দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের অর্থনীতির গতি সবচেয়ে মন্থর হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে; পাশাপাশি মূল্যস্ফীতির চাপও থাকবে সর্বোচ্চ। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সাম্প্রতিক পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি কমে ৩ দশমিক ২ শতাংশে নেমে আসতে পারে। একই সময়ে বার্ষিক গড় মূল্যস্ফীতির হার হতে পারে ১০ দশমিক ৯ শতাংশ।

আগামী কয়েক বছরেও অর্থনীতির ঘুরে দাঁড়ানোর কোনো জোরালো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। বরং আইএমএফ মনে করছে, আগামী অর্থবছরে প্রবৃদ্ধির হার আরও কমে ২ দশমিক ২ শতাংশে নেমে আসতে পারে। গতকাল মঙ্গলবার আইএমএফ তাদের 'ওয়ার্ল্ড ডেভেলপমেন্ট আউটলুক' প্রকাশ করেছে, যেখানে বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতির পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।

প্রবৃদ্ধির এই নিম্নমুখী প্রবণতা বিনিয়োগ এবং কর্মসংস্থানের ওপর মারাত্মক চাপ সৃষ্টি করবে, আর উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা আরও হ্রাস পাবে। এরই মধ্যে বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, গত ৪ বছরে প্রায় ৮০ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছে। এছাড়া দেশের প্রায় সোয়া ছয় কোটি মানুষ বর্তমানে দারিদ্র্যের ঝুঁকিতে রয়েছেন।

অর্থনীতির এই দুর্বলতার প্রভাব কেবল পরিসংখ্যানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা সরাসরি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় প্রভাব ফেলছে। দুর্বল ব্যাংক খাত, জ্বালানি সংকট, বেসরকারি বিনিয়োগের স্থবিরতা এবং রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। ফলে অর্থনীতির পুনরুদ্ধার, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।

কেবল আইএমএফ নয়, বিশ্বব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকও (এডিবি) তুলনামূলক কম প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দিয়েছে। গত ৬ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের 'ডেভেলপমেন্ট আপডেট' প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি হতে পারে ৩ দশমিক ৪ শতাংশ। গত মাসে এডিবি জানিয়েছিল, এবার প্রবৃদ্ধি হতে পারে ৪ শতাংশ। তবে এই সব সংস্থার পূর্বাভাসের বিপরীতে সরকার চলতি অর্থবছরে সাড়ে ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে।

সরকারি হিসাব অনুযায়ী, গত অর্থবছরে প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৪ দশমিক ১৪ শতাংশ। আইএমএফ-এর বর্তমান পূর্বাভাস অনুযায়ী, গত সাড়ে তিন দশকে বাংলাদেশে এত কম প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা আগে দেখা যায়নি। অন্যদিকে, মূল্যস্ফীতির যে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে, তা গত দেড় দশকের মধ্যে বার্ষিক গড় হিসেবে সর্বোচ্চ।

বর্তমানে থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক যৌথ সভা চলছে। সেখানে গতকাল বিশ্বব্যাংকের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। বৈঠক শেষে প্রবৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতির পূর্বাভাস সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, “তারা (আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক) তাদের পূর্বাভাস দিয়েছে। তাদের পূর্বাভাসকে বিতর্কিত করতে চাই না। বাজেটে যে লক্ষ্য দেওয়া হয়েছে, সে অনুসারে কাজ চলছে।”

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “অর্থনীতি এখন যেভাবে চলছে, তাতে প্রবৃদ্ধি দুর্বল হবে, মূল্যস্ফীতি উচ্চ পর্যায়ে যাবে। আইএমএফ, বিশ্বব্যাংকসহ বিভিন্ন সংস্থা বলছে, দেশের অর্থনীতি এখন কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সাধারণ মানুষ চাপের মধ্যে আছে, সামনে চাপ আরও বাড়বে। মূল্যস্ফীতি মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমিয়ে দেবে, যা দারিদ্র্য বাড়াবে।”

প্রবৃদ্ধির নিম্নগতি নিয়ে আইএমএফ আগামী চার অর্থবছরের পূর্বাভাসও দিয়েছে। সেই অনুযায়ী, ২০২৭–২৮ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ২ দশমিক ২ শতাংশে নেমে আসতে পারে, যা কোভিডকালীন প্রবৃদ্ধির চেয়েও কম। পরবর্তী দুই অর্থবছরে যথাক্রমে ২ দশমিক ৮ শতাংশ ও ২ দশমিক ৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে এবং ২০৩০–৩১ অর্থবছরে তা বেড়ে ৩ শতাংশ হতে পারে। অর্থাৎ আগামী তিন বছর অর্থনীতি খুব বেশি চাঙ্গা হবে না বলে ধারণা করা হচ্ছে।

গতকাল প্রকাশিত প্রতিবেদনে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের চিত্রও উঠে এসেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬–২৭ অর্থবছরে ভারতের প্রবৃদ্ধি হতে পারে ৭ শতাংশ ও মূল্যস্ফীতি ৪ দশমিক ৪ শতাংশ; পাকিস্তানের প্রবৃদ্ধি সাড়ে ৩ শতাংশ; শ্রীলঙ্কার প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৭ শতাংশ ও মূল্যস্ফীতি ৫ দশমিক ৪ শতাংশ; নেপালের প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৭ শতাংশ ও মূল্যস্ফীতি ৫ দশমিক ৮ শতাংশ; মালদ্বীপের প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৮ শতাংশ ও মূল্যস্ফীতি আড়াই শতাংশ এবং ভুটানে প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৯ শতাংশ ও মূল্যস্ফীতি সাড়ে ৬ শতাংশ হতে পারে।

আইএমএফ-এর প্রতিবেদনে বাংলাদেশের অর্থনীতির চ্যালেঞ্জ নিয়ে বিস্তারিত বিশ্লেষণ না থাকলেও, গত ৬ সেপ্টেম্বর বিশ্বব্যাংকের 'বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট' অক্টোবর সংস্করণে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, দেশের অর্থনীতিতে একসঙ্গে কয়েকটি চাপ তৈরি হয়েছে। প্রবৃদ্ধি কমছে, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান দুর্বল হচ্ছে এবং মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের প্রকৃত আয় হ্রাস পাচ্ছে। এর পাশাপাশি ব্যাংক খাতের দুর্বলতা, জ্বালানি সংকট ও রাজস্ব ঘাটতি ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। বিশেষ করে ব্যাংক খাতের দুর্বলতাকে অর্থনীতির অন্যতম বড় ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করেছে বিশ্বব্যাংক।

বিশ্বব্যাংকের মতে, উচ্চ মূল্যস্ফীতিতে প্রকৃত আয় কমে যাওয়া এবং কর্মসংস্থানে মন্দার কারণে দারিদ্র্যের হার বেড়েছে। গত ৪ বছরে প্রায় ৮০ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমেছে এবং গত অর্থবছরেই নতুন করে প্রায় ২১ লাখ মানুষ এই সীমায় পৌঁছেছে। জাতীয় দারিদ্র্যের হার টানা চতুর্থ বছর বেড়েছে; ২০২২ সালে যা ছিল ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ, গত অর্থবছরে তা আনুমানিক ২২ দশমিক ৫ শতাংশে উঠেছে এবং চলতি অর্থবছরে তা আরও বেড়ে ২২ দশমিক ৮ শতাংশ হতে পারে। একই সময়ে আয়বৈষম্যও বৃদ্ধি পেয়েছে।

ব্যাংক খাতের দুর্বলতা নিয়ে বিশ্বব্যাংক জানিয়েছে, ২০২৪ সালের ডিসেম্বর শেষে খেলাপি ঋণের হার ছিল ২০ দশমিক ২ শতাংশ, যা ২০২৬ সালের জুনে বেড়ে ৩৩ দশমিক ২ শতাংশ হতে পারে। এছাড়া বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি গত ৩৩ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছেছে। গ্যাস ও বিদ্যুতের ঘাটতির কারণে অনেক কারখানা পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারেনি, ফলে অনেক প্রতিষ্ঠান কর্মঘণ্টা কমিয়েছে, উৎপাদন বন্ধ রেখেছে অথবা কর্মী ছাঁটাই করেছে। গত বছর বিদেশি বিনিয়োগও ১৫ শতাংশ কমেছে।

জ্বালানি তেল আমদানিতে সরকারকে বাড়তি কয়েক বিলিয়ন ডলার ব্যয় করতে হয়েছে। অন্যদিকে, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) কাঙ্ক্ষিত রাজস্ব আদায় করতে ব্যর্থ হচ্ছে। জুলাই-আগস্টের প্রথম দুই মাসে রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি ২৫ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে।

এই পরিস্থিতি উত্তরণে করণীয় সম্পর্কে অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, “মূল্যস্ফীতি বশে আনতে হবে। প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধির জন্য যে বাধাগুলো আছে, তা দূর করতে হবে। বাধাগুলোর মধ্যে আছে দুর্বল ব্যাংক খাত, জ্বালানিসংকট, বিশৃঙ্খল বাজেট ব্যবস্থাপনা, অপর্যাপ্ত সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি। এসব বিষয়ে সংস্কার প্রয়োজন।”