সাইবার অপরাধ দমনে শক্তিশালী আইনের প্রয়োজনীয়তা থাকলেও এর অস্পষ্ট ও বিস্তৃত বিধান যেন রাজনৈতিক ভিন্নমত দমনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত না হয়। প্রস্তাবিত সাইবার সুরক্ষা আইন নিয়ে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় বক্তারা এই উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন। তাঁদের মতে, অপরাধ দমনে রাষ্ট্রকে প্রয়োজনীয় ক্ষমতা প্রদান করতে হবে, তবে সেই ক্ষমতার ওপর কার্যকর বিচারিক তদারকি এবং সুনির্দিষ্ট সীমারেখা থাকা অপরিহার্য।

আজ মঙ্গলবার জাতীয় প্রেসক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে এবি পার্টি লইয়ার্সের উদ্যোগে ‘প্রস্তাবিত সাইবার সুরক্ষা আইন: নিরাপত্তা বনাম হেনস্তা’ শীর্ষক এই মতবিনিময় সভাটি অনুষ্ঠিত হয়।

সভায় বক্তারা উল্লেখ করেন যে, হ্যাকিং, অনলাইন প্রতারণা, ব্যক্তিগত তথ্য চুরি, ম্যালওয়্যার, র‌্যানসমওয়্যার, সাইবার হয়রানি এবং শিশুদের অনলাইন নিরাপত্তার মতো বাস্তব হুমকিগুলো মোকাবিলা করতে কার্যকর আইনের প্রয়োজন রয়েছে। তবে ‘গুজব’, ‘মিসইনফরমেশন’, ‘অপমান’ কিংবা ‘রাষ্ট্রবিরোধী’ বক্তব্যের মতো অস্পষ্ট সংজ্ঞার সুযোগ নিয়ে বৈধ রাজনৈতিক সমালোচনা বা জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট বক্তব্যকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করার সুযোগ রাখা উচিত নয় বলে তাঁরা মত দেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক নকীব মোহাম্মদ নসরুল্লাহ তাঁর বক্তব্যে বলেন, “২০২৬ সালের প্রস্তাবিত সাইবার সুরক্ষা আইনটি ২০১৮ সালের আইন, ২০২৫ সালের অধ্যাদেশ ও পরবর্তী সংশোধনীর ধারাবাহিকতার সর্বশেষ সংস্করণ। এতে ভুল থাকার আশঙ্কা রয়েছে। এর মাধ্যমে রাষ্ট্রের ক্ষমতা আরও কর্তৃত্ববাদী হয়ে ওঠার ঝুঁকিও আছে। প্রস্তাবিত সংশোধনীগুলোকে এমনভাবে করা উচিত নয়, যাতে তা পূর্ববর্তী ফ্যাসিস্ট সরকারের আইন ও চর্চার ধারাবাহিকতা হিসেবে বিবেচিত হয়।”

এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান ফুয়াদ বলেন, সাইবার অপরাধ দমনের অজুহাতে নাগরিকের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং রাজনৈতিক ভিন্নমত দমন করা যাবে না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ইমোজি ব্যবহার, রাজনৈতিক সমালোচনা কিংবা সরকারের কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন তোলাকে সাইবার অপরাধ হিসেবে গণ্য করার সুযোগ রাখা উচিত নয় বলে তিনি মনে করেন।

আসাদুজ্জামান ফুয়াদ আরও বলেন, “সাধারণ নাগরিক সরকারের সমালোচনা করতে পারবেন কি না, সন্ত্রাসকে সন্ত্রাস বললে তাঁদের বিরুদ্ধে মানহানির অভিযোগ হবে কি না, পুলিশ আসামি ছেড়ে দিয়েছে বললে পুলিশের মানহানি হবে কি না, এসব প্রশ্নেরও স্পষ্ট উত্তর থাকতে হবে।”

পূর্ববর্তী সরকারের ডিজিটাল আইন সংক্রান্ত ভুলগুলোর পুনরাবৃত্তি যেন বর্তমান সরকার না করে, সেই আহ্বান জানিয়ে এবি পার্টির এই নেতা বলেন, “অন্তর্বর্তী সরকারের প্রণীত সাইবার অধ্যাদেশে থাকা ইতিবাচক বিষয় বাদ দিয়ে আবার কেন সংশোধন করা হচ্ছে, সরকারকে তার ব্যাখ্যা দিতে হবে।”

প্রস্তাবিত সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) আইন, ২০২৬-এর খসড়া নিয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) এবং ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ননপ্রফিট ল (আইসিএনএল)-সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে বলে উল্লেখ করেন এবি পার্টির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ আল মামুন। তিনি বলেন, বাংলাদেশে একটি শক্তিশালী সাইবার সিকিউরিটি আইন প্রয়োজন। হ্যাকিং, ফাইন্যান্সিয়াল ফ্রড, আইডেন্টিটি থেফট এবং ক্রিটিক্যাল ইনফ্রাস্ট্রাকচারের ওপর সাইবার হামলার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রকে কঠোর ব্যবস্থা নিতেই হবে। তবে সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গিয়ে নাগরিকের স্বাধীনতাকে অনিরাপদ করে তোলা যাবে না বলে তিনি সতর্ক করেন।

সাইবার সুরক্ষা আইন চূড়ান্ত করার আগে সরকারের প্রতি পাঁচটি বিশেষ আহ্বান জানান আবদুল্লাহ আল মামুন। তাঁর দাবিগুলো হলো— ব্যাপক ও অর্থবহ জনপরামর্শ গ্রহণ করা; ‘গুজব’, ‘ভুল তথ্য’ ও ‘রাষ্ট্রবিরোধী’র মতো অস্পষ্ট শব্দের অপব্যবহার বন্ধ করা; কনটেন্ট বন্ধ বা সরানোর ক্ষেত্রে আদালতের অনুমোদন ও কার্যকর বিচারিক পর্যালোচনা নিশ্চিত করা; সরকারের সমালোচনা, ভিন্নমত, সাংবাদিকতা ও জনস্বার্থে তথ্য প্রকাশকে সাইবার অপরাধ গণ্য না করা এবং নাগরিকের ডিজিটাল অধিকার রক্ষায় স্বাধীন তদারকি ব্যবস্থা গড়ে তোলা।

মতবিনিময় সভায় সভাপতিত্ব করেন এবি পার্টির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক যোবায়ের আহমেদ ভূইয়া এবং সঞ্চালনা করেন আব্বাস ইসলাম খান। স্বাগত বক্তব্য প্রদান করেন দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ আল মামুন।