আগামী ১০ থেকে ১৫ বছরের মধ্যে বিশ্বের প্রায় ১২০ কোটি তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করবেন। তবে এই বিশাল জনগোষ্ঠীর জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে মাত্র ৪০ কোটি, এমন এক আশঙ্কাজনক পূর্বাভাস দিয়েছেন বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট অজয় বাঙ্গা। তাঁর এই হিসাব অনুযায়ী, তরুণ প্রজন্মের জন্য কর্মসংস্থানের ঘাটতি দাঁড়াতে পারে প্রায় ৮০ কোটির মতো। তিনি বিশ্বাস করেন, এই তরুণ প্রজন্মই বর্তমান শতাব্দীর নেতৃত্ব দেওয়ার কথা।
থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংকের যৌথ বার্ষিক সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে, যার সমাপ্তি ঘটে আজ। এই সভার পূর্ণাঙ্গ অধিবেশনে ১৬ অক্টোবর বক্তব্য প্রদান করেন বিশ্বব্যাংক গ্রুপের প্রেসিডেন্ট অজয় বাঙ্গা। তাঁর সেই ভাষণের একটি অনুলিপি আজ বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয় থেকে পাঠানো হয়েছে, যেখানে তিনি কর্মসংস্থানের এই গুরুতর চ্যালেঞ্জের কথা বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেন।
বক্তব্যের এক পর্যায়ে অজয় বাঙ্গা বলেন, “কর্মসংস্থান শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়, এটি মানুষের মর্যাদার সঙ্গে সম্পর্কিত।” তিনি উল্লেখ করেন যে, বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে ব্যাপক পরিসরে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা।
বিশ্ব অর্থনীতির বর্তমান বাস্তব পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে তিনি জানান, বিশ্ব অর্থনীতি এখন এক কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সংঘাত, সরকারের আর্থিক সক্ষমতা হ্রাস পাওয়া, ঋণের বোঝা বেড়ে যাওয়া এবং জ্বালানি ও সারের মতো অতি প্রয়োজনীয় পণ্যের আকাশচুম্বী মূল্যের চাপ মোকাবিলা করছে বিশ্ব। এমন প্রতিকূল পরিস্থিতিতে সীমিত সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করার পাশাপাশি দেশগুলোকে ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সহায়তা করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্টের মতে, উন্নয়নের ভবিষ্যৎ এখন নির্ভর করছে সরকারি অর্থায়ন, বেসরকারি বিনিয়োগ, জনকল্যাণমূলক সংস্থার সহায়তা এবং আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বিত ব্যবহারের ওপর। যেসব দেশে ঝুঁকি বেশি এবং বেসরকারি বিনিয়োগের সুযোগ সীমিত, সেখানে সরকারি অর্থায়ন ও সহজ শর্তের ঋণের গুরুত্ব অপরিসীম। তবে অর্থনীতির ভিত শক্তিশালী হওয়ার সাথে সাথে বেসরকারি বিনিয়োগের ভূমিকা আরও বৃদ্ধি করতে হবে বলে তিনি মনে করেন।
বিশ্বব্যাংক গ্রুপের সংস্কার প্রক্রিয়ার কথা জানিয়ে অজয় বাঙ্গা বলেন, প্রকল্প প্রস্তুতির সময় ১৯ মাস থেকে কমিয়ে এখন ৯ মাস করা হয়েছে। এছাড়া যেসব বিনিয়োগে দ্রুত ফল পাওয়া যায়, তেমন অর্থায়নের পরিমাণ মোট অর্থায়নের এক-তৃতীয়াংশ থেকে বাড়িয়ে অর্ধেক করা হয়েছে। পাশাপাশি এক দশকে ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা ১০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি বাড়ানো হয়েছে।
বেসরকারি বিনিয়োগ আকর্ষণের ক্ষেত্রে অর্জিত সাফল্যের কথা তুলে ধরে তিনি জানান, ২০২২ সালে বিশ্বব্যাংক প্রায় ৩৫ বিলিয়ন ডলারের বেসরকারি পুঁজি সংগ্রহ করেছিল, যা গত বছর বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১১২ বিলিয়ন ডলারে। সংস্থাটির নিজস্ব অর্থায়নসহ মোট অর্থায়নের পরিমাণ এখন ২৩০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে।
তবে নিম্ন আয়ের দেশগুলোতে বাণিজ্যিক পুঁজি আকর্ষণ করা এখনো বেশ কঠিন বলে উল্লেখ করেন তিনি। এসব দেশে কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি উদ্যোগের (এমএসএমই) গুরুত্ব অপরিসীম বলে মনে করেন বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট। তাঁর মতে, অর্থায়নের সুযোগ বাড়ানো, বড় ক্রেতা ও বাজারের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন এবং ব্যবসা সম্প্রসারণের নিয়মকানুন সহজ করা এখন সময়ের দাবি।
কর্মসংস্থান সৃষ্টির ভিত্তি হিসেবে বিদ্যুৎ, পানি, পরিবহন, ডিজিটাল সংযোগ, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নের কথা বলেন অজয় বাঙ্গা। তিনি মনে করেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সঠিক ব্যবহার কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও ব্যবসায় উৎপাদনশীলতা বহুগুণ বাড়িয়ে দিতে পারে। তবে এই প্রযুক্তির সুফল পেতে হলে বিদ্যুৎ, ডিজিটাল সংযোগ, যন্ত্র ব্যবহারের সুযোগ এবং প্রয়োজনীয় দক্ষতা নিশ্চিত করা আবশ্যক।
উন্নয়ন অর্থায়নের ক্ষেত্রে একটি বড় সীমাবদ্ধতা হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন যে, দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্পে বিনিয়োগ করা অর্থ বহু বছর আটকে থাকে। ভাষণের শেষ পর্যায়ে আশাবাদ ব্যক্ত করে অজয় বাঙ্গা বলেন, “কর্মসংস্থানের ঘাটতি একটি পূর্বাভাস, এটি অনিবার্য ভবিষ্যৎ নয়। সরকারি অর্থ, বেসরকারি পুঁজি, জনকল্যাণমূলক সংস্থার সহায়তা ও প্রযুক্তিকে একসঙ্গে কাজে লাগিয়ে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা সম্ভব। পরবর্তী প্রজন্মের প্রত্যাশা পূরণে উন্নয়ন উদ্যোগের পরিসর ও গতি—দুটিই বাড়াতে হবে।”