বর্তমান সময়ে অনেকের মনেই এই প্রশ্ন জাগে যে, সাংবাদিকতা ও সংবাদমাধ্যমের ভবিষ্যৎ আসলে কী? এই জিজ্ঞাসার মূলে রয়েছে মূলত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অভাবনীয় বিস্তার, যার ফলে তথ্যপ্রবাহের ওপর প্রচলিত গণমাধ্যমের যে একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ বা প্রভাব ছিল, তা ক্রমশ আলগা হয়ে আসছে। ইন্টারনেট এবং স্মার্টফোনের সহজলভ্যতার কারণে নির্দিষ্ট সময়ে টেলিভিশনের সামনে বসা কিংবা সকালের খবরের কাগজের জন্য অপেক্ষা করার দিন এখন অতীত। এখন যেকোনো ঘটনা, দুর্ঘটনা বা অঘটন ঘটার মুহূর্তের মধ্যেই ছবি ও ভিডিওসহ সেই খবর বিশ্বের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে পৌঁছে যাচ্ছে।
স্মার্টফোনের জনপ্রিয়তার পর থেকেই নাগরিক সাংবাদিকতার প্রসারের কথা বলা শুরু হয়। অনেক প্রতিষ্ঠিত সংবাদমাধ্যম তখন 'ক্রাউডসোর্সিং' নামক পদ্ধতির আশ্রয় নেয়, যার মাধ্যমে সাধারণ মানুষের তোলা ছবি ও ভিডিও সংবাদের কাজে ব্যবহার করা শুরু হয়। উল্লেখ্য, ২০১৬ সালে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের একটি গবেষণা নিবন্ধে বলা হয়েছিল, ২০০৯ সালের পর থেকে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় সংবাদমাধ্যমের বার্তাকক্ষগুলো দ্রুততম সময়ে খবর সংগ্রহ এবং বিতরণ উভয় কাজের জন্য সোশ্যাল মিডিয়াকে কীভাবে আত্মস্থ করা যায়, তার চেষ্টা চালিয়ে আসছে।
বাংলাদেশে এই বাস্তবতাকে মেনে নিতে কিছুটা দেরি হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে এখন খবরের গুরুত্ব নির্ধারিত হচ্ছে সোশ্যাল মিডিয়ায় তার গতিপ্রকৃতি দেখে। এর ফলে বার্তাকক্ষের সম্পাদকীয় গরিমা অনেকটাই খর্ব হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে এর সাথে যুক্ত হয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর সাহায্যে তৈরি ভুয়া আধেয় বা কনটেন্টের চ্যালেঞ্জ।
প্রযুক্তিনির্ভর এই রূপান্তরের ফলে অনেকের ধারণা, অবাধ তথ্যপ্রবাহের ধারা শক্তিশালী হয়েছে এবং সাংবাদিকতা ও সংবাদমাধ্যমের প্রয়োজনীয়তা ও প্রাসঙ্গিকতা কিছুটা কমেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কল্যাণে ব্যক্তিগতভাবে পেশাদার সাংবাদিকদের কেউ কেউ যেমন প্রাতিষ্ঠানিকতার বাইরে প্রভাবশালী হয়ে উঠেছেন, তেমনি অপেশাদার লোকজনও বিপুলসংখ্যক অনুসারী তৈরি করতে সক্ষম হচ্ছেন।
তবে যেকোনো তথ্যের সত্যাসত্য যাচাই-বাছাই ও জনস্বার্থ বিচারের প্রাতিষ্ঠানিক সম্পাদকীয় ব্যবস্থার বাইরে এসব প্রভাবশালীদের জনপ্রিয়তা এবং সহজ আয়ের পথ প্রশস্ত হওয়ায় অপতথ্য ও বিভ্রান্তি ছড়ানোর চর্চা এতটাই বেড়েছে যে এখন অ্যান্টিইনফ্লুয়েন্সার বা ডিইনফ্লুয়েন্সার আন্দোলন জোরদার হচ্ছে। উন্নত বিশ্বে ভোগ্যপণ্যের ক্ষেত্রে এই ডিইনফ্লুয়েন্সাররা বেশ সাফল্য দেখিয়েছেন এবং বিজ্ঞাপনদাতারা কথিত ইনফ্লুয়েন্সারদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে।
বাংলাদেশে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রসার কিছুটা দেরিতে ঘটায় প্রভাবশালীদের প্রতিরোধের কাজটা এখনো গতি পায়নি। তা ছাড়া বাংলাদেশিদের ওপর যেসব ইনফ্লুয়েন্সার প্রভাব খাটাতে সক্ষম তাঁরা বাণিজ্যিক পৃষ্ঠপোষকতার ক্ষেত্রে তেমন একটা সাফল্য পাননি। তাঁদের কাজ মূলত রাজনৈতিক এবং বিভিন্ন দল ও গোষ্ঠীর পৃষ্ঠপোষকতাপুষ্ট।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের একাধিক প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে দঙ্গল তৈরির মাধ্যমে দেশের দুটি শীর্ষস্থানীয় পত্রিকা মুক্তকণ্ঠ ও ডেইলি স্টারে হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘৃণ্য অপরাধে তাঁদের অপক্ষমতার নজির তৈরি হয়েছে।
অবাধ তথ্যপ্রবাহের ধারায় আরেকটি উপদ্রব বর্তমানে প্রকট রূপ নিয়েছে। নিয়মিত খবর প্রচারের প্রতিষ্ঠানগুলোর সাংবাদিকেরা এখন প্রায় প্রতিটি ঘটনার খবর সংগ্রহের সময়ে অপেশাদার, শৌখিন এবং অনিয়মিত মুঠোফোন–নির্ভর খবর সংগ্রাহকদের ভিড় মোকাবিলায় হিমশিম খাচ্ছেন।
সবচেয়ে বড় বিপত্তির কারণ ঘটছে তখন, যখন এসব অপেশাদার খবর সংগ্রাহকেরা খবর সংগ্রহ ও প্রচারের জন্য অর্থ আদায়ে লিপ্ত হচ্ছেন। এতে পেশাদার সাংবাদিকদের মর্যাদা ক্ষুণ্ন হচ্ছে এবং টাকা দিয়ে খবর কেনা সম্ভব—জনমনে এমন ধারণা তৈরির আশঙ্কা ঘনীভূত হচ্ছে।
গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রেও একই ধরনের উপদ্রব প্রকট আকার ধারণ করেছে। দেশের আর্থসামাজিক কাঠামোয় ধারণক্ষমতার চেয়ে অনেক বেশি সংখ্যায় গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান জন্ম নিয়েছে। আর্থিকভাবে স্বনির্ভর বা টেকসই হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই জেনেও অনেক ব্যবসায়ী গোষ্ঠী ও উদ্যোক্তা নতুন নতুন প্রতিষ্ঠান সৃষ্টি করছেন।
শেখ হাসিনার ১৭ বছরের কর্তৃত্ববাদী শাসনামলে সংখ্যাধিক্যের নিক্তিতে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা প্রমাণের একটি সরকারি কৌশল অনুসৃত হয়েছিল। ফলে দলীয় সমর্থক-তোষণকারীদের দেদার গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের অনুমতি দেওয়া হয়।
খবরের কাগজ বিলিকারী হকারদের সূত্রে যাচাই করা তথ্যমতে, যেখানে ৫০টির বেশি পত্রিকা বিক্রি হয় না, সেখানে জাতীয় সংসদে দেওয়া হিসাব অনুযায়ী বর্তমানে সরকারিভাবে নিবন্ধিত দৈনিক পত্রিকার সংখ্যা ১৪৩৬। এগুলোর মধ্যে ঢাকা থেকেই প্রকাশিত হয় বলে কথিত আছে ৫৯২টি।
বাকি ১৩৮৬টি পত্রিকা তাহলে কারা, কেন প্রকাশ করেন এবং তার বিলিবণ্টন কীভাবে হয়? সংবাদপত্র জগতে কানকথা চালু আছে যে এগুলো বিভিন্ন সময়ে সরকারি ক্রোড়পত্র ও বিজ্ঞাপন প্রকাশের জন্যই নিবন্ধিত হয়েছে।
ফলে রাষ্ট্রীয় অর্থ হাতিয়ে নেওয়ায় এদের সংখ্যাগরিষ্ঠের উদ্দেশ্য। কিছু পত্রিকা প্রকাশিত হয় প্রকাশকের বাণিজ্যিক, কিংবা রাজনৈতিক অথবা উভয় স্বার্থের প্রচার-প্রসারের উদ্দেশ্যে। তাঁরা ভর্তুকি দেন রাজনৈতিক ক্ষমতার ভাগীদার হতে কিংবা ব্যবসায়িক স্বার্থ সুরক্ষা বা তা এগিয়ে নেওয়ার প্রয়োজনে। কেননা প্রচলিত ধারণা হলো, গণমাধ্যমের মালিকেরা ক্ষমতাধর। যাঁর নিয়ন্ত্রণে যতগুলো গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান তিনি ততটাই বেশি ক্ষমতাধর।
গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের অনিয়ন্ত্রিত স্ফুরণের নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে বিজ্ঞাপন ও আয়ের ক্ষেত্রে। রুগ্ণ প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বাড়ছে, আর তারা পৃষ্ঠপোষকতামুখী হয়ে পড়ছে। আর এটি তো স্বতঃসিদ্ধ যে সংবাদমাধ্যম যত পৃষ্ঠপোষকতানির্ভর হবে ততটাই সে তোষণবাদী হবে, স্বাধীনতা জলাঞ্জলি দেবে।
এই অঘোষিত ও অদৃশ্য প্রভাবক ক্ষমতা শুধু সংবাদপত্র মালিকদের মধ্যেই সীমিত নয়, বরং তা আরও ব্যাপৃত হয়ে আছে টেলিভিশন চ্যানেলের মালিকানায়। এই প্রভাবকে সংহত করার প্রতিযোগিতায় একাধিক বাণিজ্যিক গোষ্ঠী একাধারে টিভি, পত্রিকা, রেডিও এবং অনলাইন পোর্টালে বিনিয়োগ করেছেন। কেউ কেউ নতুন করে টাকা ঢালছেন, নতুন নতুন অধিগ্রহণ চলছে।
পুঁজিবাদী বিশ্বে বিভিন্ন খাতে অলিগার্কি তৈরি হতে দিলেও কোনো রাষ্ট্রই সংবাদজগতে অলিগার্কি বা একতরফা নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা ঘটতে দেয় না। অথচ বাংলাদেশে এখন একাধিক গোষ্ঠী গণমাধ্যমে অলিগার্কি প্রতিষ্ঠার প্রতিযোগিতায় নেমেছে। বাণিজ্যিক, রাজনৈতিক, গোষ্ঠীগত বা ব্যক্তিস্বার্থে অপতথ্য কিংবা তথ্যবিকৃতির মাধ্যমে অপসাংবাদিকতার নিন্দনীয় নজির সৃষ্টি হচ্ছে।
সর্বোপরি গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের অনিয়ন্ত্রিত স্ফুরণের নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে বিজ্ঞাপন ও আয়ের ক্ষেত্রে। রুগ্ণ প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বাড়ছে, আর তারা পৃষ্ঠপোষকতামুখী হয়ে পড়ছে। আর এটি তো স্বতঃসিদ্ধ যে সংবাদমাধ্যম যত পৃষ্ঠপোষকতানির্ভর হবে ততটাই সে তোষণবাদী হবে, স্বাধীনতা জলাঞ্জলি দেবে।
তথ্যপ্রবাহের জগতে যখন অভাবনীয় প্রতিবন্ধক হিসেবে ইউটিউব, ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, স্ন্যাপচ্যাট বা টিকটক নতুন চ্যালেঞ্জ নিয়ে এসেছে, তখন তা মোকাবিলার সম্মিলিত উদ্যোগ ও কৌশল গ্রহণের বদলে এক অশুভ ও অসুস্থ প্রতিযোগিতা বার্তাকক্ষগুলোকে অভূতপূর্ব সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে। সামগ্রিক চিত্রকে নৈরাজ্যজনক বললেও কম বলা হবে। নৈরাজ্য ও হতাশার সংক্রমণ ঘটে দ্রুত এবং আমরা এখন সেই সংক্রমণের যুগে আছি।
কোভিড মহামারির পর সংবাদমাধ্যমে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের গ্রাস এতটাই বিস্তৃত হয়েছে যে বৈশ্বিক পরিসরেও তারা বিজ্ঞাপনের বাজারের সিংহভাগ করায়ত্ত করে ফেলেছে।
রিপোর্টারদের বৈশ্বিক সংগঠন, রিপোর্টার্স স্য ফ্রঁতিয়ে (আরএসএফ) প্রতিবছর যে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা হরণকারী শিকারিদের তালিকা (প্রেস ফ্রিডম প্রেডিটর্স লিস্ট) প্রকাশ করে, তার চলতি বছরের তালিকা প্রকাশ করেছে ২ নভেম্বর। এই তালিকায় গণমাধ্যমকে আর্থিকভাবে হরণকারী হিসেবে যুক্ত হয়েছে গুগলের স্বত্বাধিকারী কোম্পানি অ্যালফাবেট এবং ফেসবুক-ইনস্টাগ্রাম-হোয়াটসঅ্যাপের মালিক প্রতিষ্ঠান মেটা।
গণমাধ্যমের এই নৈরাজ্যজনক পরিস্থিতি থেকে বেরোনোর উপায় কী? স্বাধীন ও সৎ সাংবাদিকতার ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে এই সংকট থেকে উত্তরণের ওপর। এ জন্য প্রয়োজন গণমাধ্যম খাতের কাঠামোগত সংস্কার, যার একটা পথরেখা অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে তৈরি করা হয়েছিল। সংস্কারের ওই রূপরেখাকে সমর্থন করেছিলেন এর সব অংশীজন এবং রাজনৈতিক নেতৃত্ব। ছাত্র-গণ-অভ্যুত্থানের প্রত্যাশার আলোকে স্বাধীন ও বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে এসব পরিবর্তন অতীব প্রয়োজনীয়।
নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতাসীন হওয়া জাতীয়তাবাদী দলের নির্বাচনী অঙ্গীকারেও এর উল্লেখ আছে। তবে গত নয় মাসেও কোনো অগ্রগতি নেই। শুরুতে যে উদ্যোগ দেখা গিয়েছিল তা থেমে যাওয়ার কারণ অজ্ঞাত। গণমাধ্যমের অংশীজনদের সমর্থিত সংস্কার বাস্তবায়ন কেন হবে না বা তার পথে বাধা কী, সরকার তা খোলাসা করলে ভবিষ্যৎ নিয়ে আমরাও ভাবতে পারি। নতুবা আমরা অনিশ্চিত যাত্রারই পথিক হয়ে রইব। এই প্রতিকূলতার মধ্যেই মুক্তকণ্ঠের ২৯ বছরে পদার্পণ শুভ হোক।
কামাল আহমেদ
দ্য ডেইলি স্টার-এর পরামর্শক সম্পাদক এবং সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে গঠিত গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের প্রধান
মতামত লেখকের নিজস্ব