করোনায় আক্রান্ত হয়ে ২০২১ সালের ৭ অক্টোবর পরলোকগমন করেন প্রথমা প্রকাশনের সমন্বয়ক ও বিশিষ্ট সাংবাদিক অরুণ বসু (৬৮)। প্রতি বছরের ন্যায় এবারও তাঁর মৃত্যুবার্ষিকীতে বন্ধু ও শুভানুধয়ীরা একত্রিত হয়ে তাঁকে শ্রদ্ধা জানান। তবে এবারের স্মরণসভায় এক বিশেষ শোকের আবহ ছিল, কারণ গত বছর এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকা তাঁর সহকর্মী ও প্রখ্যাত শিশুসাহিত্যিক আখতার হুসেন (৮১) গত ২৪ সেপ্টেম্বর মৃত্যুবরণ করেছেন। ফলে আজ শুক্রবার অরুণ বসুর পাশাপাশি আখতার হুসেনকেও গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করলেন তাঁর প্রিয়জন ও শুভানুধয়ীরা।
রাজধানীর ধানমন্ডির একটি বাসায় আজ সন্ধ্যায় অত্যন্ত ঘরোয়া পরিবেশে গান, কবিতা এবং স্মৃতিচারণার মাধ্যমে এই যৌথ স্মরণসভার আয়োজন করা হয়। স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে উপস্থিত অতিথিরা বলেন, অরুণ বসু এবং আখতার হুসেনের মতো ব্যক্তিত্বদের চলে যাওয়ায় জাতি এক অপূরণীয় ক্ষতি বরণ করেছে। তাঁরা দুজনেই ছিলেন অত্যন্ত সৃজনশীল ও প্রতিভাবান মানুষ, যাঁরা জাতিকে স্বপ্ন দেখানোর সাহস জোগাতেন। বিশেষ করে চব্বিশের পরিবর্তনের পর দেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে তাঁদের মতো চিন্তাবিদদের প্রয়োজন ছিল আরও বেশি।
রবীন্দ্রসংগীতশিল্পী বুলবুল ইসলামের কণ্ঠে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘এরা পরকে আপন করে, আপনারে পর’ গানের মধ্য দিয়ে স্মরণসভার সূচনা হয়। যেখানে গান পরিবেশিত হচ্ছিল, ঠিক তার পেছনেই শোভা পাচ্ছিল অরুণ বসু ও আখতার হুসেনের প্রতিকৃতি। এরপর শুরু হয় স্মৃতিচারণ, যার মাঝে পর্যায়ক্রমে পরিবেশিত হয় গান ও কবিতা আবৃত্তি।
প্রয়াত অরুণ বসুর ঘনিষ্ঠ বন্ধু, নাট্যব্যক্তিত্ব, গবেষক ও আবৃত্তি প্রশিক্ষক বিপ্লব বালা আলোচনার সূত্রপাত করেন। তিনি বলেন, “অরুণ বসুর মৃত্যুবার্ষিকীতে আমরা কাছের লোকেরা একত্র হই। গত বছরের আয়োজনে আখতার হুসেনও এসেছিলেন। সম্প্রতি তিনিও চলে গেলেন। জাতীয়তাবাদ ও বামপন্থা—নাগরিক সমাজের এই দুই ধরনের প্রবণতার প্রতিনিধি ছিলেন অরুণ বসু ও আখতার হুসেন। তবে দুজনই ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানোর লোক ছিলেন।”
স্মরণসভায় উপস্থিত ছিলেন বর্তমানে চরচার সম্পাদক সোহরাব হাসান, যিনি অরুণ বসু ও আখতার হুসেন দুজনেরই সহকর্মী ছিলেন। তাঁদের সঙ্গে কাটানো বিভিন্ন স্মৃতি তুলে ধরে তিনি বলেন, “দুজন মানুষের মৃত্যুই একেবারে চোখের সামনে হলো। তাঁদের মৃত্যুতে জাতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাঁরা ছিলেন সৃজনশীল, প্রতিভাবান ও জাতিকে স্বপ্ন দেখানোর মানুষ। চব্বিশের পর তাঁদের আরও বেশি প্রয়োজন ছিল।” একইসঙ্গে তিনি অরুণ বসুর পুত্র ও ছাত্রনেতা মেঘমল্লার বসুর খোঁজখবর রাখার জন্য উপস্থিত সবাইকে অনুরোধ জানান।
অরুণ বসুর বন্ধু নিমাই গাঙ্গুলি জানান, মুক্তকণ্ঠতে আসা-যাওয়ার সূত্রে তাঁর সাথে আখতার হুসেনের পরিচয় হয়েছিল। তিনি উল্লেখ করেন যে, ব্যক্তিত্বে ভিন্ন হলেও তাঁদের মধ্যে অসাধারণ পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ছিল। অরুণ বসু আখতার হুসেনকে ভীষণ ভালোবাসতেন। দেশ, স্বাধীনতা এবং জাতিসত্তার প্রশ্নে তাঁদের দুজনের আদর্শিক মিল ও অঙ্গীকার ছিল অত্যন্ত দৃঢ়।
আবৃত্তিকার গোলাম সারোয়ার অরুণ বসুর ব্যক্তিত্বের কথা উল্লেখ করে বলেন, ভীষণ নরম ও সবল একটা মন বাস করত তাঁর ভেতরে। শুধু শরীরে নয়, মনেও তিনি লম্বা ছিলেন।
অন্যদিকে, প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির বিরুদ্ধে অরুণ বসুর আপসহীন অবস্থানের কথা স্মরণ করে তাঁর প্রাক্তন সহকর্মী বেনজীর আহমেদ বলেন, “আজ মবের হাত থেকে রবীন্দ্রনাথও রক্ষা পাচ্ছেন না। আজ তাঁর অভাব বোধ করছি।”
এই ঘরোয়া স্মরণসভায় বুলবুল ইসলাম ছাড়াও নজরুলসংগীত পরিবেশন করেন শিল্পী শারমিন সাথী ইসলাম। স্মৃতিচারণমূলক বক্তৃতার ফাঁকে ফাঁকে কবিতা আবৃত্তি করেন গোলাম সারোয়ার, সোমনাথ সূর এবং মেহেদী হাসান।