বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষিত বেকারত্বের হার আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। এই সংকটের মূলে রয়েছে দক্ষতার অভাব এবং নিয়োগকর্তাদের সাথে চাকরিপ্রার্থীদের সংযোগের তীব্র ঘাটতি। প্রতি বছর দেশে সাত লাখের বেশি শিক্ষার্থী স্নাতক ডিগ্রি নিয়ে বের হলেও শ্রমবাজার বড়জোর তিন লাখ স্নাতকের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে পারে। ফলে যোগ্য প্রার্থী থাকা সত্ত্বেও অনেক পদ খালি থাকে, আবার হাজার হাজার মেধাবী তরুণ চাকরির সুযোগ পান না।

দেশের শ্রমবাজারে এক অদ্ভুত বৈপরীত্য লক্ষ্য করা যায়। অনেক বেকার প্রার্থী পরিচিতদের মাধ্যমে চাকরির খোঁজ করেন, আবার অনেকে বিজ্ঞাপনের ওপর নির্ভর করেন। তবে যাদের সামাজিক যোগাযোগ বা পরিচিতি কম, তারা প্রতিযোগিতার শুরুতেই পিছিয়ে পড়েন। বিশেষ করে জেলা শহরের মেধাবী শিক্ষার্থী বা পরিবারের প্রথম স্নাতক হওয়া তরুণেরা, যাদের সুপারিশ করার মতো কেউ নেই, তাদের জন্য সুযোগের দরজা প্রায় বন্ধ হয়ে আসে। কাজের অভাব, দক্ষতার অমিল এবং সঠিক তথ্যের ঘাটতি এই সংকটকে আরও ঘনীভূত করছে।

পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে দেখা যায়, উচ্চশিক্ষিতদের অবস্থা অত্যন্ত নাজুক। বিবিএসের হিসাব অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে বেকারের সংখ্যা ২৬ লাখ ২৪ হাজার। এর মধ্যে ৮ লাখ ৮৫ হাজার স্নাতক ডিগ্রিধারী। অর্থাৎ, প্রতি তিনজন বেকারের একজন উচ্চশিক্ষিত। ২০১৭ সালে স্নাতক ডিগ্রিধারী বেকারের সংখ্যা ছিল চার লাখের কাছাকাছি; আট বছরের ব্যবধানে এই সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি হয়ে গেছে। বর্তমানে স্নাতকদের মধ্যে বেকারত্বের হার ১৩ দশমিক ৫ শতাংশ, যা ২০১০ সালে ছিল মাত্র ৪ দশমিক ৯ শতাংশ। এছাড়া ১৭ শতাংশের বেশি উচ্চশিক্ষিত তরুণ দুই বছরের বেশি সময় ধরে বেকার অবস্থায় রয়েছেন।

বেকারত্বের এই সমস্যাটিকে তিনটি ভিন্ন স্তরে বিশ্লেষণ করা যায়। প্রথমত, দেশে তীব্র কর্মসংস্থানের অভাব। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) তথ্যমতে, প্রতি বছর সাত লাখের বেশি স্নাতক পাস করলেও বিনিয়োগ ও ব্যবসার বর্তমান পরিবেশে তিন লাখের বেশি চাকরি সৃষ্টি হওয়া কঠিন। বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক ‘বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট’ অনুযায়ী, গত ও চলতি অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৪ শতাংশে নেমে আসায় বছরে নিট নতুন কর্মসংস্থান হবে মাত্র ৬ লাখ ৩০ হাজারের মতো, যা নতুন স্নাতকদের সংখ্যার চেয়েও কম।

দ্বিতীয় স্তরটি হলো দক্ষতার অমিল। সনদ থাকলেও বাস্তব কাজের প্রস্তুতিতে ঘাটতি রয়েছে তরুণদের। সরকারের গঠিত অর্থনৈতিক কৌশল পুনর্নির্ধারণ টাস্কফোর্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, স্নাতক পাস করা তরুণদের প্রায় ৬০ শতাংশই জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজ থেকে আসেন, যাদের বড় অংশ মানবিক ও সামাজিক বিজ্ঞানের শিক্ষার্থী। অথচ নিয়োগকর্তারা খোঁজেন হিসাব, বিক্রয়, তথ্য বিশ্লেষণ বা প্রযুক্তির মতো হাতে-কলমে দক্ষতা। বিআইডিএসের গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়োগকর্তাদের কাঙ্ক্ষিত দক্ষতার প্রায় ৩০ শতাংশ শ্রমবাজারে পাওয়া যায় না। এর সাথে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর উত্থান প্রাথমিক পর্যায়ের কারিগরি পদের প্রয়োজনীয়তা কমিয়ে চাপ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

তৃতীয় সমস্যাটি হলো সংযোগের ঘাটতি ও তথ্যের অভাব। অনেক পদের বিপরীতে বিপুল আবেদন জমা পড়লেও নিয়োগকর্তারা যোগ্য প্রার্থী পান না। বিশেষ করে ছোট ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানগুলোর মানবসম্পদ বিভাগ না থাকায় তারা শত শত সিভি যাচাইয়ের সময় পান না, ফলে পরিচিতদের সুপারিশেই নিয়োগ দিতে বাধ্য হন। অন্যদিকে, চাকরিপ্রত্যাশীরা আবেদন করেও কোনো উত্তর পান না এবং কেন তারা বাদ পড়লেন তা জানতে পারেন না। কোন প্রতিষ্ঠানে কী দক্ষতা প্রয়োজন বা বেতন কত, সেই তথ্যগুলোও সহজলভ্য নয়।

বেকারের সংখ্যার বাইরেও শ্রমবাজারের এক অন্ধকার দিক রয়েছে। টাস্কফোর্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, কর্মজীবীদের ৮৫ শতাংশই অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করেন, যেখানে কোনো নিয়োগপত্র বা সামাজিক সুরক্ষা নেই। বিবিএসের হিসাবে আরও ৬৪ থেকে ৬৭ লাখ মানুষ আংশিক বেকার, অর্থাৎ তারা কাজ করলেও তাদের দক্ষতা ও সময়ের পূর্ণ ব্যবহার হচ্ছে না।

নারীদের ক্ষেত্রে এই বাধা আরও প্রকট। বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শিল্প ও সেবা খাতে চাকরি হারানোর পর অনেক নারী শ্রমবাজার থেকে পুরোপুরি সরে গেছেন। বিবিএসের তথ্যমতে, ২০২৪ সালে এক বছরে দেশের শ্রমশক্তি প্রায় ১৭ লাখ ৪০ হাজার কমেছে, যার প্রায় ১৬ লাখ ৪০ হাজারই নারী। এছাড়া গত পাঁচ বছরে শিক্ষা, কর্মসংস্থান বা প্রশিক্ষণ—কোনোটিতেই যুক্ত নেই এমন তরুণের সংখ্যা দ্বিগুণ হয়েছে বলে জানিয়েছে সরকারি টাস্কফোর্স।

নতুন কর্মসংস্থান তৈরি দীর্ঘমেয়াদী প্রক্রিয়া হলেও সংযোগের ঘাটতি দ্রুত কমানো সম্ভব। ডিজিটাল নিয়োগব্যবস্থা এখানে বড় পরিবর্তন আনতে পারে। খালি পদ, প্রয়োজনীয় দক্ষতা ও বেতনের তথ্য স্বচ্ছ থাকলে চাকরিপ্রার্থীদের অনিশ্চয়তা কমবে এবং নিয়োগকর্তাদের সময় বাঁচবে। তবে প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতাও আছে; স্মার্টফোন বা ইন্টারনেট সুবিধা না থাকলে অনেকে বঞ্চিত হতে পারেন। তাই চূড়ান্ত মূল্যায়ন মানুষের মাধ্যমেই হওয়া উচিত।

এই প্রেক্ষাপটে ২০২৫ সালের নভেম্বরে আকিজ রিসোর্স নিজ উদ্যোগে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন ক্যারিয়ার প্ল্যাটফর্ম নেক্সটজবজ (nextjobz.com.bd) চালু করেছে। এই প্ল্যাটফর্মটি স্কুল থেকে অবসর পর্যন্ত মানুষকে শেখা, উন্নতি ও কাজের সুযোগের সাথে যুক্ত রাখতে চায়। এখানে চাকরি খোঁজার পাশাপাশি লার্নিং ল্যাবের মাধ্যমে দক্ষতা বৃদ্ধির প্রশিক্ষণ এবং ক্যাম্পাস কানেক্টের মাধ্যমে শিক্ষার্থী ও নিয়োগকর্তাদের সংযোগের ব্যবস্থা রয়েছে। এছাড়া বিদেশে ক্যারিয়ার সংক্রান্ত তথ্যও দেওয়া হয়।

নিয়োগকর্তারা এখানে বিজ্ঞাপন দেওয়া থেকে প্রার্থী শর্টলিস্ট করা পর্যন্ত সব কাজ এক জায়গায় করতে পারেন। এছাড়া ‘নেক্সটরিসোর্স’ সেবার মাধ্যমে হেডহান্টিং, স্টাফিং ও প্রার্থীর তথ্য যাচাই করা হয়। জ্যেষ্ঠ পর্যায়ের যোগ্য পেশাজীবীরা সাধারণত প্রকাশ্যে আবেদন করেন না, তাই হেডহান্টিংয়ের মাধ্যমে তাদের খুঁজে বের করা হয়। তবে এই উদ্যোগগুলোর সাফল্য পরিমাপ করতে হবে বাস্তব ফলাফলে—যেমন প্রার্থীরা সময়মতো জবাব পাচ্ছেন কি না বা ঢাকার বাইরের ও নারী প্রার্থীরা সমান সুযোগ পাচ্ছেন কি না।

সংযোগের সংকট কাটাতে নিয়োগকর্তাদের উচিত বিজ্ঞাপনে দায়িত্ব, দক্ষতা ও বেতনসীমা স্পষ্ট করা এবং প্রতিটি আবেদনের জবাব দেওয়ার চর্চা করা। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের পাঠ্যক্রমে ইন্টার্নশিপ, ব্যবহারিক প্রকল্প ও কারিগরি প্রশিক্ষণ যুক্ত করা জরুরি। টাস্কফোর্স জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করার সুপারিশ করেছে। প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের সাফল্য এখন সনদের সংখ্যায় নয়, বরং কতজন কাজ পেলেন তার ভিত্তিতে মাপা উচিত।

পাশাপাশি সরকারকে বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত করতে হবে। বিশ্বব্যাংক ব্যাংক খাত, রাজস্ব আহরণ ও জ্বালানি খাতে দ্রুত সংস্কারের তাগিদ দিয়েছে। শ্রমবাজারের নিয়মিত ও নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রকাশ করা জরুরি, যাতে শিক্ষার্থী ও নীতিনির্ধারকরা অনুমানের ওপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত না নেন। নিয়োগ প্ল্যাটফর্মগুলোরও দায়িত্ব রয়েছে তথ্যের সত্যতা যাচাই করা, প্রার্থীর তথ্যের সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং সহজ বাংলায় আবেদনের ব্যবস্থা রাখা।

নতুন কর্মসংস্থান তৈরি সময়সাপেক্ষ হলেও বর্তমান বিদ্যমান চাকরিগুলো যোগ্য মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার কাজ এখনই শুরু করা প্রয়োজন।

— লেখক: শোয়েব হাসান, চিফ বিজনেস অফিসার, নেক্সটজবজ লিমিটেড