গা-ছমছমে ভূতের গল্পের প্রতি প্রবল অনুরাগ চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী মাইসার। এই আগ্রহ থেকেই একনজরে দেখেই রকিব হাসানের লেখা ‘হাতকাটা ভূত’ বইটি কিনে নিয়েছে সে। তবে কেনার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সে তার এক সহপাঠী বান্ধবীকেও সঙ্গে করে নিয়ে আসে এবং বইটির পাতা উল্টেপাল্টে তাকে দেখায়। এরপরই বইটি প্যাকেটবন্দী করে নিজের সংগ্রহে নেয় মাইসা।
মাইসা জানাল, রকিব হাসান তার অত্যন্ত প্রিয় একজন গল্পকার। ‘হাতকাটা ভূত’ বইটি একজন পিয়ানো শিক্ষককে কেন্দ্র করে লেখা হয়েছে বলে সে আগে থেকেই অবগত। ওই শিক্ষকের মিউজিক স্কুলে যারা গান বা বাজনা শিখতে যায়, তারা আর কোনোদিন ফিরে আসে না—এই রহস্যময় বিষয় নিয়েই গল্পটি। বাকি অংশটুকু সে বাসায় গিয়ে পড়ার পরিকল্পনা করেছে।
আজ সোমবার সকালে চট্টগ্রামের বালুছড়ায় অবস্থিত লিডার্স স্কুল অ্যান্ড কলেজে প্রথমা প্রকাশনীর আয়োজনে একটি বই উৎসবের আয়োজন করা হয়। টিফিনের বিরতি চলাকালীন মাইসার সঙ্গে কথা হয় প্রতিবেদকের। সেই সময়ে দেখা যায়, পুরো স্কুল যেন বই উৎসবের প্রাঙ্গণে ভিড় করে এসেছে। শিক্ষার্থীরা ক্যানটিনের দিকে না গিয়ে বরং বইয়ের স্টলগুলোর প্রতি বেশি আকৃষ্ট হয়। কেউ কিশোর উপন্যাস কিংবা রহস্যের বইয়ের জগতে হারিয়ে যাচ্ছিল, আবার কারও হাতে দেখা গেল কমিকস বা প্রিয় লেখকের গল্পের বই।
বই কেনার ক্ষেত্রে ভিন্ন ভিন্ন ধরন দেখা গেছে শিক্ষার্থীদের মধ্যে। কেউ কেউ কেবল মলাট দেখেই দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে বই কিনছিল, আবার কেউ বন্ধুদের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনার পর পছন্দের বইটি বেছে নিচ্ছিল। ছোটদের মধ্যে কমিকস ও গল্পের বইয়ের ব্যাপক চাহিদা থাকলেও বড় শ্রেণির শিক্ষার্থীদের মধ্যে কিশোর উপন্যাস ও রহস্য উপন্যাসের প্রতি আগ্রহ ছিল চোখে পড়ার মতো।
মেলা প্রাঙ্গণে সাজানো একটি স্টলে বিজ্ঞান, গণিত, কিশোর উপন্যাস, গল্প ও রহস্যসহ নানা বিষয়ের বই রাখা হয়েছিল। পাশাপাশি সেখানে কিশোর আলো ও বিজ্ঞানচিন্তার কপি পাওয়া যাচ্ছিল। স্টলে আসা শিক্ষার্থীদের প্রথম জিজ্ঞাসা ছিল বইয়ের দাম নিয়ে। অনেকে হাতে থাকা টাকা গুনে দেখছিল এবং পছন্দের বইটি কেনার পর পকেটে কত টাকা অবশিষ্ট থাকবে, তা মিলিয়ে নিচ্ছিল।
মেলার অন্য প্রান্তে পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী সাদিদ ও আবিরকে গণিতের বই নিয়ে ব্যস্ত দেখা যায়। তারা দুজন মিলে আলোচনা করছিল যে, কোন বইটি তাদের জন্য অধিক কার্যকর হবে। তাদের মূল লক্ষ্য ছিল গণিতের কঠিন সমস্যাগুলো সহজভাবে বোঝা। যদিও তারা গল্প ও উপন্যাসের বইগুলোও দেখছিল, তবে বিজ্ঞান ও গণিতের প্রতিই তাদের আগ্রহ ছিল প্রবল। এরই মধ্যে তারা বিজ্ঞানচিন্তার চলতি সংখ্যার দুটি কপি কিনে নেয়।
টিফিনের প্রথম বিরতি শেষ হলে ছোটরা ক্লাসে ফিরে যায়। কিছুক্ষণ পর যখন বড়দের টিফিনের বিরতি শুরু হয়, তখন আবারও শিক্ষার্থীদের ভিড়ে মুখর হয়ে ওঠে বইয়ের স্টল। মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে উপন্যাস ও গল্পের বইয়ের প্রতি বিশেষ আগ্রহ দেখা যায়। কেউ কেউ থ্রিলার বা রহস্যের বই খুঁজছিল, আবার কেউ প্রিয় লেখকের নাম বলে জানতে চাইছিল তাঁর কোনো বই স্টলে আছে কি না।
নিম্নমাধ্যমিকের ছুটির সময়ে অভিভাবকরাও বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে উপস্থিত হন। সন্তানদের পছন্দের বই খুঁজে দিতে তারা স্টলে ভিড় করেন। কেউ সন্তানের হাতে পছন্দের বই তুলে দিচ্ছিলেন, আবার কেউ বই নির্বাচনে উৎসাহ দিচ্ছিলেন। শিশুদের বই পড়ার এই আগ্রহ দেখে অনেক অভিভাবক নিজেদের পছন্দের বইয়ের পাশাপাশি শিশুদের উপযোগী বইও কিনে নেন।
সন্তানকে নিতে এসে স্টলের সামনে দাঁড়িয়েছিলেন তানজিবা হাসান। তিনি বিশ্বজিৎ চৌধুরীর ‘ফুটো’ বইটি হাতে নিয়ে বেশ কিছুক্ষণ পাতা উল্টে দেখেন। বিশ্বজিৎ চৌধুরীর লেখা তিনি আগে থেকেই পড়েছেন। মেয়ের জন্য বই খুঁজতে এসে নিজের পছন্দের আরও কয়েকটি বই চোখে পড়ায় সেগুলো কেনার কথা ভাবছেন তিনি।
লিডার্স স্কুল অ্যান্ড কলেজ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, শিক্ষার্থীদের বই পড়ার প্রতি আগ্রহী করতে এবং ছোটদের বিভিন্ন ধরনের সাহিত্যের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতেই প্রথমা প্রকাশনীর সঙ্গে যৌথভাবে এই বইমেলার আয়োজন করা হয়েছে। পাঠ্যবইয়ের বাইরে গল্প, উপন্যাস, বিজ্ঞান ও রহস্যের বই পড়ার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের সচেতন করাই এই আয়োজনের মূল উদ্দেশ্য।
লিডার্স স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ কর্নেল (অব.) আবু নাসের মো. তোহা বলেন, “বই মানুষকে ন্যায়-অন্যায় ও ভালো-মন্দের পার্থক্য করতে শেখায়। জ্ঞান অর্জনের অন্যতম প্রধান উৎস বই। বই শুধু বর্তমানের কথা বলে না, এর মাধ্যমে অতীতকে জানা যায় এবং ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখাও সম্ভব হয়। এভাবেই জ্ঞান ও চিন্তার বিকাশের মাধ্যমে সভ্যতা সামনে এগিয়ে যায়।”
অধ্যক্ষ আরও বলেন, “লিডার্স স্কুল অ্যান্ড কলেজের লক্ষ্য ভালো মানুষ তৈরি করা। এ জন্য জ্ঞান, নৈতিকতা ও দক্ষতা—এ তিন বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া হয়। আর এই তিনেরই অন্যতম উৎস বই। তাই শিক্ষার্থীদের নিয়মিত বই পড়ায় অভ্যস্ত করতে বিদ্যালয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। প্রথমা প্রকাশনের এ ধরনের বইমেলা শিক্ষার্থীদের উপকার করবে।” ভবিষ্যতেও এ ধরনের উদ্যোগ অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান তিনি।