জাতীয় অখণ্ডতা, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের জন্য ক্ষতিকর কিংবা জনস্বার্থ ক্ষুণ্ন করে এমন সংবাদ প্রকাশের বিরুদ্ধে স্বপ্রণোদিত হয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার আইনি ক্ষমতা প্রত্যাশা করছে বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিল। গুজব, ভুয়া খবর কিংবা ঘৃণামূলক বক্তব্য ছড়ানোর বিরুদ্ধেও নিজেদের একই ধরনের ক্ষমতা থাকা প্রয়োজন বলে মনে করে এই সংস্থাটি। পাশাপাশি, শাস্তি হিসেবে সাংবাদিকদের আর্থিক জরিমানার বিধানও আইনে যুক্ত করার প্রস্তাব দিয়েছে তারা।
তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে প্রেস কাউন্সিলের জমা দেওয়া একটি প্রতিবেদনে এসব দাবি উত্থাপিত হয়েছে। তবে প্রতিবেদনটি নিয়ে সংসদীয় কমিটিতে এখন পর্যন্ত কোনো আলোচনা হয়নি।
সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, সংবাদপত্র ও সংবাদ সংস্থার মানোন্নয়ন এবং সংবাদপত্রের স্বাধীনতা রক্ষার লক্ষ্যেই বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিল গঠিত হয়েছিল। তবে সরকারি এই সংস্থাটি কখনোই সংবাদপত্রের স্বাধীনতা রক্ষায় কার্যকর ভূমিকা পালন করতে দেখা যায়নি। বরং ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তারা এমনভাবে আইন সংশোধনের প্রস্তাব তৈরি করেছিল, যাকে সাংবাদিকরা সংবাদপত্রের স্বাধীনতা হরণের একটি প্রচেষ্টা হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন। বর্তমানে সংস্থাটি পুনরায় যেসব ক্ষমতার দাবি জানাচ্ছে, তা পূর্বের সেই চেষ্টারই পুনরাবৃত্তি বলে মনে করা হচ্ছে। প্রেস কাউন্সিলকে স্বপ্রণোদিত হয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা দেওয়া হলে তা স্বাধীন সাংবাদিকতা ও গণতান্ত্রিক চর্চার পরিপন্থী হবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
প্রেস কাউন্সিলের প্রস্তাবে উল্লেখ করা হয়েছে, “বর্তমান অবাধ তথ্যপ্রবাহের যুগে ব্যাপকভাবে সম্প্রসারিত ও স্মার্ট, আধুনিক গণমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষা, মানোন্নয়ন, মান সংরক্ষণসহ অপসাংবাদিকতা ও অপপ্রচার প্রতিরোধে ১৯৭৪ সালের প্রেক্ষাপটে প্রণীত দ্য প্রেস কাউন্সিল অ্যাক্ট যুগোপযোগী করা অত্যন্ত জরুরি।” এই উদ্দেশ্যে আইনে কিছু নতুন এখতিয়ার বা ক্ষমতা অন্তর্ভুক্ত করার কথা বলা হয়েছে, যেখানে মোট ১৯টি ক্ষমতার বিষয় তুলে ধরা হয়েছে।
সূত্র অনুযায়ী, গত মঙ্গলবার সংসদীয় কমিটির আলোচ্যসূচির একটি বিষয় ছিল তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ সংস্থাগুলোর কার্যক্রম আরও গতিশীল ও গণমুখী করার উপায় নিয়ে আলোচনা। এর প্রেক্ষিতে তথ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন ১৪টি প্রতিষ্ঠান লিখিত প্রস্তাব জমা দেয়। তার মধ্যে একটি ছিল ‘বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিলের সার্বিক কার্যক্রম আরও গতিশীল ও গণমুখীকরণের লক্ষ্যে সুস্পষ্ট প্রস্তাবনা’। প্রেস কাউন্সিলের সচিব (তথ্য মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব) মো. আবদুস সবুরের স্বাক্ষরিত প্রতিবেদনটি কমিটিতে পেশ করা হয়।
প্রেস কাউন্সিলের ওই প্রস্তাবে পুনরায় বলা হয়েছে, “বর্তমান অবাধ তথ্যপ্রবাহের যুগে ব্যাপকভাবে সম্প্রসারিত ও স্মার্ট, আধুনিক গণমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষা, মানোন্নয়ন, মান সংরক্ষণসহ অপসাংবাদিকতা ও অপপ্রচার প্রতিরোধে ১৯৭৪ সালের প্রেক্ষাপটে প্রণীত দ্য প্রেস কাউন্সিল অ্যাক্ট যুগোপযোগী করা অত্যন্ত জরুরি।” এই লক্ষ্যেই ১৯টি নতুন এখতিয়ারের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
উল্লেখ্য, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়েও এ ধরনের বিধান করার চেষ্টা করা হয়েছিল। বর্তমান সময়ে পুনরায় একই ধরনের প্রচেষ্টা চালানো হলে তা হবে দুর্ভাগ্যজনক বলে মনে করা হচ্ছে।
প্রস্তাবিত ক্ষমতাগুলোর মধ্যে রয়েছে সাংবাদিকদের নিবন্ধন ও সনদ প্রদান, ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্ধারণ, অনলাইন সংবাদমাধ্যমকে কাউন্সিলের আওতায় আনা এবং সাংবাদিকদের জন্য আচরণবিধি প্রণয়ন। এছাড়া স্বাধীন সাংবাদিকতায় বাধা ও হামলার ঘটনায় তদন্ত এবং সুরক্ষা দেওয়ার ক্ষমতা চাওয়া হয়েছে। পাশাপাশি, প্রেস কাউন্সিলের আর্থিক স্বনির্ভরতার লক্ষ্যে সংবাদপত্রের প্রচারসংখ্যার ভিত্তিতে লেভি বা চাঁদা আদায়ের ক্ষমতা দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কিছু বিশেষ ক্ষেত্রে প্রেস কাউন্সিলকে স্বপ্রণোদিত হয়ে তদন্ত ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা দেওয়া প্রয়োজন।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের আগে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেও প্রেস কাউন্সিল আইন সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। ২০২২ সালের জুনে সংশোধনের খসড়াটি মন্ত্রিসভায় নীতিগত অনুমোদন পেলেও শেষ পর্যন্ত তা কার্যকর হয়নি। সে সময় অর্থদণ্ডের বিধান এবং স্বপ্রণোদিতভাবে অপরাধ আমলে নেওয়ার ক্ষমতা দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছিল। শুরুতে ১০ লাখ টাকা অর্থদণ্ডের কথা বলা হলেও মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের সময় টাকার পরিমাণটি বাদ দেওয়া হয়।
আওয়ামী লীগ আমলের এই উদ্যোগের তীব্র সমালোচনা করা হয়েছিল। সংবাদপত্র মালিকদের সংগঠন নোয়াব আপত্তি জানিয়ে বলেছিল, “প্রস্তাবিত সংশোধনী অস্পষ্ট এবং তাই অপব্যবহারের সুযোগ আছে। বিশেষ করে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের জন্য হানিকর বা অবমাননাকর বিষয়টি বলা হয়েছে; কিন্তু এর সঠিক ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি।”
সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে দেওয়া প্রেস কাউন্সিলের প্রস্তাবের বিষয়ে জানতে চাইলে নোয়াবের সভাপতি ও দৈনিক মানবজমিন পত্রিকার প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “প্রেস কাউন্সিল বা কোনো প্রতিষ্ঠানকে স্বপ্রণোদিত হয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা দেওয়া হলে আইন-আদালতের প্রয়োজনীয়তা থাকে না। যেভাবে আইনি ক্ষমতা দেওয়ার কথা বলা হচ্ছে, তা গণতান্ত্রিক চর্চা ও স্বাধীন সাংবাদিকতার পথে অন্তরায় হবে। অতীতে আওয়ামী লীগের আমলেও এ ধরনের বিধান করার চেষ্টা করা হয়েছিল। এখনো একই ধরনের চেষ্টা হলে সেটা হবে দুর্ভাগ্যজনক।” তিনি আরও বলেন, এখন প্রেস কাউন্সিলের যে ক্ষমতা আছে, সেটাই তারা প্রয়োগ করতে পারে না। অনেকে এই প্রতিষ্ঠানকে ঠুঁটো জগন্নাথ বলে মনে করেন। আইন সংশোধন করতে হলে অবশ্যই আগে অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করতে হবে।
বর্তমানে প্রেস কাউন্সিল একটি আধা বিচারিক প্রতিষ্ঠান। প্রেস কাউন্সিল প্রস্তাব করেছে যে, জেলা জজ মর্যাদার একজন বিচারককে কাউন্সিলের সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করে সাংবাদিকদের অধিকার সুরক্ষা ও পেশাগত অসদাচরণের বিচার শুধু প্রেস কাউন্সিলের অধীনে সম্পন্ন করার ক্ষমতা দেওয়া প্রয়োজন। এছাড়া “মিথ্যা, হয়রানিমূলক, সাংবাদিকতার নীতিনৈতিকতা ও জনরুচি পরিপন্থী সংবাদ প্রকাশ বা আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে শাস্তি হিসেবে আর্থিক জরিমানাসহ কার্যকর বিধান আইনে অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন” বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।
স্বপ্রণোদিত তদন্তের ক্ষমতা কোন কোন ক্ষেত্রে চাওয়া হয়েছে, তা প্রতিবেদনে স্পষ্ট করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়, “সংবাদপত্র, সংবাদ সংস্থা, সম্পাদক, প্রকাশক, সাংবাদিক কর্তৃক দেশের জাতীয় অখণ্ডতা, স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্বের জন্য ক্ষতিকর, জনরুচি ও সাংবাদিকতার আচরণবিধি পরিপন্থী কিংবা জনস্বার্থ ক্ষুণ্ন হয় এমন সংবাদ/প্রতিবেদন প্রকাশ/ছাপানো কিংবা গুজব, ভুয়া খবর বা ঘৃণামূলক বক্তব্য ছড়ানো হলে, তার বিরুদ্ধে কাউন্সিল কর্তৃক স্বপ্রণোদিত তদন্ত, আদেশ প্রদানসহ প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করার এখতিয়ার/ক্ষমতা আইনে অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন।”
এতে আরও বলা হয়েছে, স্বাধীন সংবাদ প্রচার ও স্বাধীন সাংবাদিকতায় হস্তক্ষেপ, হামলা, মব ইত্যাদির বিরুদ্ধে সংক্ষুব্ধ সংবাদপত্রের প্রকাশক/সম্পাদক প্রেস কাউন্সিলে অভিযোগ দায়ের করার পরিপ্রেক্ষিতে অথবা সংবাদপত্রের স্বাধীনতা লঙ্ঘনের বিষয়ে বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরি হলে স্বপ্রণোদিতভাবে তদন্ত ও প্রয়োজনীয় সুরক্ষা দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়ার এখতিয়ার প্রেস কাউন্সিলের প্রয়োজন।
অভিযোগ দ্রুত নিষ্পত্তির লক্ষ্যে আইনে একটি নতুন বিধানের প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, প্রেস কাউন্সিলে কোনো সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি অভিযোগ দায়ের করার পর প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে কাউন্সিল বিষয়টি সংশ্লিষ্ট সংবাদপত্রের সম্পাদকের কাছে মীমাংসার নির্দেশনা দেবে। এর পরিপ্রেক্ষিতে সম্পাদক অভিযোগকারীর সঙ্গে আলোচনা করে বিষয়টি সুরাহা করবেন।
তবে প্রেস কাউন্সিলকে বিচারিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে উপস্থাপনের প্রচেষ্টাকে বিভ্রান্তি হিসেবে দেখা হচ্ছে। প্রেস কাউন্সিল মূলত তথ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন একটি সংস্থা, তাই তাকে স্বপ্রণোদিত হয়ে আদেশ দেওয়ার ক্ষমতা দেওয়া যায় না বলে মনে করা হয়।
বর্তমানে আধা বিচারিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রেস কাউন্সিল জেলা জজ মর্যাদার বিচারককে সদস্য করে সাংবাদিকদের অধিকার সুরক্ষা ও পেশাগত অসদাচরণের বিচার নিজস্ব অধীনে সম্পন্ন করার ক্ষমতা চেয়েছে। মিথ্যা, হয়রানিমূলক ও নীতি পরিপন্থী সংবাদ প্রকাশের জন্য আর্থিক জরিমানাসহ কার্যকর শাস্তির বিধান আইনে যুক্ত করার কথা বলা হয়েছে।
সাংবাদিকদের জন্য আচরণবিধি প্রণয়নের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে প্রস্তাবে বলা হয়েছে, সাংবাদিকদের আচরণবিধি প্রতিপালনের বাধ্যবাধকতা না থাকায় এখন তাঁরা সাংবাদিকতার নীতিনৈতিকতা মেনে বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ প্রচার এবং দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা চর্চায় সচেতন নন। এ জন্য আচরণবিধি গেজেটে প্রকাশের বিধান আইনে যুক্ত করা প্রয়োজন এবং এই আচরণবিধি তৈরি করবে কাউন্সিল।
প্রস্তাবে আরও বলা হয়েছে, সাংবাদিকেরা একই সঙ্গে অন্য পেশায় নিয়োজিত থাকেন, যা সাংবাদিকতার নীতিমালা ও নৈতিকতার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন এবং চরম পেশাগত অসদাচরণ। কোনো সাংবাদিক একই সময়ে দুই বা ততোধিক পেশায় নিয়োজিত হলে সাংবাদিকতার পেশাগত মান ও মর্যাদা ক্ষুণ্ন হয়। এই বিষয়টি সুস্পষ্ট করে প্রেস কাউন্সিল আইনে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানানো হয়েছে।
এই প্রস্তাবগুলোর বিষয়ে সাবেক গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের প্রধান কামাল আহমেদ মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “প্রেস কাউন্সিলকে বিচারিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখানোর মতো একটি বিভ্রান্তি দেখা যাচ্ছে। প্রেস কাউন্সিল তথ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন একটি সংস্থা। তাকে স্বপ্রণোদিত হয়ে আদেশ দেওয়ার ক্ষমতা দেওয়া যায় না।” তিনি প্রশ্ন তোলেন, সম্প্রচারমাধ্যমকে প্রেস কাউন্সিলের আওতায় আনার কথা বলা হয়নি, তবে এর জন্য কি আলাদা কর্তৃপক্ষ করা হবে?
কামাল আহমেদ আরও বলেন, এ বিষয়ে গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের যে প্রস্তাব ছিল, তা বর্তমান সরকারের গ্রহণ করা উচিত। কিন্তু এখন যেভাবে প্রস্তাব করা হয়েছে, সেখানে খণ্ডিতভাবে কিছু বিষয় রাখা হচ্ছে। প্রেস কাউন্সিলের মতো ব্যর্থ প্রতিষ্ঠানকে এভাবে পুনরুজ্জীবনে গণমাধ্যমের কোনো উপকার হবে না; বরং এর বিলোপ ঘটিয়ে বিএনপির প্রতিশ্রুত কমিশন গঠন করা উচিত, যা হবে স্বাধীন ও স্থায়ী প্রতিষ্ঠান।