বাংলাদেশের নিজস্ব অগ্রাধিকার এবং নির্ধারিত সংস্কার কৌশলের ওপর ভিত্তি করেই আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ), বিশ্বব্যাংকসহ অন্যান্য উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাগুলো সহায়তা প্রদান করবে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর।

উপদেষ্টার মতে, এবারই প্রথম আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীরা স্পষ্টভাবে এই বিষয়টি সামনে এনেছে যে, তারা বাংলাদেশের অগ্রাধিকারের ভিত্তিতেই সংস্কার কার্যক্রমে সহযোগিতা করবে। এর ফলে দেশের নিজস্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী সংস্কার প্রক্রিয়াগুলো এগিয়ে নেওয়ার একটি বড় সুযোগ তৈরি হয়েছে।

থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সভার ফাঁকে আজ বৃহস্পতিবার সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর এসব কথা বলেন।

আইএমএফের ঋণসহায়তা পাওয়ার ক্ষেত্রে শর্তাবলি কোনো বাধা হয়ে দাঁড়াবে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে উপদেষ্টা জানান, বিষয়গুলো নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই সামনে এগিয়ে যাবে। সরকার প্রতিটি পদক্ষেপ দ্রুত এবং কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের চেষ্টা করছে এবং এই বিষয়ে সরকার আশাবাদী।

আইএমএফের প্রবৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতির পূর্বাভাস নিয়ে তিতুমীর বলেন, সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়িত না হলে অর্থনীতিতে কী ধরনের প্রভাব পড়তে পারে, আইএমএফের পূর্বাভাসকে সে দৃষ্টিকোণ থেকেও বিবেচনা করা প্রয়োজন। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার পূর্বাভাসের মধ্যে পার্থক্য থাকাটা স্বাভাবিক। অতীতের তথ্য পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, আইএমএফের প্রবৃদ্ধির প্রক্ষেপণ সাধারণত কিছুটা সংরক্ষণশীল হয়ে থাকে।

উপদেষ্টা আরও জানান, আইএমএফের আর্টিকেল ফোর মিশনের প্রতিবেদনে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ৪ দশমিক ৭ শতাংশ উল্লেখ করা হয়েছে। তবে সরকার বাজেটে যে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে, তা অর্জনের ব্যাপারে সরকার আশাবাদী।

রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, “সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারেই সংস্কারের বিষয়গুলো উল্লেখ করা হয়েছে। পরবর্তী সময়ে পঞ্চবার্ষিক অর্থনৈতিক কৌশলেও এসব অগ্রাধিকার প্রতিফলিত হবে।” তিনি মনে করেন, পরিকল্পিত সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে অর্থনীতির সক্ষমতা বাড়ানো সম্ভব হবে।

মূল্যস্ফীতির বিষয়ে উপদেষ্টা বলেন, এর পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতির প্রভাবের পাশাপাশি অতীতের উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতিও বর্তমান পরিস্থিতিকে জটিল করেছে। এ অবস্থায় সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো এবং ঝুঁকিতে থাকা পরিবারগুলোর সুরক্ষা নিশ্চিত করা সরকারের গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার।

সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির ত্রুটি নিয়ে রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, “অতীতে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতায় উপকারভোগী নির্বাচনে নানা সমস্যা ছিল। যাঁদের তালিকাভুক্ত হওয়ার কথা ছিল, তাঁদের অনেকে তালিকার বাইরে ছিলেন। আবার যাঁদের তালিকাভুক্ত হওয়ার কথা ছিল না, তাঁদের অনেকে সুবিধা পেয়েছেন। কর্মসূচিগুলো বিচ্ছিন্নভাবে পরিচালিত হওয়ায় প্রত্যাশিত সুফল পাওয়া যায়নি।”

উপদেষ্টা উল্লেখ করেন, বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে গত কয়েক বছরে কার্যকর সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থার ঘাটতির কারণে দারিদ্র্য বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি উঠে এসেছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার ফ্যামিলি কার্ড ও ফারমারস কার্ড প্রদানের মতো উদ্যোগ নিচ্ছে। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে উপকারভোগী নির্বাচন এবং প্রকৃত সুবিধাভোগীদের কাছে সহায়তা পৌঁছানো সম্ভব হবে বলে তিনি জানান।

রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, ২০৩০ সালের মধ্যে জিডিপির অনুপাতে কর আহরণ ১০ শতাংশে উন্নীত করতে চায় সরকার। একই সঙ্গে ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষা এবং আর্থিক খাতে জবাবদিহি নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

অতীতের আর্থিক অনিয়মের প্রসঙ্গ তুলে ধরে উপদেষ্টা বলেন, বাংলাদেশের সাধারণ মানুষকে ব্যাংকসহ বিভিন্ন খাতের অর্থ লুটপাটের বড় ধরনের মূল্য দিতে হচ্ছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ব্যাংক খাত থেকে প্রায় ৪০ বিলিয়ন ডলার লুট করা হয়েছে। এ অর্থ জনগণের। তাই আর্থিক খাতে অনিয়ম ও লুটপাটের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।

রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, “যারা অর্থ লুট করেছে এবং যারা এ ধরনের কর্মকাণ্ডে সহায়তা করেছে, তারা দেশে বা বিদেশে যেখানেই থাকুক, তাদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি।”

উল্লেখ্য, আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক গ্রুপের বার্ষিক সভা থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে ১২ অক্টোবর শুরু হয়েছে, যা চলবে ১৮ অক্টোবর পর্যন্ত। এই সভায় বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, আর্থিক স্থিতিশীলতা, দারিদ্র্য বিমোচন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধিসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনা হচ্ছে।