বাংলাদেশে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতিবেগের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ছে না। এই সংকটময় পরিস্থিতি মোকাবিলায় কেবল জিডিপি প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর দিকে নজর না দিয়ে, কর্মসংস্থান সৃষ্টিকে অর্থনৈতিক পরিকল্পনার মূল কেন্দ্রে রাখার সুপারিশ করেছে বিশ্বব্যাংকের একটি গবেষণাপত্র। প্রতিবেদনে অধিক কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সক্ষম খাতগুলোকে বিশেষ প্রণোদনা প্রদান, শিক্ষা ও কারিগরি প্রশিক্ষণ ব্যবস্থার আমূল সংস্কার এবং চাকরির গুণগত মান উন্নয়নের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।

বিশ্বব্যাংকের পলিসি রিসার্চ ওয়ার্কিং পেপার সিরিজের অন্তর্গত “Structural Shift in Job Creation: Evidence from Bangladesh” শীর্ষক এই গবেষণাপত্রটি ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত হয়। বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ নাজমুস সাদাত খানের এই গবেষণায় বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির মধ্যকার পারস্পরিক সম্পর্ক গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

গবেষণার তথ্যানুসারে, ২০১০ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে প্রকৃত জিডিপি গড়ে প্রতি বছর ৬ দশমিক ৪ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির এই উচ্চ হারের তুলনায় কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি অনেক ধীর। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০০৩ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে প্রবৃদ্ধির বিপরীতে মোট কর্মসংস্থান সৃষ্টির স্থিতিস্থাপকতা ছিল ০.৪৪। পরবর্তীতে ২০১০ থেকে ২০১৭ সালে এই মান কমে দাঁড়ায় ০.২২-এ। আর সর্বশেষ সময়ে, অর্থাৎ ২০১৭ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে তা সামান্য বৃদ্ধি পেয়ে ০.২৭ হয়েছে।

সাধারণত কর্মসংস্থান সৃষ্টির স্থিতিস্থাপকতা বলতে বোঝানো হয়, উৎপাদন ১ শতাংশ বৃদ্ধি পেলে কর্মসংস্থানের হার কত শতাংশ পরিবর্তিত হয়। এই স্থিতিস্থাপকতার মান যত কম হয়, উৎপাদন বৃদ্ধির তুলনায় কর্মসংস্থান বৃদ্ধির হার ততটাই নিম্ন থাকে।

গবেষণায় উঠে এসেছে যে, সাম্প্রতিক সময়ে শিল্প খাতের পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০০৩ থেকে ২০১০ সালে শিল্প খাতের কর্মসংস্থান স্থিতিস্থাপকতা ছিল ০.৮৪। কিন্তু ২০১০ থেকে ২০১৭ সালে তা কমে ০.৩৩ হয় এবং ২০১৭ থেকে ২০২৪ সালে এই মান ঋণাত্মক ০.০৪-এ নেমে আসে। অর্থাৎ, হিসাব অনুযায়ী এই সময়ে শিল্প খাতে উৎপাদন বাড়লেও কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়েনি।

একই ধরনের নেতিবাচক প্রবণতা দেখা গেছে উৎপাদন খাতেও। গবেষণার হিসাব অনুযায়ী, ২০১৭ থেকে ২০২৪ সালে এই খাতের কর্মসংস্থান স্থিতিস্থাপকতা ছিল ঋণাত্মক ০.১০। এর অর্থ হলো, এই নির্দিষ্ট সময়ে উৎপাদন বৃদ্ধি পাওয়া সত্ত্বেও কর্মসংস্থান উল্টো হ্রাস পেয়েছে।

এই প্রেক্ষাপটে গবেষণাপত্রটিতে কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে অধিক সক্ষম খাতগুলোকে উৎসাহিত করার পাশাপাশি শিক্ষা ও কারিগরি প্রশিক্ষণ ব্যবস্থাকে বর্তমান শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি কেবল কতটি কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে তা দেখলেই হবে না, বরং সেই কাজগুলো কতটা উৎপাদনশীল এবং মানসম্মত, সেটিও বিবেচনায় নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

তবে উল্লেখ্য যে, কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতে নির্দিষ্ট কোনো নীতি বা প্রণোদনা সরাসরি কতটা কার্যকর হবে, তার কোনো প্রত্যক্ষ পরীক্ষা এই গবেষণায় করা হয়নি। বিভিন্ন খাতের কর্মসংস্থান স্থিতিস্থাপকতা থেকে উৎপাদন ও চাকরির সম্পর্কের একটি ধারণা পাওয়া গেলেও, কোনো নির্দিষ্ট খাতে সরকারি সহায়তা বাড়ালে ঠিক কতটি নতুন চাকরির সুযোগ তৈরি হবে, তা নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব হয়নি।

সামগ্রিকভাবে গবেষণাটির মূল বার্তা হলো, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ উন্নয়ন কৌশলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি কর্মসংস্থান সৃষ্টিকে একটি প্রধান লক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। প্রবৃদ্ধির সুফল যেন সাধারণ মানুষের জন্য উৎপাদনশীল ও মানসম্মত কাজের সুযোগ নিশ্চিত করে, নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে সেই লক্ষ্যটিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।