সুন্দরবনের কোল ঘেঁষে অবস্থিত একটি গ্রাম। লোকালয় আর বনের মাঝখানে বয়ে চলেছে ছোট একটি নদী, যার নাম ভোলা। সোমবার সকালে সেই নদীতে মাছ ধরতে যাচ্ছিলেন গ্রামের এক জেলে। তবে নদীতে নামার আগেই চরে এক অভাবনীয় দৃশ্য দেখে থমকে যান তিনি। তিনি দেখতে পান চরজুড়ে বাঘের চলার পায়ের ছাপ। মুহূর্তের মধ্যেই এই খবর পুরো গ্রামে ছড়িয়ে পড়ে। লোকালয়ে বাঘ ঢুকেছে বলে চরম আতঙ্ক সৃষ্টি হয় এবং তাৎক্ষণিকভাবে মসজিদের মাইকের মাধ্যমে সবাইকে সতর্ক করা হয়।
ঘটনাটি ঘটেছে সুন্দরবন-সংলগ্ন বাগেরহাটের শরণখোলা উপজেলায়। সোমবার সকালে এই পরিস্থিতি তৈরি হয়। বন বিভাগের কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে জানিয়েছেন, বাঘটি ভোলা নদী সাঁতরে লোকালয়ে এসে পাড় থেকে প্রায় ৫০০-৬০০ মিটার ঘুরে আবার নদী সাঁতরে সুন্দরবনের দিকে ফিরে গেছে। এ নিয়ে আতঙ্কিত না হয়ে সবাইকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন বন বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
বন বিভাগ, ভিলেজ টাইগার রেসপন্স টিম (ভিটিআরটি) এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছ থেকে জানা গেছে, সোমবার সকালে শরণখোলা উপজেলার সোনাতলা গ্রামের এক জেলে নদীর চরে প্রথম বাঘের পায়ের ছাপ দেখতে পান। পরবর্তীতে সেই ছাপ অনুসরণ করে দেখা যায়, ভোলা নদী সাঁতরে বাঘটি গ্রামের পানির ঘাট এলাকায় উঠেছিল। সেখান থেকে নদীর তীর ধরে উত্তর দিকে প্রায় ৫০০-৬০০ মিটার পর্যন্ত হেঁটেছে বাঘটি। এরপর সে পুনরায় নদীতে নেমে পড়ে।
নদীর চরে যেখানে বাঘের বিচরণ দেখা গেছে, তার পাশেই রয়েছে বেড়িবাঁধ এবং বসতবাড়ি। এই ঘটনার পর পুরো এলাকায় বাঘ-আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। বন বিভাগ এলাকাবাসীকে সতর্ক করতে মাইকিং শুরু করেছে। পাশাপাশি স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবীরাও সাধারণ মানুষকে সচেতন করতে সক্রিয় হয়ে ওঠেন।
সোনাতলা গ্রামের ভিটিআরটি সদস্য আবদুল লতিফ হাওলাদার বলেন, ‘সোমবার সকালে গ্রামের পানিরঘাট এলাকায় বাঘের পায়ের ছাপগুলো দেখতে বন বিভাগ ও ভিটিআরটিকে জানাই। সবাই এসে পায়ের ছাপ দেখে বাঘের বিচরণের বিষয়টি নিশ্চিত হন।’
ওই এলাকার ভিটিআরটির দলনেতা মো. জাকারিয়া হোসাইন জানান, নদীর চরে প্রায় আধা কিলোমিটার এলাকাজুড়ে বাঘের পায়ের ছাপ দেখা গেছে। ছাপগুলো বিশ্লেষণ করে ধারণা করা হচ্ছে, বাঘটি ওই এলাকা দিয়ে চলাচল করে সুন্দরবনের দিকে চলে গেছে। তবে বাঘটি পুরোপুরি বনে ফিরে গেছে কি না, তা নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে এখনো গভীর উদ্বেগ বিরাজ করছে।
ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের শরণখোলা রেঞ্জের কর্মকর্তা (এসিএফ) মো. শরিফুল ইসলাম। তিনি মুঠোফোনে মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘ধারণা করছি, গেল রাতে ভোলা নদী সাঁতরে বাঘটি এই পাড়ে (লোকালয়ে) এসেছিল। পায়ের ছাপ দেখে বাঘটি সুন্দরবনের দিকে ফিরে গেছে বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে।’
মো. শরিফুল ইসলাম আরও বলেন, ‘তবে বাঘটি যে আর আসতে পারে না তা নয়। আবারও আসতে পারে। এখানে নদী পার হয়ে যে কোনো সময় বন্যপ্রাণী আসতে পারে। তাই সবাইকে সতর্ক হতে হবে। যেন বাঘের দ্বারা মানুষের বা মানুষের দ্বারা বাঘের কোনো ক্ষতি না হয়। সে জন্য সবাইকে সতর্ক করে মাইকিং করা হয়েছে। সন্ধ্যার পর যেন কেউ একা একা ঘোরা ফেরা না করেন সে জন্যও বলা হয়েছে। পাশাপাশি বনরক্ষী ও ভিটিআরটি সদস্যরা সার্বক্ষণিক টহল দিচ্ছে।’