চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি হ্রাস পাওয়ার পাশাপাশি মূল্যস্ফীতির হার আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) অক্টোবর ২০২৬-এর পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬–২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধির হার কমে ৩ দশমিক ২ শতাংশে নেমে আসতে পারে। একই সময়ে গড় মূল্যস্ফীতি বেড়ে ১০ দশমিক ৯ শতাংশে পৌঁছানোর সম্ভাবনা রয়েছে।
অর্থনীতির এই সম্ভাব্য পরিস্থিতি দেশের সামগ্রিক পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া, সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা এবং বিনিয়োগের পরিবেশের ক্ষেত্রে নতুন করে উদ্বেগের সৃষ্টি করতে পারে।
আজ সকালে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের যৌথ বার্ষিক সভায় এই প্রতিবেদনটি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়েছে। আইএমএফের ‘ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুক’ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ২০২৫–২৬ অর্থবছরে চূড়ান্ত হিসেবে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি হতে পারে ৩ দশমিক ৬ শতাংশ এবং ওই বছরের গড় মূল্যস্ফীতি হতে পারে ৮ দশমিক ৭ শতাংশ। অর্থাৎ, ২০২৬–২৭ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধির হার কমার পাশাপাশি মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
অন্যদিকে, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাব অনুযায়ী, গত সেপ্টেম্বর মাসে দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৮ দশমিক ৩৪ শতাংশ।
বিশ্ব অর্থনীতির সামগ্রিক চিত্র তুলে ধরে আইএমএফ জানিয়েছে, ২০২৬ সালে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি হতে পারে ৩ দশমিক ১ শতাংশ, যা ২০২৭ সালে বেড়ে ৩ দশমিক ৪ শতাংশ হতে পারে। ২০২৬ সালে বৈশ্বিক গড় মূল্যস্ফীতি ৪ দশমিক ৭ শতাংশ হওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও ২০২৭ সালে তা কমে ৪ দশমিক ১ শতাংশে নামতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ সম্পর্কে এই নির্দিষ্ট প্রতিবেদনে বিস্তারিত আলোচনা না করা হলেও, আইএমএফ এর আগের বিভিন্ন প্রতিবেদনে সতর্ক করেছে যে, প্রবৃদ্ধির গতি কমে যাওয়া অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড দুর্বল হয়ে পড়লে নতুন বিনিয়োগ এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির সুযোগ সীমিত হয়ে যায়। বিশেষ করে বেসরকারি বিনিয়োগ প্রত্যাশিত মাত্রায় বৃদ্ধি না পেলে শিল্প উৎপাদন, ব্যবসা সম্প্রসারণ এবং আয় বৃদ্ধির গতি ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। উচ্চ মূল্যস্ফীতির প্রভাবে মানুষের প্রকৃত আয় ও ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস পেতে পারে, যার ফলে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষ সবচেয়ে বেশি সংকটে পড়বেন।
সম্প্রতি বিশ্বব্যাংকও বাংলাদেশ অর্থনীতি সম্পর্কে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। বিশ্বব্যাংকের মতে, বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির গতি কমছে এবং বেসরকারি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান দুর্বল হয়ে পড়েছে। গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকটের কারণে শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। পাশাপাশি ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বাড়ছে এবং মূলধন ঘাটতির সমস্যা প্রকট হচ্ছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে সাধারণ মানুষের প্রকৃত আয় ও ক্রয়ক্ষমতা ক্রমাগত কমছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, সামাজিক সুরক্ষা, বিদ্যুৎ-জ্বালানি এবং সার-সহায়তায় সরকার বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় করলেও এর উল্লেখযোগ্য অংশ প্রকৃত দরিদ্র মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছে না। অনেক সচ্ছল পরিবার এই সুবিধা পেলেও দরিদ্রতম বহু পরিবার সামাজিক সুরক্ষার আওতার বাইরে থেকে যাচ্ছে।
বিশ্বব্যাংকের অক্টোবর ২০২৬-এর ‘বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট’-এ অর্থনীতির এই সামগ্রিক চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। আজ মঙ্গলবার প্রকাশ করা এই প্রতিবেদনের শিরোনাম দেওয়া হয়েছে ‘মেক সাবসিডিজ অ্যান্ড সোশ্যাল প্রটেকশন ওয়ার্ক বেটার ফর দ্য পুওর’।
উক্ত প্রতিবেদনে ব্যাংক খাতের স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা, জ্বালানি নিরাপত্তা ও সুশাসন নিশ্চিত করা এবং কর-রাজস্ব বাড়ানোর বিষয়টিকে সংস্কারের প্রধান ক্ষেত্র হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। পাশাপাশি সাধারণ ভর্তুকি ধীরে ধীরে কমিয়ে দরিদ্র ও ঝুঁকিতে থাকা মানুষের জন্য লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা বাড়ানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।