দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক অগ্রগতির গতি আরও মন্থর হওয়ার পূর্বাভাস দিয়েছে আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিশ্বব্যাংক। সংস্থাটির সাম্প্রতিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, দেশে বিনিয়োগের হার হ্রাস পাওয়ার পাশাপাশি শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধিতেও বড় ধরনের পতন লক্ষ্য করা গেছে। এই প্রতিকূল পরিস্থিতির কারণে চলতি অর্থবছরে দেশের প্রবৃদ্ধির হার নেমে আসতে পারে ৩ দশমিক ৪ শতাংশে।
গত মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের 'বাংলাদেশ আপডেট' প্রতিবেদনে এই উদ্বেগজনক তথ্যগুলো তুলে ধরা হয়েছে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, অর্থনীতির এই ধীরগতির ফলে গত এক বছরে প্রায় ২১ লাখ মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে গেছে। একই সাথে কর্মসংস্থানের সুযোগ কমে এসেছে এবং বিশেষ করে নারীরা তাদের কর্মস্থল হারিয়েছেন। ব্যাংকিং খাতের অস্থিরতার চিত্র তুলে ধরে জানানো হয়, খেলাপি ঋণের হার ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের ৩০ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ২০২৬ সালের জুনে ৩৩ দশমিক ২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
এছাড়া দেশের শিল্প উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে গ্যাস ও বিদ্যুতের তীব্র সংকটের কারণে। এর ফলে কর্মসংস্থানের সুযোগ সংকুচিত হচ্ছে। অন্যদিকে, উচ্চ মূল্যস্ফীতির প্রভাবে সাধারণ মানুষের প্রকৃত আয় ও ক্রয়ক্ষমতা ক্রমাগত হ্রাস পাচ্ছে, যা সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে চাপের মুখে ঠেলে দিয়েছে।
এমন সংকটময় পরিস্থিতিতে বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেটে বলা হয়েছে, চলতি বছর প্রবৃদ্ধি হতে পারে মাত্র ৩ দশমিক ৪ শতাংশ। বেসরকারি বিনিয়োগ কমে যাওয়ার পাশাপাশি ঋণ প্রবৃদ্ধির হারও ৩৩ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন ৪ দশমিক ৫ শতাংশে নেমে এসেছে।
সরকারি বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও একই ধরনের নেতিবাচক চিত্র দেখা গেছে বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বা এডিপি বাস্তবায়নের হার নেমেছে ইতিহাসের সর্বনিম্ন ৬৭ দশমিক ৫ শতাংশে।
বিশ্বব্যাংকের কান্ট্রি ডিরেক্টর জ্যঁ পেম বলেন, “অর্থনৈতিক মন্দা এড়াতে এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির পথে এগোতে হলে ব্যাংকিং খাত, অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণ ও জ্বালানি খাতে দ্রুত বড় ধরনের সংস্কার প্রয়োজন।”
অর্থনীতির এই মন্দার সরাসরি প্রভাব পড়ছে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায়। বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আগের বছরের তুলনায় প্রায় ২১ লাখ মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যের কবলে পড়েছে। একই সময়ে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রক্রিয়াটি স্থবির হয়ে পড়েছে।
বিশ্বব্যাংকের অর্থনীতিবিদ নাজমুস সাদাত বলেন, “ব্যাংকিং, রাজস্ব ও জ্বালানি খাতে সংস্কার জোরদার হলে ২০২৭-২৮ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি বেড়ে ৩ দশমিক ৯ শতাংশ হতে পারে। এ ছাড়া জিডিপির মাত্র ৮ দশমিক ৩ শতাংশ রাজস্ব আদায় হওয়ায় সরকারি বিনিয়োগ ও প্রয়োজনীয় ব্যয় বাড়ানোর সুযোগ সীমিত হয়েছে।”
বিশ্বব্যাংকের পর্যবেক্ষণে আরও বলা হয়েছে যে, ফ্যামিলি কার্ড ব্যবস্থা আরও কার্যকর করা হলে নগদ সহায়তা কর্মসূচির আওতায় অতিরিক্ত ২৮ লাখ ৫০ হাজার মানুষকে দারিদ্র্য থেকে মুক্তি দেওয়া সম্ভব হবে।
বিশ্বব্যাংকের দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক ভাইস প্রেসিডেন্ট জোহানেস জুট বলেন, “এআই মূল্য শৃঙ্খলার সুযোগ কাজে লাগাতে দক্ষতা, অবকাঠামো ও সহায়ক পরিবেশে বিনিয়োগ করতে হবে।”
এশিয়াবিষয়ক প্রধান অর্থনীতিবিদ ফ্রানজিস্কা ওনসর্গে বলেন, “এআই শ্রম উৎপাদনশীলতা ও রপ্তানি সম্ভাবনা বাড়াতে পারে। তবে এ জন্য মৌলিক ঘাটতিগুলো দূর করতে হবে।”