সুন্দরবনের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে প্রতি বছর অসংখ্য পর্যটক ভিড় করেন। তাদের আবাসন সুবিধার জন্য বন সংলগ্ন এলাকায় গড়ে উঠেছে অসংখ্য রিসোর্ট। তবে পর্যটন শিল্পের এই প্রসারের আড়ালে পরিবেশ ও প্রতিবেশের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে এসব স্থাপনা। পর্যটকদের ব্যবহৃত প্লাস্টিক, পলিথিন ও খাবারের প্যাকেট এখানে সেখানে ফেলা হচ্ছে। এমনকি অনেক রিসোর্টের পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা সরাসরি বনের ভেতরের নদীর পানিতে মিশছে। এছাড়া রিসোর্ট নির্মাণের সময় নির্বিচারে গাছ কাটার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।
সুন্দরবনের এই নাজুক পরিবেশ রক্ষা করতে কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে পরিবেশ অধিদপ্তর। পরিবেশগত ছাড়পত্র না থাকা এবং পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ) বিধিমালা লঙ্ঘনের অভিযোগে খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরার মোট ২৪টি রিসোর্টের কার্যক্রম বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নির্দেশনায় বলা হয়েছে, নির্দিষ্ট কিছু প্রতিষ্ঠানকে ১৫ দিন এবং কিছু প্রতিষ্ঠানকে ৩০ দিনের মধ্যে তাদের স্থাপনা সরিয়ে নিতে হবে।
বন্ধের নির্দেশ পাওয়া রিসোর্টগুলোর মধ্যে খুলনার দাকোপে ১৮টি, বাগেরহাটে দুটি এবং সাতক্ষীরায় চারটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। পরিবেশ অধিদপ্তর সতর্ক করে জানিয়েছে, এই নির্দেশনা অমান্য করলে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা, বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা এবং নিয়মিত মামলা করার মতো কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
গত ৪ অক্টোবর পরিবেশ অধিদপ্তর খুলনা জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মো. হারুন-অর-রশীদ সুন্দরবন সংলগ্ন দাকোপ উপজেলার ঢাংমারী, কৈলাসগঞ্জ ও বাণিশান্তা এলাকায় গড়ে ওঠা ১৮টি রিসোর্টের মালিকদের এই সংক্রান্ত চিঠি প্রদান করেন। চিঠিতে বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫ (সংশোধিত ২০১০) ও সংশ্লিষ্ট বিধিমালার আওতায় ব্যবস্থা নেওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এই চিঠিগুলো ডাকযোগে সংশ্লিষ্টদের কাছে পাঠানো হয়েছে।
অধিদপ্তরের তালিকায় থাকা ১৮টি রিসোর্ট হলো— অরণ্যছায়া, অরণ্যবাড়ী, কেওড়াবন, মায়াবন, গহন, দ্য ফরেস্ট রিট্রিট, নিকুঞ্জ ভ্যালি, লা সিলভা কটেজ, বনবিবি, সুন্দরী, ইরাবতী, বনমালী, গোলকানন, পিয়ালী, ম্যানগ্রোভ, জঙ্গলবাড়ী, বনবাস ও বনলতা ইকো কটেজ।
পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মো. হারুন-অর-রশীদ বলেন, “রিসোর্টগুলোতে পর্যটকদের ব্যবহৃত বিভিন্ন খাবারের প্যাকেট, প্লাস্টিক ও পলিথিনের বর্জ্য ফেলা হচ্ছে। পাশাপাশি রিসোর্ট নির্মাণের সময় বিভিন্ন গাছ কাটা হচ্ছে। পয়োবর্জ্য পানিতে সরাসরি নদীর পানিতে মিশছে। এতে সুন্দরবনসংলগ্ন এলাকার পরিবেশ ও প্রতিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। এসব কারণে রিসোর্টগুলোর কার্যক্রম বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এসব পর্যটনকেন্দ্রিক প্রতিষ্ঠানের পরিবেশগত ছাড়পত্রও নেই। পাশাপাশি ইসিএ বিধিমালা অনুযায়ী ওই এলাকায় এ ধরনের প্রতিষ্ঠান স্থাপনের সুযোগ নেই।”
তিনি আরও জানান, অনুমোদন ছাড়া রিসোর্ট নির্মাণের অভিযোগে আগে ১০টি প্রতিষ্ঠানকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছিল। রিসোর্ট মালিকরা জবাব দেওয়ার পাশাপাশি পরিবেশগত ছাড়পত্রের জন্য আবেদন করেন। কিন্তু প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিতে না পারায় গত ৩০ সেপ্টেম্বর তাদের আবেদন বাতিল করা হয়। এরপর এসব প্রতিষ্ঠান বন্ধ এবং ৩০ দিনের মধ্যে স্থাপনা সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে, নতুন করে তৈরি হওয়া আটটি রিসোর্টকে গত ৩০ সেপ্টেম্বর সাত দিনের মধ্যে গ্রহণযোগ্য স্থানে স্থানান্তরের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময়ে দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ না নেওয়ায় এবার তাদের কার্যক্রম বন্ধ এবং ১৫ দিনের মধ্যে স্থাপনা অপসারণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
পরিবেশ অধিদপ্তরের হিসাবে খুলনা অংশে রিসোর্টের সংখ্যা ১৮টি হলেও রিসোর্ট মালিকদের সংগঠনের দাবি, এই সংখ্যা ১৫টি। এ বিষয়ে হারুন-অর-রশীদ বলেন, কিছু রিসোর্ট নির্মিত হয়েছে এবং কিছু নির্মাণাধীন, এমন তথ্যের ভিত্তিতেই অধিদপ্তরের তালিকায় ১৮টি প্রতিষ্ঠান রাখা হয়েছে।
রিসোর্ট মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক জাকারিয়া শাওন বলেন, “আমরা এখনো পরিবেশ অধিদপ্তরের কোনো চিঠি পাননি। বনের ওপর চাপ কমানোর চেষ্টা করছি এবং পরিবেশের ক্ষতি হয় এমন কোনো কাজ না করে নিয়ম মেনেই ব্যবসা পরিচালনা করছি।”
তবে পরিবেশ অধিদপ্তরের খুলনা জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক হারুন-অর-রশীদ স্পষ্ট করেছেন যে, ইসিএ এলাকায় পরিবেশগত বিধিনিষেধ মানা হচ্ছে কি না, তা নিয়মিত নজরদারি করা হবে। সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে চলাচলকারী লঞ্চ ও জাহাজের বিষয়টি আলাদা, সেগুলো বন বিভাগের নিয়ন্ত্রণে। তবে ইসিএ এলাকায় স্থায়ী পর্যটনকেন্দ্র নির্মাণের ক্ষেত্রে পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র বাধ্যতামূলক।
পরিবেশ অধিদপ্তরের খুলনা বিভাগীয় কার্যালয়ের পরিচালক খোন্দকার মো. ফজলুল হক বলেন, “পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকায় কোনো রিসোর্ট পরিচালনা করা যায় না। আইন অনুযায়ী রিসোর্টগুলোর কর্তৃপক্ষকে নোটিশ দেওয়া হয়েছিল। সন্তোষজনক জবাব না পাওয়ায় কার্যক্রম বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে খুলনার ১৮টি, বাগেরহাটের দুটি ও সাতক্ষীরার চারটি রিসোর্ট রয়েছে।”
সুন্দরবনকেন্দ্রিক পর্যটন ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, শুধু স্থাপনা সরিয়ে নিলেই বনের সুরক্ষা নিশ্চিত হবে না। পর্যটন ব্যবস্থাপনা, বনভূমি রক্ষা, খাল ও জলাধার সংরক্ষণ এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) খুলনা জেলার সমন্বয়কারী অ্যাডভোকেট বাবুল হাওলাদার বলেন, “খুলনা অঞ্চলের রিসোর্টগুলো শুধু উচ্ছেদ করলেই হবে না, সুন্দরবনের ভবিষ্যৎ ব্যবস্থাপনা নিয়েও সিদ্ধান্ত নিতে হবে। বিশেষ করে কোন সংস্থা কীভাবে বনভূমি রক্ষা করবে, কোথায় পুনর্বনায়ন হবে, কোন কোন খাল পুনঃখনন বা বাঁধমুক্ত করা হবে এবং কীভাবে স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করা হবে এসব বিষয়ে একটি সমন্বিত পরিকল্পনা প্রয়োজন।”
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক ড. নাজিয়া হাসান বলেন, “সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য রক্ষার পাশাপাশি পানি ও মাটি দূষণ, প্লাস্টিক বর্জ্য এবং পর্যটনের বাড়তি চাপ নিয়ন্ত্রণে গুরুত্ব দিতে হবে। এসব কারণে সুন্দরবনের পরিবেশ দিন দিন ঝুঁকির মুখে পড়ছে। বিশেষ করে পর্যটকেরা বনে গিয়ে উচ্চস্বরে গান-বাজনা করলে বন্যপ্রাণী ও তাদের স্বাভাবিক বিচরণে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। এতে বন্য পাখি ও অন্যান্য প্রাণী তাদের আবাসস্থল হারাচ্ছে। সুন্দরবনের আশপাশে এ ধরনের কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে ভবিষ্যতে পুরো সুন্দরবনের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়তে পারে।”
তিনি আরও বলেন, “অভিযান চালিয়ে স্থাপনা উচ্ছেদ করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। পরে নিয়মিত নজরদারি না থাকলে উচ্ছেদ করা জায়গা আবারও দখল হয়ে যেতে পারে। তাই সুন্দরবনসংলগ্ন এলাকা স্থায়ীভাবে দখলমুক্ত রাখতে বন বিভাগ, স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সমন্বিতভাবে নিয়মিত তদারকি করতে হবে।”