ক্ষমতাসীন সরকার যখন সমালোচকদের দমনে আইন প্রণয়নের চেষ্টা করে, তখন তারা ভুলে যায় যে ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয় এবং ক্ষমতা হারানোর পর তারাই অনেক সময় অন্যায়ের শিকার হন। এমন মন্তব্য করেছেন সংবাদপত্র মালিকদের সংগঠন নিউজপেপার্স ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (নোয়াব) সভাপতি ও মানবজমিনের প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী।
আজ রোববার সকালে রাজধানীর ধানমন্ডিতে অবস্থিত ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) কার্যালয়ে প্রস্তাবিত সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) আইন নিয়ে আয়োজিত এক গোলটেবিল বৈঠকে তিনি এই কথাগুলো বলেন। উক্ত বৈঠকের আয়োজনে ছিল টিআইবি, ব্রাক, ব্লাস্ট এবং মহিলা পরিষদসহ মোট ১৮টি সংগঠন।
সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে মতিউর রহমান চৌধুরী বলেন, ‘দয়া করে আমাদের হাতটা আবার বাঁধবেন না। হাত বেঁধে দিলে আপনার ক্ষতি হবে। আপনার জন্য কিন্তু আমি আর লিখতে পারব না। আপনাকে একদিন আমাদের কাছে আবার আসতে হবে।’
পৃথিবীতে কোনো শক্তি বা ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয় বলে উল্লেখ করেন তিনি। তাই ভবিষ্যতের কথা মাথায় রেখে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে আইন প্রণয়ন করা উচিত বলে তিনি মনে করেন। সাইবার অপরাধ দমনে আইনের প্রয়োজনীয়তার কথা স্বীকার করলেও মানবজমিনের প্রধান সম্পাদক জোর দিয়ে বলেন যে, সরকারের সমালোচনা এবং প্রকৃত সাইবার অপরাধের মধ্যে একটি স্পষ্ট পার্থক্য থাকতে হবে। তাঁর মতে, একটি গণতান্ত্রিক সমাজে সরকারের সমালোচনা হওয়া স্বাভাবিক এবং অনিবার্য। যদি এই দুইয়ের মধ্যে পার্থক্য করা না যায়, তবে বড় ধরনের বিপদ থেকে যাবে।
প্রস্তাবিত সাইবার সুরক্ষা আইনের একটি বিশেষ দিক নিয়ে প্রশ্ন তোলেন নোয়াব সভাপতি। কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত অপরাধের কারণে পুরো সংবাদপত্র বা অনলাইন নিউজ পোর্টাল বন্ধ করে দেওয়ার যে সুযোগ রাখা হয়েছে, তা নিয়ে তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন। আইনের প্রয়োগের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাবের ঝুঁকি নিয়ে তিনি সতর্ক করে বলেন, স্থানীয় পর্যায়ের ক্ষমতাসীন দলের নেতার একটি ফোনের মাধ্যমেই কাউকে গ্রেপ্তার করার পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
এছাড়া প্রস্তাবিত আইনে ‘ভুল তথ্য’ শব্দটির সংজ্ঞা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন মতিউর রহমান চৌধুরী। তিনি মনে করেন, কোনো সংবাদ যদি কারও পছন্দ না হয়, তবে খুব সহজেই সেটিকে ভুল তথ্য বা কাউকে হেয় করার উদ্দেশ্যে প্রকাশিত সংবাদ হিসেবে দাবি করা হতে পারে। এই পরিস্থিতিতে কোনটি প্রকৃতপক্ষে ইচ্ছাকৃত ভুল তথ্য, তা নির্ধারণ করার দায়িত্ব কার এবং সেই প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা কোথায়, তা স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।
সাংবাদিকদের বিচারের ক্ষেত্রে মোবাইল কোর্ট বা ভ্রাম্যমাণ আদালতের ক্ষমতা দেওয়ার প্রস্তাবের তীব্র বিরোধিতা করেন তিনি। এই প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘ভেজাল ওষুধ যাঁরা তৈরি করেন, তাঁদের ধরার জন্য যে ভ্রাম্যমাণ আদালতকে ব্যবহার করা হয়—সেই আদালতের কাছে আপনি সাংবাদিকের বিচারের ক্ষমতা দিচ্ছেন! এইটা কী করে একটা গণতান্ত্রিক সমাজে চিন্তা করা যেতে পারে?’
প্রস্তাবিত আইনটি চূড়ান্ত করার আগে জেলা পর্যায়ে বিস্তারিত আলোচনা এবং সমাজের সর্বস্তরের মানুষের মতামত গ্রহণের আহ্বান জানান মতিউর রহমান চৌধুরী। তিনি আরও বলেন, আইন প্রণয়নের জন্য যে কমিটি গঠিত হবে, সেখানে সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি ও পেশার মানুষের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান উক্ত গোলটেবিল বৈঠকটি পরিচালনা করেন। অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের (ডিইউজে) সভাপতি মো. শহিদুল ইসলাম, ডেইলি ওয়াদা সম্পাদক শফিকুল আলম, অনলাইন এডিটর্স ফোরামের আহ্বায়ক শরিফুজ্জামান পিন্টু এবং টেক গ্লোবাল ইনস্টিটিউটের বাংলাদেশ প্রধান ফৌজিয়া আফরোজসহ অনেকে।