মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা এবং উচ্চ সুদের হারের প্রবল চাপে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিয়ে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এই সংকটময় পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের পথ খুঁজতে বিভিন্ন দেশ নানা উদ্যোগ গ্রহণ করছে। এরই ধারাবাহিকতায় থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে আজ সোমবার শুরু হয়েছে বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) বার্ষিক সভা।
জানা গেছে, এবারের বৈঠকে মূল্যস্ফীতি, সরকারি ঋণের ক্রমবর্ধমান বোঝা এবং বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলা করার বিষয়গুলো সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য পাবে। নিয়ম অনুযায়ী, তিন বছর পর যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনে নিজেদের সদর দপ্তরের বাইরে এই বার্ষিক সভার আয়োজন করা হয়েছে। ১২ থেকে ১৮ অক্টোবর পর্যন্ত চলমান এই আয়োজনে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অর্থমন্ত্রী, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর এবং আর্থিক খাতের শীর্ষ নীতিনির্ধারকেরা অংশগ্রহণ করছেন।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চলমান যুদ্ধের প্রভাব এবারের আলোচনায় বিশেষ গুরুত্ব পাবে। যুদ্ধের ফলে জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হওয়া, মূল্যস্ফীতির চাপ বৃদ্ধি পাওয়া এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা বিশ্ব অর্থনীতির সামনে নতুন ঝুঁকি তৈরি করেছে।
বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট অজয় বাঙ্গা রয়টার্সকে বলেন, “হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর বিশ্ব অর্থনীতি যতটা ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে আশঙ্কা করা হয়েছিল, ততটা হয়নি। বিশ্ব অর্থনীতি এত বড় ধাক্কা এককভাবে সামলাতে পারছে। তবে নতুন করে চাপ বাড়ছে। ডিজেলের দাম বৃদ্ধি, সারে খরচ বেড়ে যাওয়া ও এল নিনোর সম্ভাব্য প্রভাবের কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।” তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, এল নিনোর কারণে তীব্র তাপপ্রবাহসহ প্রতিকূল আবহাওয়া আসতে পারে, যার ফলে জনস্বাস্থ্য ও কৃষি উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
অন্যদিকে, বিশ্বের সাতটি বৃহৎ অর্থনীতির জোট জি-৭ তাদের জরুরি মজুত থেকে ১০ কোটি ব্যারেল অপরিশোধিত তেল ও ডিজেল বাজারে সরবরাহ করতে সম্মত হয়েছে। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের চাপের মুখে তারা এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। পাশাপাশি ট্রাম্প রাশিয়া থেকে ডিজেল সরবরাহ বাড়ানোর কথা জানিয়েছেন, যদিও ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি এই উদ্যোগের তীব্র সমালোচনা করেছেন।
বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট অজয় বাঙ্গা বলেন, “শুধু এল নিনো নয়, জ্বালানি ও সারের মূল্যবৃদ্ধি এবং ঋণের চাপে বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। এসব ঝুঁকি মোকাবিলায় আগেভাগে প্রস্তুতি নিতে হবে।”
আইএমএফ-এর পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে বিশ্ব অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি ৩ শতাংশ হতে পারে। তবে তারা ইঙ্গিত দিয়েছে যে, এই পূর্বাভাস পরিবর্তিত হতে পারে। বিশেষ করে সংঘাতের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর প্রবৃদ্ধি কমতে পারে, যার মধ্যে রয়েছে রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত ইউক্রেন এবং ইরানের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত উপসাগরীয় অঞ্চলের কয়েকটি দেশ।
আইএমএফ আরও সতর্ক করে জানিয়েছে যে, খাদ্য ও জ্বালানির দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গেলে উচ্চ মূল্যস্ফীতির পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। এর ফলে দারিদ্র্যের হার বাড়বে এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা হুমকির মুখে পড়বে। এই পরিস্থিতিতে সরকারি ঋণের বিষয়টিও নীতিনির্ধারকদের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আইএমএফ-এর হিসাব অনুযায়ী, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বর্তমানে বিশ্বে সরকারি ঋণের পরিমাণ সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
২০৩০ সালের আগেই বৈশ্বিক সরকারি ঋণ মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১০০ শতাংশ ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। উন্নত দেশগুলোর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ঋণ-জিডিপি অনুপাত সবচেয়ে বেশি। তবে উদীয়মান ও নিম্ন আয়ের দেশগুলোও চরম ঝুঁকিতে রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে সুদের হার বেশি থাকায় এসব দেশ থেকে পুঁজি বেরিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা প্রবল। এছাড়া জলবায়ুজনিত ঝুঁকি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় (এআই) বিনিয়োগের সীমাবদ্ধতা তাদের অর্থনৈতিক সক্ষমতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে বলে মনে করে আইএমএফ।
বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বাড়লে বাংলাদেশের আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি পায়, যার সরাসরি চাপ পড়ে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর। একই সঙ্গে সুদের হার বৃদ্ধি এবং ঋণমান প্রদানকারী সংস্থাগুলোর পূর্বাভাস ইতিবাচক না হলে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য বৈদেশিক ঋণ আরও ব্যয়বহুল হয়ে উঠতে পারে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের মতো বড় বাজারে চাহিদা হ্রাস পেলে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকসহ সামগ্রিক রপ্তানি খাতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা থাকে।
বাংলাদেশের অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল ব্যাংককের এই আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক সম্মেলনে অংশ নিচ্ছে।
এই যৌথ বার্ষিক বৈঠকের মূল পর্ব অনুষ্ঠিত হবে ১৬ অক্টোবর। এছাড়া ১৫ অক্টোবর উন্নয়ন কমিটির বৈঠক এবং ১৭ অক্টোবর আন্তর্জাতিক মুদ্রা ও আর্থিক কমিটির পূর্ণাঙ্গ অধিবেশন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।