ড. মোহাম্মদ আবু ইউসুফ অর্থনীতিবিদ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক। রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্টের (র্যাপিড) নির্বাহী পরিচালক হিসাবে দায়িত্ব পালন করছেন। বাংলাদেশের উন্নয়ন ও দারিদ্র্য পরিস্থিতি, অর্থনীতির ঘুরে দাঁড়ানোর উপায়, ব্যাংক ও রাজস্ব খাতের সংস্কার—এসব বিষয়ে কথা বলেছেন মুক্তকণ্ঠের সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মনোজ দে ।
বিশ্বব্যাংকের সদ্য প্রকাশিত বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট প্রতিবেদন বলছে, ৬ কোটি ২০ লাখ মানুষ এমন নাজুক অবস্থায় রয়েছেন যে একটি অর্থনৈতিক ধাক্কায় তাঁরা দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যেতে পারেন। আমাদের উন্নয়নের গল্পে মূল গলদটা আসলে কোথায়?
মোহাম্মদ আবু ইউসুফ: আমরা যখন কোনো দেশের উন্নয়নের কথা বলি, তখন দুটি বিষয় খুব গুরুত্বপূর্ণ—রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা। বাংলাদেশে দীর্ঘদিন পর গণতান্ত্রিক সরকার দায়িত্ব নিয়েছে। আমরা আশা করছি, এর মধ্য দিয়ে দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আসবে। এখন সবচেয়ে বড় প্রয়োজন অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে রাজনৈতিক পরিবর্তন ও নানা সংকটকে কেন্দ্র করে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারী ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল। দেশের অর্থনীতি কোন দিকে যাবে, বিনিয়োগের পরিবেশ কেমন হবে—এসব প্রশ্নে তাঁদের মধ্যে আস্থার ঘাটতি ছিল। এর আগে কোভিড মহামারি এবং পরে বিভিন্ন যুদ্ধ ও আন্তর্জাতিক সংকটও অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলেছে। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই ইরান–যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধসহ বৈশ্বিক নানা সংকট সামনে এসেছে। বাংলাদেশ আমদানিকারক দেশ হওয়ায় এসব পরিস্থিতির প্রভাব আমাদের অর্থনীতিতে পড়ে। ফলে অর্থনীতিতে আস্থা ফিরিয়ে আনাটাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
বাংলাদেশে উচ্চ মূল্যস্ফীতি অব্যাহত থাকায় নিম্ন ও সীমিত আয়ের মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমেছে। দরিদ্র ও অতিদরিদ্র জনগোষ্ঠীর পাশাপাশি দারিদ্র্যসীমার ঠিক ওপরে থাকা ‘ভালনারেবল নন-পুওর’ পরিবারগুলোও ঝুঁকিতে পড়েছে। কোনো অর্থনৈতিক ধাক্কা বা দুর্যোগে তারা আবার দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যেতে পারে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি মজুরি বৃদ্ধি ও মানুষের প্রকৃত আয় বাড়ানো জরুরি।
প্রতিবছর প্রায় ২২ লাখ তরুণ কর্মজগতে প্রবেশ করেন। তাঁদের জন্য পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান তৈরি করতে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর পাশাপাশি আত্মকর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা উন্নয়নে গুরুত্ব দিতে হবে। শুধু স্বল্পমেয়াদি প্রশিক্ষণ নয়, তরুণদের ব্যবসার ধারণা, অর্থায়ন ও বাজারের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
বিদেশে কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ কাজে লাগাতে আন্তর্জাতিক মানের দক্ষ জনশক্তি গড়ে তুলতে হবে। ইলেকট্রিশিয়ান, প্লাম্বার ও কেয়ারগিভারের মতো পেশায় চাহিদা বিবেচনায় প্রশিক্ষণ দিতে পারে সরকার। একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিক্যাল কলেজ ও কারিগরি শিক্ষার মান নিশ্চিত করে শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে শিক্ষাকে যুক্ত করতে হবে।
উন্নয়নকে অন্তর্ভুক্তিমূলক করাও জরুরি। সরকারি ঋণ গ্রহণ যেন বেসরকারি খাতের অর্থায়ন সংকুচিত না করে, সেদিকেও নজর দিতে হবে। তরুণদের কর্মসংস্থান, দক্ষতা উন্নয়ন ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারলেই রাজনৈতিক পরিবর্তনকে টেকসই অর্থনৈতিক ও সামাজিক অগ্রগতিতে রূপ দেওয়া সম্ভব হবে।
বিশ্বব্যাংকের পর আইএমএফের প্রতিবেদনও বলছে, দেশে দারিদ্র্য বাড়বে, জিডিপি প্রবৃদ্ধির গতি মন্থর হবে। দুই–এক বছরের মধ্যে অর্থনীতির ঘুরে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা কতটা দেখছেন?
মোহাম্মদ আবু ইউসুফ: আমাদের অর্থনীতির ঘুরে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা অনেকটাই আছে। সরকার বাজেট বক্তৃতায় ১০টি অগ্রাধিকারের কথা বলেছে। সেখানে সৎ ও যোগ্য নেতৃত্ব এবং জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠানের কথা বলা হয়েছে। কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ ও সিঙ্গেল উইন্ডো সার্ভিসের কথাও বলা হয়েছে। এখন এ বিষয়গুলো ধরে ধরে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
এটা সত্যি যে, যুদ্ধ–মহামারির মতো এমন কিছু বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট থাকে যেগুলোর নিয়ন্ত্রণ আমাদের হাতে থাকে না। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের সংকট দেখা দিলে আমাদের বাইরে থেকে তেল আমদানি করতে হয়। কিন্তু যেসব বিষয় আমাদের নিয়ন্ত্রণে আছে, সেগুলোতে আমাদের করণীয় যথাযথভাবে পালন করতে হবে। যে প্রকল্প তিন বছরে শেষ করার কথা সেটি তিন বছরেই শেষ করতে হবে। সময় ও ব্যয় বাড়ানো হলে বাড়তি বোঝাটা শেষ পর্যন্ত সবার ওপরই পড়ে।
যদি সুনির্দিষ্ট করে বলতে বলি, তাহলে অর্থনীতির ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য আমাদের করণীয় কী?
মোহাম্মদ আবু ইউসুফ: অর্থনীতির ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য আমাদের একটা বিগ পুশ বা বড় ধাক্কা দরকার। এটিকে আমি তিনটি ‘সি’ দিয়ে ব্যাখ্যা করতে চাই।
প্রথমত, কম্প্রিহেনসিভনেস বা সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি। আমরা যদি বিচ্ছিন্নভাবে ব্যাংকিং খাত বা রাজস্ব খাত নিয়ে চিন্তা করি, তাহলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাবে না। কারণ, একটি খাতের সঙ্গে অন্য খাতের যোগসূত্র রয়েছে। এ জন্য আমাদের সমন্বিত ও সমন্বয়যোগ্য ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। যেমন রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা চালু করা প্রয়োজন। উদাহরণ হিসাবে বলব যে. রাজস্ব আদায় বাড়াতে গিয়ে যদি সিটি করপোরেশনের হোল্ডিং নম্বরের তথ্যের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট তথ্যভান্ডার যুক্ত করতে না পারি, তাহলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাবে না। এখানে স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার সঙ্গে বিভিন্ন ব্যবস্থার আন্তসংযোগ সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
দ্বিতীয়ত, কো-অর্ডিনেশন বা সমন্বয়। সরকারের বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে কার্যকর সমন্বয় থাকতে হবে। অনেক সময় দেখা যায়, ওয়াসার কাজের সঙ্গে বিদ্যুৎ বিভাগের কাজের সমন্বয় থাকে না। ফলে একই এলাকায় বারবার খোঁড়াখুঁড়ি করতে হয়, ব্যয় বাড়ে, মানুষের দুর্ভোগ বাড়ে। বিনিয়োগসংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে সমন্বিত কাঠামোর আওতায় আনার যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, সেটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। তবে সে অনুযায়ী কার্যকর পদক্ষেপও নিতে হবে।
তৃতীয়ত, কমপ্লায়েন্স বা বিধিবিধান মেনে চলা। বর্তমান বিশ্বে একটি কথা খুব শক্তভাবে প্রচলিত আছে, ‘নো কমপ্লায়েন্স, নো বিজনেস’। কমপ্লায়েন্সের ক্ষেত্রে আমরা যে শূন্য সহিষ্ণুতার কথা বলি, সেখানে ছাড় দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। পরিবেশগত, সামাজিক কিংবা অর্থনৈতিক—যে ধরনের কমপ্লায়েন্সই হোক না কেন, সেটা নিশ্চিত করতে হবে। সব খাতেই এ বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে।
অর্থনীতির ঘুরে দাঁড়াতে এই তিন ‘সি’ অবশ্যই একসঙ্গে নিশ্চিত করতে হবে। আমরা যদি সুশাসন নিশ্চিত করতে পারি, প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করতে পারি, তাহলে অর্থনীতির ঘুরে দাঁড়ানোর পথ সহজ হবে। আমাদের মূল সমস্যা হলো, নিয়মকানুন আছে, কিন্তু সেগুলোর যথাযথ প্রয়োগ নেই। একটি উদাহরণ দিই। ২০০৯ সালে প্রণীত পাবলিক মানি অ্যান্ড বাজেট ম্যানেজমেন্ট আইনে প্রতি তিন মাস অন্তর বাজেটের অগ্রগতি সংসদে উপস্থাপনের বিধান রয়েছে। কিন্তু এর যথাযথ প্রয়োগ না হলে অর্থনীতি কোন দিকে যাচ্ছে, বাজেট বাস্তবায়নে কী অগ্রগতি হচ্ছে কিংবা কোথায় সমস্যা রয়েছে, তা বোঝা সম্ভব নয়।
বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর পাঁচ বছর মেয়াদি একটি সংস্কার কৌশল প্রণয়ন করেছে। সেখানে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার, সরকারি ও বেসরকারি বিনিয়োগ এবং জাতীয় সঞ্চয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এই কৌশল অনুযায়ী কাজ হচ্ছে কি না, সেটা নির্ধারণের উপায় কী? এ জন্য একটি সমন্বিত ড্যাশবোর্ড তৈরি করা যেতে পারে, যেখানে কেপিআই–ভিত্তিক অগ্রগতি পরিমাপ করা যাবে। এটিকে জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। কোনো ক্ষেত্রে লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী অগ্রগতি হলে, তা সবুজসংকেত এবং অগ্রগতি না হলে তা লালসংকেতের মাধ্যমে প্রকাশ করতে হবে। এতে সমস্যার জায়গাগুলো চিহ্নিত করা সহজ হবে এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জবাবদিহির আওতায় আনা যাবে।
অর্থনীতিতে আস্থা ফেরাতে সবার আগে ব্যাংকিং খাতের সংস্কার জরুরি। এই খাতের সংস্কারের পথ কী?
মোহাম্মদ আবু ইউসুফ: বর্তমানে প্রায় ৬১-৬২টি ব্যাংক রয়েছে, যা অনেক দেশের তুলনায় বেশি। এর মধ্যে অনেক ব্যাংকের অনুমোদন রাজনৈতিক বিবেচনায় দেওয়া হয়েছে। এর নেতিবাচক প্রভাব এখন সরকার ও জনগণকে সামলাতে হচ্ছে।
সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের সঙ্গে অর্থনীতিবিদ ও বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিদের বৈঠক হয়েছে। সেখানে গভর্নর বলেছেন, রাজনৈতিক বিবেচনায় কোনো ব্যাংকের পরিচালক নিয়োগ দেওয়া হবে না। এটি ইতিবাচক উদ্যোগ। তবে এর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করাই হবে মূল চ্যালেঞ্জ। ব্যাংকের অর্থ মূলত আমানতকারী ও গ্রাহকদের। ব্যাংকিং খাতের প্রতি আমানতকারী, ব্যবসায়ী ও করদাতাদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে। অর্থনীতিকে বর্তমান অবস্থা থেকে উত্তরণ ঘটাতে এই আস্থা পুনরুদ্ধার অত্যন্ত জরুরি। সরকারি ব্যাংকগুলোর তদারকি করে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ, আর বেসরকারি ব্যাংকগুলোর তদারকি করে বাংলাদেশ ব্যাংক। এই দ্বৈত প্রশাসনিক ব্যবস্থা দূর করে তদারকির দায়িত্ব সমন্বিত করা যায় কি না, তা নিয়েও আলোচনা হচ্ছে। ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে এ ধরনের সংস্কার প্রয়োজন। আইএমএফ বা অন্য কারো চাপে নয়, আমাদের নিজেদের স্বার্থেই সংস্কার করতে হবে।
ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে প্রয়োজনে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হবে। পরিস্থিতির কারণে দু-একটি ব্যাংক বন্ধ করে দেওয়ার প্রয়োজন হলে আমানতকারীদের স্বার্থ সুরক্ষিত রেখে সরকারকে দৃঢ় অবস্থান নিতে হবে। এ ক্ষেত্রে অবশ্যই ‘ক্যারট অ্যান্ড স্টিক’ নীতি অনুসরণ করতে হবে। ভালো কাজের জন্য পুরস্কার, অনিয়মের জন্য শাস্তি। যাঁরা নিয়মিত ঋণের কিস্তি পরিশোধ করেন, এমন ঋণগ্রহীতাদের প্রণোদনা দিতে হবে। বৈশ্বিক পরিস্থিতি বা অনিবার্য কারণে কেউ ঋণ পরিশোধে সমস্যায় পড়লে তাঁকে সহায়তা দিতে হবে। কিন্তু ব্যাংক খাত বাঁচাতে ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের কোনো ছাড় দেওয়া যাবে না। তাঁদের বিশেষ সুবিধা বা দায় এড়ানোর সুযোগ দিলে নিয়মিত ঋণ পরিশোধকারীদের প্রতি অবিচার করা হবে।
অর্থঋণ আদালতে দীর্ঘদিন মামলা ঝুলে থাকা এবং স্থগিতাদেশের কারণে ঋণ আদায় বাধাগ্রস্ত হওয়ার বিষয়টিও সমাধান করতে হবে। এ জন্য বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করে ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের মামলার বিচার ছয় মাসের মধ্যে শেষ করার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা গেলে অন্যরাও সতর্ক হবেন। ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে সংস্কারের বিকল্প নেই। এর জন্য দলমত-নির্বিশেষে শক্তিশালী রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকতে হবে।
সংস্কার যে জরুরি, সেটা সবাই জানেন। এরপরও সংস্কারটা হয় না কেন? এখানে বাধা আসলে কোথায়?
মোহাম্মদ আবু ইউসুফ: সংস্কার এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে সরকারকে। এ জন্য প্রয়োজন দৃঢ় রাজনৈতিক সদিচ্ছা। নির্বাচনী ইশতেহার ও বাজেট বক্তৃতায় অনেক সংস্কারের কথা বলা হয়েছে। এখন সেগুলো বাস্তবায়নে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো সংস্কারের ঘোষণা ও বাস্তবায়নের মধ্যে ব্যবধান। আমাদের নীতি ও পরিকল্পনায় যা বলা আছে, তার যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। সংস্কার করতে গেলে বিভিন্ন স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর বাধা আসবে। এ ক্ষেত্রে সরকারকে সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে যৌক্তিক আলোচনার ভিত্তিতে সংস্কার কার্যক্রম এগিয়ে নিতে হবে। এতে ব্যবসায়ী, দেশ ও জনগণ—সবাই উপকৃত হবে, পাশাপাশি সরকারের ভাবমূর্তিও উজ্জ্বল হবে। যত দ্রুত সংস্কার বাস্তবায়ন করা যাবে, তত দ্রুত আমরা সামনে এগিয়ে যেতে পারব।
দেশে চার বছরের বেশি সময় ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি চলছে। বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের প্রচলিত অস্ত্রগুলো কেন কোনো কাজে আসে না।
মোহাম্মদ আবু ইউসুফ: মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের তিনটি জায়গা আছে। প্রথমত, মুদ্রানীতি। কেন্দ্রীয় ব্যাংক নীতি সুদ বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেছে।
দ্বিতীয়ত, রাজস্ব নীতি। সরকার অনেক আমদানিপণ্যে শুল্ক কমিয়ে দেয় বা ভর্তুকি দেয়। কিন্তু এর সুফল যদি বাজারে প্রতিফলিত না হয়, তাহলে সেই উদ্যোগের উদ্দেশ্য পূরণ হয় না। যেমন সরকার এলপিজি গ্যাসের দাম নির্ধারণ করে দিলেও বাজারে বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। এর অর্থ, বাজার তদারকিতে দুর্বলতা রয়েছে। সরকার রাজস্ব হারাচ্ছে, কিন্তু জনগণ সেই সুবিধা পাচ্ছে না।
তৃতীয়ত, বাজার ব্যবস্থাপনা। মুক্তকণ্ঠের একটি প্রতিবেদনেই দেখলাম যে মাল্টা ৮৭ টাকায় আমদানি করা হচ্ছে, বাজারে সেটি ৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। শুল্ক ও অন্যান্য খরচ যোগ করে এর দাম সর্বোচ্চ ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা হতে পারে। কিন্তু বারবার হাতবদল ও চাঁদাবাজির কারণে দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাচ্ছে।
বাজারব্যবস্থায় শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করতে হলে দুই–তিন দিনের অভিযান যথেষ্ট নয়। বছরজুড়ে একটি ধারাবাহিক তদারকি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। স্থানীয় প্রশাসন, স্থানীয় সরকার ও বাজার কমিটিকে সম্পৃক্ত করে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। চাঁদাবাজি বন্ধ করতে হবে। উৎপাদক থেকে ভোক্তা পর্যন্ত সরবরাহব্যবস্থা স্বাভাবিক রাখতে হবে, যাতে মধ্যস্বত্বভোগীরা অতিমুনাফা করতে না পারে।
একটা বিষয় মনে রাখা দরকার যে, সাধারণ মানুষ ২০০-৩০০ ধরনের পণ্য ব্যবহার করে না। তাদের দৈনন্দিন চাহিদা মূলত কিছু নির্দিষ্ট খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যকে ঘিরে। চাল, তেল, আলু, পেঁয়াজের মতো অত্যাবশ্যকীয় পণ্যের উৎপাদন, সম্ভাব্য ঘাটতি ও আমদানির সময়সূচি নির্ধারণ করে সারা বছর তদারকি করা গেলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।
ভারত বা শ্রীলঙ্কা যদি মূল্যস্ফীতি ৩ থেকে ৫ শতাংশের মধ্যে রাখতে পারে, তাহলে আমরা কেন পারব না? কার্যকর প্রয়োগ, ধারাবাহিক তদারকি ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশেও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
বাংলাদেশে আয় ও সম্পদের বৈষম্য ক্রমাগত বাড়ছে। ২০২২ সালে গিনি সহগ থেকে দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশ চরম বৈষম্যমূলক দেশের একেবারে প্রান্তে দাঁড়িয়ে। চার বছর পর পরিস্থিতি কোথায় এসে দাঁড়িয়েছে।
মোহাম্মদ আবু ইউসুফ: প্রথম কথা হলো, খানা আয় ও ব্যয় জরিপ নিয়মিত করা দরকার। এখন ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে আমরা ২০২২ সালের তথ্য নিয়ে কথা বলছি। কার্যকর নীতি প্রণয়নের জন্য হালনাগাদ তথ্য প্রয়োজন।
সরকারি হিসাবে, ২০২২ সালে দারিদ্র্যের হার ছিল ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ। যদিও বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক হিসাব বলছে, তা বেড়ে ২২ শতাংশ ছাড়িয়েছে। অন্যদিকে, গিনি সহগ বাড়ছে। অর্থাৎ দারিদ্র্যের হার কমলেও আয়বৈষম্য ক্রমাগত বাড়ছে। শীর্ষ ১০ শতাংশ মানুষের হাতে মোট আয়ের ৪১ শতাংশ রয়েছে। সম্পদের ক্ষেত্রেও শীর্ষ ১ শতাংশের হাতে বিপুল সম্পদ পুঞ্জীভূত হয়েছে।
আয়বৈষম্য কমাতে হলে আমাদের করকাঠামোতে পরিবর্তন আনতে হবে। ৫০০ বিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে বছরে মাত্র ৪২ থেকে ৪৩ লাখ কর বিবরণী জমা পড়ে। এর বড় অংশই সরকারি–বেসরকারি চাকরিজীবী। অনেক ক্ষেত্রেই শূন্য রিটার্ন বিবরণী জমা পড়ছে। তাই যারা নিয়মিত কর দেন তাদের ঘাড়ে নতুন বোঝা না চাপিয়ে করের আওতা বাড়ানো জরুরি। শুধুমাত্র ঢাকা, চট্টগ্রামসহ বড় শহরগুলোর ফ্ল্যাট ও প্লটের মালিকানা–সংক্রান্ত তথ্য জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্যভান্ডারের সঙ্গে আন্তসংযোগ করা গেলে করদাতার সংখ্যা অনেক বাড়ানো সম্ভব।
এ ছাড়া গ্রামাঞ্চলে ক্যাশলেস লেনদেন ও বাংলা কিউআর কোড চালু করেও লেনদেনের স্বচ্ছতা বাড়ানো এবং কর ফাঁকি কমানো সম্ভব। একই সঙ্গে এনবিআরের কার্যক্রমে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা চালু করতে হবে। ২০১২ সালের ভ্যাট আইন প্রণয়নের পর থেকেই ইলেকট্রনিক ফিসকাল ডিভাইস (ইএফডি) ব্যবহারের কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু এখনো সবখানে এর কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করা যায়নি। ভ্যাট আদায়ের ক্ষেত্রে ফাঁকফোকরগুলো বন্ধ করা গেলে রাজস্ব আদায় দুই থেকে তিন গুণ বাড়ানো সম্ভব।
আমাদের অর্থনীতি এখনো ভ্যাট ও আমদানি শুল্কের মতো পরোক্ষ করের ওপর বেশি নির্ভরশীল। এই নির্ভরতা কমিয়ে প্রত্যক্ষ করের আওতা বাড়াতে হবে। অন্তত এক কোটি সক্ষম করদাতাকে করের আওতায় আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা উচিত। এতে কর-জিডিপি অনুপাত বাড়বে এবং রাজস্বের ভিত্তি শক্তিশালী হবে।
পাশাপাশি করছাড়ের সুযোগগুলো যৌক্তিকীকরণ করতে হবে। রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রাও হতে হবে বাস্তবসম্মত ও তথ্য-প্রমাণভিত্তিক। শুধু করের আওতা বাড়ালেই হবে না, করদাতাদের আস্থাও ফিরিয়ে আনতে হবে। তাঁদের নিশ্চিত করতে হবে যে করের অর্থ যথাযথভাবে ব্যয় হচ্ছে এবং এর বিনিময়ে স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও অন্যান্য সরকারি সেবার মান উন্নত হচ্ছে। করব্যবস্থায় ন্যায্যতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা গেলে কর দেওয়ার প্রতি মানুষের আগ্রহও বাড়বে।
সম্প্রতি সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন-ভাতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো হয়েছে। এর অর্থায়ন কোথা থেকে আসবে তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে?
মোহাম্মদ আবু ইউসুফ: ২০১৫ সালের জাতীয় বেতনকাঠামোর ১১ বছর পর নতুন পে স্কেল বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এই সময়ে মূল্যস্ফীতি বেড়েছে, ফলে সরকারি চাকরিজীবীদের ক্রয়ক্ষমতা ধরে রাখতে বেতন সমন্বয় জরুরি হয়ে পড়েছে। নতুন পে স্কেল একসঙ্গে বাস্তবায়ন করলে সরকারের ওপর আর্থিক চাপ তৈরি হতো। কয়েক ধাপে এটি বাস্তবায়নের উদ্যোগকে আমি কৌশলী পদক্ষেপ বলে মনে করি। বাজেট বক্তৃতায়ও সরকার এ জন্য অর্থের সংস্থান রেখেছে। পে স্কেলটি সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য অনেক আগেই প্রাপ্য ছিল।
তবে এই ব্যয় মেটাতে সরকারকে ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভর করলে হবে না। বরং রাজস্ব আহরণ বাড়াতে হবে। এ জন্য এনবিআরের ১০ বছর মেয়াদি মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি কৌশল রয়েছে। এনবিআরের বিশেষায়িত কমিটিগুলো কাজ করেছে। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে অর্থনৈতিক খাতে শ্বেতপত্র কমিটির প্রতিবেদনেও রাজস্ব বাড়ানোর উপায় নিয়ে আলাদা অধ্যায় রয়েছে। এসব সুপারিশ বাস্তবায়ন করে বিশেষত প্রত্যক্ষ করের আওতা বাড়াতে পারলে রাজস্ব আহরণ বাড়বে এবং সরকারের আর্থিক সক্ষমতা তৈরি হবে।
এ জন্য করনীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের দায়িত্ব আলাদা করাসহ রাজস্ব খাতের প্রয়োজনীয় সংস্কার দ্রুত করতে হবে। সংস্কারে যত দেরি হবে, সরকারের আর্থিক সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগও তত পিছিয়ে পড়বে।
ভবিষ্যতে বারবার পে কমিশন গঠন না করে প্রতিবছর মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বেতন সমন্বয়ের ব্যবস্থা করা উচিত। বিশেষ করে নতুন যোগদানকারী সরকারি চাকরিজীবীদের প্রবেশকালীন বেতনও মূল্যস্ফীতির ভিত্তিতে সমন্বয় করতে হবে। একটি কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলা গেলে নিয়মিত বেতন সমন্বয় সম্ভব। তাতে একলাফে এতটা বেতন-ভাতা বাড়ানোর দরকার হবে না। অর্থনীতির ওপর একবারে চাপ পড়বে না।
আগের সরকারের সময় অনেক বড় মেগা প্রকল্প নেওয়া হয়েছে, যার অর্থনৈতিক যৌক্তিকতা ও ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন ছিল। এই সরকারের আমলেও উচ্চ ব্যয়ের মেট্রোরেল প্রকল্প কিংবা বোয়িং-এয়ারবাস কেনা হচ্ছে। সরকারের ব্যয়ের অগ্রাধিকারের বৈপরীত্য দেখা যাচ্ছে কি না?
মোহাম্মদ আবু ইউসুফ: ২০৩৪ সালের মধ্যে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে উন্নীত হতে হলে আমাদের অবকাঠামো ও লজিস্টিকস ব্যবস্থার উন্নয়ন করতে হবে। এ জন্য বড় ধরনের বিনিয়োগ প্রয়োজন। তবে বিনিয়োগের পাশাপাশি প্রকল্প নির্বাচন, অর্থায়ন ও প্রকল্প বাস্তবায়নে দক্ষতার পরিচয় দিতে হবে।
বড় প্রকল্প নেওয়ার আগে যথাযথ সম্ভাব্যতা সমীক্ষা করতে হবে। প্রকল্পটি অর্থনৈতিকভাবে কতটা লাভজনক, এর আয় দিয়ে ঋণ পরিশোধ সম্ভব কি না এবং গুণগত মান বজায় রেখে কীভাবে ব্যয় কমানো যায়, তা যাচাই করা জরুরি। পাশাপাশি যোগ্য প্রতিষ্ঠান ও ঠিকাদার নির্বাচন করে সময়মতো প্রকল্প বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। কারণ, বিলম্বে প্রকল্পের ব্যয় ও সুদের চাপ বাড়ে।
আমাদের সরকারি ঋণ ইতিমধ্যে জিডিপির প্রায় ৪০ শতাংশে পৌঁছেছে। বাজেটের প্রায় ১৩ থেকে ১৪ শতাংশ ব্যয় হচ্ছে সুদ পরিশোধে। ভবিষ্যতে ঋণের বোঝা বাড়লে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ গুরুত্বপূর্ণ খাতে ব্যয়ের সুযোগ সংকুচিত হতে পারে। তাই প্রকল্প গ্রহণের সময় দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক ঝুঁকিও বিবেচনায় নিতে হবে।
এ ক্ষেত্রে বৈদেশিক মুদ্রায় ঋণ পরিশোধের ঝুঁকিটা মাথায় রাখতে হবে। পদ্মা সেতু বা এক্সপ্রেসওয়ে থেকে আমরা টোল আদায় করি দেশীয় মুদ্রায়, কিন্তু বিদেশি ঋণ পরিশোধ করতে হয় বিদেশি মুদ্রায়। তাই ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা ধরে রাখতে রপ্তানি আয়, রেমিট্যান্স ও প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। রপ্তানি পণ্যে বৈচিত্র্য এনে আয় ৫০ বিলিয়ন ডলার থেকে ১০০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্য নিতে হবে। একই সঙ্গে দক্ষ জনশক্তি বিদেশে পাঠিয়ে রেমিট্যান্স বাড়ানো এবং উৎপাদন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে বিদেশি বিনিয়োগ কাজে লাগাতে হবে।
এ জন্য ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় কমানো, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি এবং সিঙ্গেল উইন্ডো ব্যবস্থার মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের প্রয়োজনীয় সেবা নিশ্চিত করা জরুরি। অর্থাৎ একদিকে পরিকল্পিত বিনিয়োগের মাধ্যমে অবকাঠামো উন্নয়ন, অন্যদিকে বৈদেশিক মুদ্রা আয় ও ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। বিনিয়োগকারী–ডিপোজিটার ও নাগরিকদের মধ্যে আস্থার জায়গা তৈরি করতে হবে। তাহলেই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি টেকসই হবে।
আপনাকে ধন্যবাদ।
মোহাম্মদ আবু ইউসুফ: আপনাকেও ধন্যবাদ।