পরিবেশ অধিদপ্তরের কঠোর নির্দেশের পরেও সুন্দরবনের সংলগ্ন এলাকায় গড়ে ওঠা বিভিন্ন রিসোর্টের স্থাপনাগুলো সরানো হয়নি। পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা বা ইসিএ-তে এই রিসোর্টগুলোর বৈধতা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, শব্দদূষণ এবং বন্যপ্রাণীর নিরাপত্তা নিয়ে ব্যাপক বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। এরই মধ্যে এসব স্থাপনা পরিদর্শন করেছেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী লায়ন ড. শেখ ফরিদুল ইসলাম। পরিদর্শন শেষে তিনি জানান, রিসোর্টগুলোর ভবিষ্যৎ পরিচালনা পদ্ধতি নিয়ে মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
গত বুধবার (৪ নভেম্বর) সুন্দরবনের সংলগ্ন দাকোপ এলাকার বিভিন্ন রিসোর্ট পরিদর্শন করেন প্রতিমন্ত্রী। পরিদর্শনকালে তিনি স্পষ্টভাবে বলেন, “সুন্দরবনের প্রাণপ্রকৃতির জন্য ক্ষতিকর কোনো কর্মকাণ্ড মেনে নেওয়া হবে না। রিসোর্টে রাতের বেলায় উচ্চ শব্দে গান-বাজনা, শব্দদূষণ, বন্যপ্রাণী শিকার কিংবা অন্য কোনো অবৈধ কর্মকাণ্ডের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রয়োজনে রিসোর্টের কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হবে।”
প্রতিমন্ত্রী জানান, রিসোর্টগুলোর নির্মাণে কংক্রিটের ব্যবহার হয়েছে কি না এবং বনের নীরবতা ও বন্যপ্রাণীর স্বাভাবিক বিচরণে কোনো বিঘ্ন ঘটছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে তিনি এসেছেন। পরিদর্শনের পর তার মনে হয়েছে যে, অধিকাংশ স্থাপনা কাঠ ও গোলপাতা দিয়ে তৈরি করা হয়েছে। পাশাপাশি কিছু প্রতিষ্ঠান তাদের ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আনার চেষ্টা করছে। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, পরিবেশের ক্ষতি করে এমন কোনো কর্মকাণ্ডের সুযোগ দেওয়া হবে না।
তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, সুন্দরবনের পাশে ডলফিনের অবাধ বিচরণ এবং বনের স্বাভাবিক নীরবতা বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি। বিশেষ করে রাতে উচ্চ শব্দে গান-বাজনা এবং জেনারেটর চালানো নিরুৎসাহিত করতে হবে। রিসোর্টগুলোতে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের সুযোগ থাকায় সে বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেন তিনি। কারণ জেনারেটরের শব্দ বন্যপ্রাণীদের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর হতে পারে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জেনারেটরের শব্দসহ বিভিন্ন বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করেছেন প্রতিমন্ত্রী। তার মতে, সামগ্রিকভাবে রিসোর্টগুলোর ব্যবস্থাপনায় পরিবেশের প্রতি দায়বদ্ধতার চেষ্টা দেখা গেছে। তবে তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, কোনো ধরনের অনিয়ম বা অবৈধ কর্মকাণ্ডের প্রমাণ পাওয়া গেলে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পরিদর্শনের অভিজ্ঞতার আলোকে মন্ত্রী ও মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনার পর পরবর্তী সিদ্ধান্ত জানানো হবে।
এর আগে, পরিবেশগত ছাড়পত্র না থাকা এবং পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ) বিধিমালা লঙ্ঘনের অভিযোগে সুন্দরবন সংলগ্ন খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরার মোট ২৪টি রিসোর্টের কার্যক্রম বন্ধের নির্দেশ দিয়েছিল পরিবেশ অধিদপ্তর। এর মধ্যে খুলনার দাকোপে ১৮টি, বাগেরহাটে দুটি এবং সাতক্ষীরায় চারটি রিসোর্ট রয়েছে। নির্দেশনায় কিছু প্রতিষ্ঠানকে ১৫ দিন এবং কিছু প্রতিষ্ঠানকে ৩০ দিনের মধ্যে স্থাপনা সরিয়ে নিতে বলা হয়েছিল। কিন্তু সেই নির্দেশনার পরও স্থাপনা অপসারণের কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
গত ৪ অক্টোবর পরিবেশ অধিদপ্তর খুলনা জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মো. হারুন-অর-রশীদ দাকোপ উপজেলার ঢাংমারী, কৈলাসগঞ্জ ও বাণিশান্তা এলাকায় গড়ে ওঠা ১৮টি রিসোর্টের মালিকদের চিঠি পাঠিয়েছিলেন। ওই চিঠিতে বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫ (সংশোধিত ২০১০) এবং সংশ্লিষ্ট বিধিমালা অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়।
পরিবেশ অধিদপ্তরের অভিযোগ অনুযায়ী, এসব রিসোর্টে পর্যটকদের ব্যবহৃত প্লাস্টিক, পলিথিন ও খাবারের প্যাকেট ফেলা হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে পয়োনিষ্কাশনের বর্জ্য সরাসরি নদীর পানিতে মিশছে। এছাড়া রিসোর্ট নির্মাণের সময় গাছ কাটার অভিযোগও রয়েছে। এই সব কর্মকাণ্ড সুন্দরবনের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। উল্লেখ্য, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর কোনো পরিবেশগত ছাড়পত্র নেই।
অধিদপ্তরের তালিকায় থাকা খুলনার ১৮টি রিসোর্ট হলো— অরণ্যছায়া, অরণ্যবাড়ি, কেওড়াবন, মায়াবন, গহন, দ্য ফরেস্ট রিট্রিট, নিকুঞ্জ ভ্যালি, লা সিলভা কটেজ, বনবিবি, সুন্দরী, ইরাবতী, বনমালী, গোল কানন, পিয়ালী, ম্যানগ্রোভ, জঙ্গলবাড়ী, বনবাস ও বনলতা ইকো কটেজ।
মুক্তকণ্ঠকে পরিবেশ অধিদপ্তরের খুলনা জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মো. হারুন-অর-রশীদ জানান, রিসোর্টগুলো এখনো চালু রয়েছে, কোনোটি বন্ধ করা হয়নি। আজ পরিবেশ প্রতিমন্ত্রী এসব রিসোর্ট পরিদর্শন করেছেন। পরিদর্শনের বিষয়টি তিনি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অবহিত করবেন এবং তাদের সিদ্ধান্ত পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) খুলনা জেলার সমন্বয়কারী অ্যাডভোকেট বাবুল হাওলাদার মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “শুধু রিসোর্ট উচ্ছেদ করলেই সুন্দরবন রক্ষা করা সম্ভব নয়। বনভূমি সংরক্ষণ, পুনর্বনায়ন, খাল পুনঃখনন, জলাধার রক্ষা এবং স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করে দীর্ঘমেয়াদি সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।”
তিনি আরও বলেন, সংবিধানের ১৮(ক) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী পরিবেশ সংরক্ষণে সরকার দায়বদ্ধ। পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫-এর আওতায় সুন্দরবনের চারপাশের ১০ কিলোমিটার এলাকাকে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ) ঘোষণা করা হয়েছে। এই এলাকায় পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের জন্য ক্ষতিকর কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণে সরকারের কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে।
বাবুল হাওলাদার আরও উল্লেখ করেন, সুন্দরবনের পরিবেশ রক্ষায় শুধু স্থাপনা অপসারণ নয়, বনের ভেতর ও আশপাশে সব ধরনের দূষণ এবং পরিবেশ বিধ্বংসী কর্মকাণ্ড বন্ধে কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন। বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা আইনেও সুন্দরবনের প্রাণিকুল রক্ষার বিধান রয়েছে। সুন্দরবনের মধ্য দিয়ে জাহাজ চলাচলের শব্দ বন্যপ্রাণীর স্বাভাবিক বিচরণ ও প্রজননে ব্যাঘাত ঘটাতে পারে। তাই সুন্দরবন রক্ষায় পর্যটন ব্যবস্থাপনা জোরদার এবং পরিবেশদূষণ নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক ড. নাজিয়া হাসান মুক্তকণ্ঠকে বলেন, সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় পানি ও মাটিদূষণ, প্লাস্টিক বর্জ্য এবং পর্যটকদের বাড়তি চাপ নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি। বনে গিয়ে উচ্চ স্বরে গান-বাজনা করলে বন্যপ্রাণীর স্বাভাবিক বিচরণ ও আবাসস্থল ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। শুধু অভিযান চালিয়ে স্থাপনা উচ্ছেদ করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। পরবর্তী সময়ে নিয়মিত নজরদারি না থাকলে উচ্ছেদ করা জায়গা আবারও দখল হয়ে যেতে পারে। এ জন্য বন বিভাগ, স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বিত তদারকি প্রয়োজন।