার এই বুদ্ধিদীপ্ত কৌতুকগুলো খুব পছন্দ পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী নওশিন জাহানের। প্রথমা প্রকাশনের ‘নাসিরুদ্দিন হোজ্জার ১০০ গল্প’ বইটি পাওয়ার পর গভীর মনোযোগ দিয়ে সেটি উল্টেপাল্টে দেখতে থাকে সে। এরপর মায়ের কাছে আবদার করে বইটি কিনে নিতে চায়। আর নাসিরুদ্দিনের বইটি কেনা মাত্রই সে কিছুটা দূরে গিয়ে পড়তে শুরু করে দেয়।

চট্টগ্রামের ইস্পাহানি পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজে আজ বুধবার প্রথমা প্রকাশনের আয়োজনে একটি বই উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। সেখানেই দেখা হয় নওশিনের সঙ্গে। সকাল সাড়ে সাতটায় এই উৎসবের সূচনা হলেও দুপুর ১২টায় স্কুলের প্রভাতি শাখার ছুটির পর আয়োজনটি পূর্ণতা পায়। ছুটির পরপরই সেখানে উপস্থিত হয় নওশিন। সে জানায়, নাসিরুদ্দিন হোজ্জার গল্প পেলেই সে তা পড়ে। বই উৎসবের কথা শুনেই সে হোজ্জার বই খুঁজতে এসেছিল। আর বইটি খুঁজে পাওয়ামাত্রই মায়ের অনুরোধ করে সেটি কিনে নেয়।

এই বই উৎসবে গল্প, বিজ্ঞান, কিশোর উপন্যাস, রহস্য এবং কমিকসসহ বিভিন্ন বিষয়ের বই প্রদর্শিত ও বিক্রয় করা হয়। পাশাপাশি জনপ্রিয় দুটি সাময়িকী ‘কিশোর আলো’ ও ‘বিজ্ঞানচিন্তা’র সংগ্রহও সেখানে ছিল। ক্লাসের বিরতির ফাঁকে শিক্ষার্থীরা ভিড় করছিল বইয়ের স্টলে। কেউ মলাট দেখেই পছন্দের বইটি বেছে নিচ্ছিল, আবার কেউ ভেতরের পাতা উল্টে দেখছিল। শিক্ষার্থীদের বই নিয়ে এমন প্রবল ব্যস্ততা চলে বেলা দুইটা পর্যন্ত।

অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী নুসরাত জাহান মেলায় এসে খুঁজছিল কিশোর থ্রিলার। একের পর এক বই হাতে নিয়ে মলাট দেখছিল সে এবং পাতার কয়েক লাইন পড়ে দেখছিল। অবশেষে রকিব হাসানের দুটি থ্রিলার বই খুঁজে পেয়ে তা কিনে নেয় সে। নুসরাত জানায়, থ্রিলার পড়তে তার ভালো লাগে। মেলায় আসার ফলে পছন্দের অনেক বই একসঙ্গে দেখার সুযোগ পেয়েছে সে।

তবে কেবল থ্রিলার নয়, অনেক শিক্ষার্থীকে বিজ্ঞানবিষয়ক বই, সায়েন্স ফিকশন এবং অ্যাডভেঞ্চারের বইয়ের খোঁজ করতে দেখা যায়। কেউ কিনছিল কমিকস, আবার কেউ কিশোর উপন্যাস। এতেই স্পষ্ট বোঝা গেল যে, বর্তমান শিশু-কিশোরদের পছন্দের তালিকা বেশ দীর্ঘ ও বৈচিত্র্যময়।

এই উৎসব সম্পর্কে কথা বলেন ইস্পাহানি পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ আহমেদ শাহীম আল রাজি। তিনি বলেন, ‘বইয়ের কোনো বিকল্প নেই। মানুষ জন্মের পর থেকে যে জ্ঞান অর্জন করেছে, মানবসভ্যতার যে অগ্রগতি হয়েছে, এর পেছনে বইয়ের বড় ভূমিকা রয়েছে। এখন হয়তো আমরা বলছি, তথ্যপ্রযুক্তির যুগ আসছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগ আসছে। কিন্তু এসবের পেছনেও বইয়ের জ্ঞান রয়েছে।’

শাহীম আল রাজি আরও বলেন, এ ধরনের বইমেলার আয়োজন অবশ্যই একটি সুন্দর উদ্যোগ। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা শ্রেণিকক্ষের বাইরেও বিভিন্ন ধরনের বই সম্পর্কে ধারণা অর্জন করতে পারবে। বিজ্ঞান, গল্প, ইতিহাসসহ নানা বিষয়ের বইয়ের প্রতি তাদের আগ্রহ তৈরি হবে। তাদের কৌতূহলও মেটাতে পারবে।