২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের দারিদ্র্য ও বৈষম্যের হার আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় প্রায় ২১ লাখ মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছেন। এই সময়ে কর্মসংস্থানের সুযোগ সংকুচিত হয়েছে এবং বিশেষ করে নারীরা বড় আকারে চাকরি হারিয়েছেন। আর্থিক খাতের অস্থিরতার প্রতিফলন দেখা গেছে খেলাপি ঋণের হারে; ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে যা ছিল ৩০ দশমিক ৬ শতাংশ, ২০২৬ সালের জুনে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৩ দশমিক ২ শতাংশে।

গত মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) প্রকাশিত ‘বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বিশ্বব্যাংক এই উদ্বেগজনক তথ্যগুলো তুলে ধরেছে।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, দেশে বিনিয়োগের পরিমাণ হ্রাস পেয়েছে এবং রপ্তানি খাত তার পূর্বের গতি হারিয়েছে। লাগামহীন মূল্যস্ফীতির কারণে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমেছে এবং ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনার খরচ বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে রেমিট্যান্স প্রবাহ এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের উন্নতি হওয়ায় বাহ্যিক খাত তুলনামূলক স্থিতিশীল ছিল। বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা ধীরে ধীরে সহজ হলে এবং প্রয়োজনীয় সংস্কার কার্যক্রম গতিপ্রাপ্ত হলে ২০২৭-২৮ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধির হার ৩ দশমিক ৯ শতাংশে উন্নীত হতে পারে।

বিশ্বব্যাংকের হিসাবমতে, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি হবে ৩ দশমিক ৪ শতাংশ। ২০২৩ সাল থেকে প্রবৃদ্ধির গতি মন্থর হওয়ার পেছনে জ্বালানি ও আর্থিক খাতের দুর্বলতা এবং অপর্যাপ্ত রাজস্ব আহরণকে দায়ী করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, জিডিপির মাত্র ৮ দশমিক ৩ শতাংশ রাজস্ব আহরণ করা হচ্ছে, যা বিশ্বের সর্বনিম্ন দেশগুলোর তালিকায় স্থান করে নিয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রাজস্ব ঘাটতির পরিমাণ আগের বছরের ৩ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে বেড়ে ৩ দশমিক ৯ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।

বিশ্বব্যাংকের তথ্যানুসারে, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি, জ্বালানি ও কৃষিতে সরকারি ভর্তুকি প্রদান করা হলেও দেশের সবচেয়ে দরিদ্র পরিবারগুলোর প্রায় অর্ধেকই কোনো সুরক্ষা কর্মসূচির আওতায় নেই। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় ‘ডায়নামিক সোশ্যাল রেজিস্ট্রি’ বাস্তবায়নকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে অভিহিত করা হয়েছে প্রতিবেদনে। এতে বলা হয়েছে, একাধিক খাদ্য ভর্তুকি একীভূত করে এবং ফ্যামিলি কার্ডের সঙ্গে নগদ সহায়তা কর্মসূচির উন্নত লক্ষ্যনির্ধারণ যুক্ত করতে পারলে আরও ২৮ লাখ ৫০ হাজার মানুষকে দারিদ্র্য থেকে মুক্ত করা সম্ভব হবে।

একই দিনে প্রকাশিত ‘সাউথ এশিয়া ইকোনমিক আপডেট’ অনুযায়ী, ২০২৬ সালে দক্ষিণ এশিয়ার সামগ্রিক প্রবৃদ্ধি হবে ৬ দশমিক ৯ শতাংশ, তবে ২০২৭ সালে তা কিছুটা কমে ৬ দশমিক ৭ শতাংশে নামতে পারে।

দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ও ভুটানবিষয়ক কান্ট্রি ডিরেক্টর জ্যঁ পেসমে বলেন, ‘বেসরকারি বিনিয়োগনির্ভর অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধিতে ফিরতে ব্যাংকিং, রাজস্ব আহরণ এবং জ্বালানি খাতে দ্রুত ও সাহসী সংস্কার দরকার। দরিদ্রদের সুরক্ষা ও ভালো কর্মসংস্থানের জন্য এখনই পদক্ষেপ নেওয়ার সময়।’

অন্যদিকে, বিশ্বব্যাংকের দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক ভাইস প্রেসিডেন্ট জোহানেস জুট বলেন, ‘এআই মূল্য শৃঙ্খলার সুযোগ কাজে লাগাতে দক্ষতা, অবকাঠামো ও সহায়ক পরিবেশে বিনিয়োগ করতে হবে।’

এশিয়াবিষয়ক প্রধান অর্থনীতিবিদ ফ্রানজিস্কা ওনসর্গে বলেন, ‘এআই শ্রম উৎপাদনশীলতা ও রপ্তানি সম্ভাবনা বাড়াতে পারে। তবে এজন্য মৌলিক ঘাটতিগুলো দূর করতে হবে।’