সুপেয় পানির তীব্র সংকট, ক্রমাগত নদীভাঙন, টেকসই বেড়িবাঁধের অভাব, দুর্বল যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং মানসম্মত চিকিৎসাসেবার অপ্রতুলতা— দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের এই দুর্ভোগের অবসান ঘটিয়ে উন্নয়নের জোয়ার আসুক, এমন প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন স্থানীয়রা। আগামীকাল বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের খুলনা ও বাগেরহাট সফর ঘিরে এই অঞ্চলের বাসিন্দাদের মধ্যে নতুন করে আশার সঞ্চার হয়েছে।
দুর্গম নলিয়ানসহ উপকূলীয় এলাকার বাসিন্দারা প্রধানমন্ত্রীর সাথে সাক্ষাতের মাধ্যমে তাদের বিদ্যমান সমস্যাগুলো তুলে ধরতে এবং প্রয়োজনীয় উন্নয়নের দাবি জানাতে আগ্রহী। একই সাথে সুন্দরবনের পরিবেশ সুরক্ষা এবং মোংলাকেন্দ্রিক শিল্পায়ন ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির সম্ভাবনা নিয়েও ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে এলাকায়।
সফরের সূচি অনুযায়ী, সকালে প্রধানমন্ত্রী হেলিকপ্টারের মাধ্যমে সুন্দরবনের হিরণ পয়েন্ট পর্যবেক্ষণ করবেন। এরপর তিনি দাকোপের নলিয়ান মাধ্যমিক বিদ্যালয় মাঠে অবতরণ করবেন। সেখান থেকে নৌপথে তিনি বাগেরহাটের মোংলা নৌঘাঁটিতে পৌঁছাবেন। দুপুরে সেখানে ওয়ার্ড রুমের এক বিশেষ সভায় যোগ দেওয়ার কথা রয়েছে তার। বিকেলে প্রধানমন্ত্রী মোংলা বন্দরের জেটি এবং বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের প্রস্তাবিত অর্থনৈতিক অঞ্চল পরিদর্শন করবেন।
প্রধানমন্ত্রীর এই সফরকে কেন্দ্র করে নলিয়ান ও আশপাশের এলাকার মানুষের মনে প্রবল প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। সুতারখালীর বাসিন্দা সুভাষ দত্ত বলেন, “এলাকায় হাসপাতাল না থাকায় চিকিৎসাসেবা পেতে মানুষকে দুর্ভোগ পোহাতে হয়। এ কারণে সেখানে একটি হাসপাতাল স্থাপনের দাবি জানাতে চান তারা।”
দাকোপের বাসিন্দা ইসরাফিল জানান, এলাকার অন্যতম প্রধান সমস্যা হলো সুপেয় পানির অভাব। তিনি বলেন, “এলাকার অন্যতম বড় সমস্যা সুপেয় পানির সংকট। অনেক মানুষ নদী ও পুকুরের পানি পান করতে বাধ্য হন। নিরাপদ পানির ব্যবস্থা করা গেলে পানিবাহিত রোগের ঝুঁকি কমবে।”
যোগাযোগ ব্যবস্থার করুণ দশা নিয়ে কথা বলেন সুতারখালীর আবুবকর। তিনি জানান, রাস্তাঘাট ভালো না হওয়ায় অসুস্থ রোগীদের হাসপাতালে নিতে চরম ভোগান্তি পোহাতে হয় এবং এর ফলে ব্যবসা-বাণিজ্যও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। এই দুর্ভোগ দূর করতে তিনি বলেন, “এ দুর্ভোগ কমাতে ঢাকুপাড়া থেকে কালক পর্যন্ত পাকা সড়ক নির্মাণের দাবির কথা জানাতে চান তিনি।”
নদীভাঙনের ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন নলিয়ানের সুদ্বীপ বিশ্বাস। তিনি মনে করেন, নদীবেষ্টিত এই জনপদকে রক্ষা করতে টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ এখন সময়ের দাবি। তার মতে, “নদীবেষ্টিত এ অঞ্চলে নদীভাঙন থেকে জনপদ রক্ষায় টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ জরুরি। বেড়িবাঁধের স্থায়ী সমাধান না হলে উপকূলের মানুষের বসতি, জীবিকা ও নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে থাকবে।”
অন্যদিকে, সুন্দরবনের ভেতরে আকরাম পয়েন্টে ভাসমান তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) টার্মিনাল স্থাপনের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের খবরে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন লেখক ও সাংবাদিক মহসিন উল হাকিম। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে তিনি সুন্দরবনে বিষ প্রয়োগ করে মাছ ধরা, হরিণ শিকার এবং অবৈধ শুঁটকি ব্যবসা বন্ধের পাশাপাশি শিল্পায়নের ফলে পরিবেশের ওপর যে প্রভাব পড়বে, তা গুরুত্বের সাথে বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছেন। তার বক্তব্য, “জ্বালানির প্রয়োজন থাকলেও সুন্দরবনের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষায় সর্বোচ্চ সতর্কতা ও দায়িত্বশীলতা জরুরি।”
তবে ভিন্ন মত পোষণ করছেন সংশ্লিষ্ট একদল ব্যক্তি। তাদের মতে, আকরাম পয়েন্টে এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের সম্ভাব্যতা যাচাই এবং মোংলা ইপিজেড এলাকায় শিল্প সম্প্রসারণের উদ্যোগগুলো বাস্তবায়িত হলে বিনিয়োগ বাড়বে এবং কর্মসংস্থানের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে। তারা প্রত্যাশা করছেন, এসব পদক্ষেপ দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি আনবে এবং স্থানীয়দের জন্য চাকরির সুযোগ বৃদ্ধি করবে।
খুলনা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি মো. আব্দুল্লাহ হোসেন বাচ্চু বলেন, “উন্নয়ন প্রকল্পগুলো দ্রুত বাস্তবায়িত হলে খুলনার মানুষ উপকৃত হবেন।”
স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রত্যাশা, প্রধানমন্ত্রীর এই সফর কেবল আনুষ্ঠানিক পরিদর্শন বা বৈঠকের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। বরং সুপেয় পানির সংকট, চিকিৎসাসেবা, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং নদীভাঙনের মতো দীর্ঘদিনের জটিল সমস্যাগুলোর সমাধানে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে। একই সাথে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে মোংলাকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়নকে এগিয়ে নেওয়ার বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব পাবে।