বিশ্বব্যাংক তাদের সাম্প্রতিক উন্নয়নবিষয়ক হালনাগাদ প্রতিবেদনে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি, জ্বালানি সংকট, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা এবং রাজস্ব আদায়ের যে চিত্র তুলে ধরেছে, তা বর্তমান সময়ের বাস্তব প্রতিফলন বলে মনে করেন সাবেক অর্থনীতিবিদরা। প্রতিবেদনে বর্ণিত তথ্যের সাথে একমত পোষণ করে বলা হয়েছে, এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সরকার এই তথ্যের আলোকে কী ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, চলতি অর্থবছরে মোট দেশজ আয়ের (জিডিপি) প্রকৃত প্রবৃদ্ধির হার ৩ দশমিক ৪ শতাংশ হতে পারে। এই পর্যবেক্ষণের সাথে সম্পূর্ণ একমত হয়ে বলা হয়েছে, চলতি অর্থবছরে অর্থনীতির ঘুরে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা খুব একটা দেখা যাচ্ছে না। এমনকি পরবর্তী বছরের জন্য যে ৩ দশমিক ৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে, সেটিও যথেষ্ট দুর্বল এবং সেই লক্ষ্য অর্জিত হবে কি না, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই।
এর পাশাপাশি প্রতিবেদনে দারিদ্র্যের হার বৃদ্ধি, বিনিয়োগের সংকোচন, রপ্তানি হ্রাস, বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবাহ কমে যাওয়া, শ্রমবাজারে নারীর অংশগ্রহণের স্বল্পতা এবং শিল্প উৎপাদন হ্রাসের যে চিত্র ফুটে উঠেছে, তা অত্যন্ত বাস্তবসম্মত বলে মনে করা হচ্ছে।
বিশ্বব্যাংক অর্থনৈতিক সংস্কারের জন্য প্রধানত তিনটি খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে, যার মধ্যে ব্যাংক খাত অন্যতম। ব্যাংক খাতের সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে কোনো বিতর্ক নেই, তবে মূল চ্যালেঞ্জ হলো তা বাস্তবায়নের পদ্ধতি। বিশ্বব্যাংক দুর্বল ব্যাংকগুলোকে নিষ্পত্তির দিকে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছে, যা সঠিক পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত।
আকার-ইঙ্গিতে বিশ্বব্যাংক স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, সব প্রতিষ্ঠানকে বাঁচিয়ে রাখার প্রয়োজন নেই। যেসব ব্যাংক দীর্ঘকাল ধরে দুর্বল ও রুগ্ন হয়ে পড়েছে, সেগুলোকে কৃত্রিমভাবে টিকিয়ে রাখার চেষ্টা বৃথা। এই ধরনের প্রতিষ্ঠান বাঁচিয়ে রাখা সরকারের জন্য যেমন ব্যয়বহুল, তেমনি পুরো ব্যাংকিং খাতের জন্য তা চরম ঝুঁকি তৈরি করে। কারণ দুর্বল ব্যাংকের নেতিবাচক প্রভাব অন্যান্য সুস্থ ব্যাংকের ওপরও পড়ে। তাই এদের অবসায়ন বা বিলুপ্তির পথেই হাঁটতে দেওয়া উচিত।
বর্তমানে ব্যাংক রেজোল্যুশন অধ্যাদেশের মাধ্যমে দুর্বল ব্যাংক অবসায়নের আইনি কাঠামো তৈরি করা হয়েছে। এখন দেখার বিষয় হলো, সরকার বা বাংলাদেশ ব্যাংক এই আইনের যথাযথ প্রয়োগ করবে কি না। দেশের প্রচলিত মানসিকতা হলো প্রতিষ্ঠানকে যেকোনো উপায়ে বাঁচিয়ে রাখা। উদাহরণস্বরূপ, অতীতে অন্তর্বর্তী সরকার পাঁচটি ব্যাংক একীভূত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, যদিও তারা চাইলে অন্তত দুটি ব্যাংক অবসায়ন করে বাকিগুলো একীভূত করতে পারত।
জ্বালানি সংকটের বিষয়ে বলা হয়েছে, স্বল্প মেয়াদে এলএনজি (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) অবকাঠামো বাড়ানো ছাড়া সরকারের সামনে আর কোনো বিকল্প নেই। পাশাপাশি দেশীয় গ্যাস উত্তোলনে অধিক গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। তবে স্থলভাগে গ্যাসের সম্ভাবনা খুব বেশি নেই, কারণ বিদ্যমান কূপগুলোতে আরও গভীরে গিয়ে গ্যাস তোলার খরচ অনেক বেশি। মূল সম্ভাবনা রয়েছে সমুদ্রসীমায় বা অফশোরে। ভারত ও মিয়ানমার তাদের এলাকায় গ্যাস উত্তোলন করতে সক্ষম হলেও বাংলাদেশ সমুদ্রসীমায় ব্লক নির্ধারণ এবং আন্তর্জাতিক দরপত্র তৈরির প্রক্রিয়ায় আটকে আছে।
রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে করছাড় বা অব্যাহতি কমানো এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) নীতি ও বাস্তবায়ন বিভাগ পৃথক করার যে পরামর্শ বিশ্বব্যাংক দিয়েছে, তাকে গড়পড়তা হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। উল্লেখ করা হয়েছে যে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে কেন এনবিআর পৃথক করার উদ্যোগটি আটকে গেল, তার বিশ্লেষণ বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে থাকা উচিত ছিল। কারণ এখন পুনরায় পৃথক করতে গেলে সেই পুরনো অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও সমস্যাগুলো আবারও সামনে আসতে পারে।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এবং সরকারি কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির ফলে মূল্যস্ফীতিতে যে নতুন ধাক্কা আসতে পারে, তা মোকাবিলা করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। অতীতের অভিজ্ঞতার আলোকে একটি হিসাব অনুযায়ী, সাম্প্রতিক বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির কারণে ১ থেকে ২ শতাংশ খাদ্য মূল্যস্ফীতি এবং ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ১ থেকে ১ দশমিক ৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে মুদ্রানীতিকে প্রধান হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক সম্প্রতি রেপো হার কিছুটা কমিয়েছে, তবে এটি না কমালেই ভালো হতো। শোনা যাচ্ছে, বাংলাদেশ ব্যাংক রেপো হার আরও কমাতে চায়, তবে নীতি সুদহার আর কমানো উচিত হবে না। এছাড়া শিল্প-কারখানা সচল করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পুনঃঅর্থায়ন কর্মসূচি যেন সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যভিত্তিক হয়, সেদিকে নজর দিতে হবে। প্রকৃত শিল্পপ্রতিষ্ঠানের পরিবর্তে বড় খেলাপিরা এই অর্থ পেলে তা উৎপাদনশীলতায় যোগ হবে না, বরং মূল্যস্ফীতি আরও বাড়বে।
পরিশেষে মনে রাখতে হবে যে, আন্তর্জাতিক সংকট এখনো কাটেনি এবং অনেক ঝুঁকি বিদ্যমান। এই পরিস্থিতিতে বিনিময় হার নমনীয় রেখে রিজার্ভ সুরক্ষিত রাখা জরুরি। বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধির লক্ষ্যে আর্থিক খাতের দুর্বলতা দূর করা, জ্বালানির নির্ভরযোগ্য ব্যবস্থা নিশ্চিত করা এবং নীতিমালার ধারাবাহিকতা বজায় রাখা প্রয়োজন বলে মনে করেন জাহিদ হোসেন, সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ, বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়।