পরিবেশগত ছাড়পত্র না থাকা এবং পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ) বিধিমালা লঙ্ঘনের অভিযোগে সুন্দরবন সংলগ্ন খুলনার দাকোপ উপজেলার ঢাংমারী, কৈলাসগঞ্জ ও বাণিশান্তা এলাকায় গড়ে ওঠা ১৮টি রিসোর্ট বন্ধের নির্দেশ দিয়েছে পরিবেশ অধিদপ্তর। এই নির্দেশনার আওতায় আগে চিহ্নিত ১০টি রিসোর্টকে ৩০ দিনের মধ্যে এবং নতুন গড়ে ওঠা ৮টি রিসোর্টকে ১৫ দিনের মধ্যে তাদের সব স্থাপনা সরিয়ে নিতে বলা হয়েছে।
পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে জানানো হয়েছে, এই নির্দেশনা অমান্য করলে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা, বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা, নিয়মিত মামলা দায়ের এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
গত ৪ অক্টোবর পরিবেশ অধিদপ্তর খুলনা জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মো. হারুন-অর-রশীদ সংশ্লিষ্ট রিসোর্ট মালিকদের এই সংক্রান্ত চিঠি প্রদান করেন। চিঠিতে বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫ (সংশোধিত ২০১০) ও সংশ্লিষ্ট বিধিমালা অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এই চিঠিগুলো ডাকযোগে সংশ্লিষ্ট রিসোর্ট মালিকদের কাছে পাঠানো হয়েছে।
অধিদপ্তরের তালিকায় থাকা ১৮টি রিসোর্ট হলো— অরণ্যছায়া, অরণ্যবাড়ী, কেওড়াবন, মায়াবন, গহন, দ্য ফরেস্ট রিট্রিট, নিকুঞ্জ ভ্যালি, লা সিলভা কটেজ, বনবিবি, সুন্দরী, ইরাবতী, বনমালী, গোলকানন, পিয়ালী, ম্যানগ্রোভ, জঙ্গলবাড়ী, বনবাস ও বনলতা ইকো কটেজ।
পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মো. হারুন-অর-রশীদ বলেন, “এসব পর্যটনকেন্দ্রিক প্রতিষ্ঠানের পরিবেশগত ছাড়পত্র নেই। পাশাপাশি ইসিএ বিধিমালা অনুযায়ী ওই এলাকায় এ ধরনের প্রতিষ্ঠান স্থাপনের সুযোগ নেই।”
তিনি আরও বিস্তারিত জানান যে, অনুমোদন ছাড়া রিসোর্ট নির্মাণের অভিযোগে আগে ১০টি প্রতিষ্ঠানকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছিল। রিসোর্ট মালিকরা এর জবাব দেওয়ার পাশাপাশি পরিবেশগত ছাড়পত্রের জন্য আবেদন করেন। তবে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিতে ব্যর্থ হওয়ায় গত ৩০ সেপ্টেম্বর তাদের আবেদন বাতিল করা হয়। এরপরই প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ করে ৩০ দিনের মধ্যে স্থাপনা সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে, নতুন তৈরি হওয়া ৮টি রিসোর্টকে গত ৩০ সেপ্টেম্বর সাত দিনের মধ্যে গ্রহণযোগ্য স্থানে স্থানান্তরের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময়ে দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ না নেওয়ায় এবার তাদের কার্যক্রম বন্ধ এবং ১৫ দিনের মধ্যে স্থাপনা অপসারণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
পরিবেশ অধিদপ্তরের হিসাবে খুলনা অংশে রিসোর্টের সংখ্যা ১৮টি হলেও রিসোর্ট মালিকদের সংগঠনের দাবি, এই সংখ্যা ১৫টি। এ বিষয়ে হারুন-অর-রশীদ বলেন, কিছু রিসোর্ট নির্মিত হয়েছে এবং কিছু নির্মাণাধীন—এমন তথ্যের ভিত্তিতেই অধিদপ্তরের তালিকায় ১৮টি প্রতিষ্ঠান রাখা হয়েছে। তিনি আরও জানান, সুন্দরবন সংলগ্ন বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা অংশেও বেশ কিছু রিসোর্ট রয়েছে, তবে সেগুলো খুলনা জেলা কার্যালয়ের আওতাধীন নয়।
রিসোর্ট মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক জাকারিয়া শাওন বলেন, “আমরা এখনো পরিবেশ অধিদপ্তরের কোনো চিঠি পাইনি। জাহাজগুলো সুন্দরবনের পরিবেশের অনেক ক্ষতি করছে, অথচ আমরা বনের ওপর চাপ কমানোর চেষ্টা করি। পরিবেশের ক্ষতি হয় এমন কোনো কাজ না করে নিয়ম মেনেই আমরা ব্যবসা পরিচালনা করছি।”
এর পরিপ্রেক্ষিতে সহকারী পরিচালক হারুন-অর-রশীদ বলেন, ইসিএ এলাকায় পরিবেশগত বিধিনিষেধ মানা হচ্ছে কি না, তা নজরদারি করা হবে। সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে চলাচলকারী লঞ্চ ও জাহাজের বিষয়টি আলাদা, সেগুলো বন বিভাগের নিয়ন্ত্রণে। তবে ইসিএ এলাকায় স্থায়ী পর্যটন কেন্দ্র নির্মাণের ক্ষেত্রে পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র বাধ্যতামূলক।
পরিবেশ ও সুন্দরবনকেন্দ্রিক পর্যটন নিয়ে কর্মরত বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, শুধু স্থাপনা সরিয়ে নিলেই সুন্দরবনের সুরক্ষা নিশ্চিত হবে না। পর্যটন ব্যবস্থাপনা, বনভূমি রক্ষা, খাল ও জলাধার সংরক্ষণ এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপাক) খুলনা জেলার সমন্বয়কারী অ্যাডভোকেট বাবুল হাওলাদার বলেন, “দাকোপের রিসোর্টগুলো শুধু উচ্ছেদ করলেই হবে না, সুন্দরবনের ভবিষ্যৎ ব্যবস্থাপনা নিয়েও সিদ্ধান্ত নিতে হবে। বিশেষ করে কোন সংস্থা কীভাবে বনভূমি রক্ষা করবে, কোথায় পুনর্বনায়ন হবে, কোন কোন খাল পুনঃখনন বা বাঁধমুক্ত করা হবে এবং কীভাবে স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করা হবে এসব বিষয়ে একটি সমন্বিত পরিকল্পনা প্রয়োজন।”
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক ড. নাজিয়া হাসান বলেন, “সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য রক্ষা, পানি ও মাটি দূষণ, প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং পর্যটনের বাড়তি চাপের কারণে পরিবেশ দিন দিন ঝুঁকির মুখে পড়ছে। তা ছাড়া পর্যটকরা বনে গিয়ে উচ্চস্বরে গান-বাজনা করায় বন্যপ্রাণী ও পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।”
তিনি আরও সতর্ক করে বলেন, অভিযানের পর নিয়মিত নজরদারি না থাকলে উচ্ছেদকৃত জায়গা আবারও দখল হয়ে যেতে পারে। তাই সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকা স্থায়ীভাবে দখলমুক্ত রাখতে বন বিভাগ, স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বিত ও নিয়মিত তদারকি প্রয়োজন।