বাংলাদেশে দারিদ্র্যের হার আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর সাথে সাথে দরিদ্র মানুষের মোট সংখ্যারও বড় ধরনের incremento লক্ষ্য করা গেছে। গত চার বছরের হিসেবে দেশে নতুন করে দরিদ্র হয়েছেন প্রায় ৮০ লাখ মানুষ। মূলত আকাশচুম্বী মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের প্রকৃত আয় কমে যাওয়া এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ হ্রাস পাওয়ার মতো নানা আর্থ-সামাজিক কারণে দরিদ্র মানুষের এই সংখ্যা বেড়েছে।

অন্যদিকে, দারিদ্র্যসীমার ঠিক ওপরে অবস্থান করছেন প্রায় ৬ কোটি ২০ লাখ মানুষ। প্রাকৃতিক দুর্যোগ কিংবা নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ার মতো যেকোনো অর্থনৈতিক ধাক্কায় এই বিশাল জনগোষ্ঠী মুহূর্তেই দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যেতে পারেন।

বিশ্বব্যাংকের প্রকাশিত 'বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট' প্রতিবেদনে দেশের দারিদ্র্য পরিস্থিতির বিস্তারিত বিশ্লেষণ করে এসব তথ্য জানানো হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের তথ্যানুসারে, টানা চার বছর ধরে দেশে দারিদ্র্যের হার ক্রমাগত বাড়ছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২২ সালে দেশের দারিদ্র্য হার ছিল ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ। তার পরের বছর এই হার বেড়ে দাঁড়ায় ১৮ দশমিক ৯ শতাংশে, যার ফলে নতুন করে দরিদ্র হয়ে পড়েন ৮ লাখ মানুষ। ২০২৪ সালে দারিদ্র্য হার বেড়ে হয় সাড়ে ২০ শতাংশ, এবং ওই বছর নতুন করে দরিদ্র হন মোট ৩৭ লাখ মানুষ। ২০২৫ সালে দারিদ্র্য হার আরও বৃদ্ধি পেয়ে ২১ শতাংশ ছাড়িয়ে যায় এবং নতুন দরিদ্রের সংখ্যা দাঁড়ায় ১৪ লাখে। চলতি বছরে আরও ২১ লাখ মানুষ নতুন করে গরিব হয়েছেন এবং সামগ্রিক দারিদ্র্য হার পৌঁছে গেছে সাড়ে ২২ শতাংশে। এই চার বছরের ব্যবধানে দেশে আয়বৈষম্যও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

বিশ্বব্যাংক সতর্ক করে বলেছে, চলতি অর্থবছর শেষ হলে দারিদ্র্য হার আরও বেড়ে ২২ দশমিক ৯ শতাংশ হতে পারে। সেক্ষেত্রে আরও কয়েক লাখ মানুষ দরিদ্র হয়ে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছেন।

আগামী অর্থবছরে প্রায় ৬ লাখ ৩০ হাজার নিট কর্মসংস্থান তৈরি হতে পারে বলে বিশ্বব্যাংক জানিয়েছে। তবে এই পরিমাণ কর্মসংস্থান দ্রুত দারিদ্র্য বিমোচনের জন্য যথেষ্ট হবে না বলে মনে করা হচ্ছে।

বিশ্বব্যাংকের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, প্রায় ৬ কোটি ২০ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার সামান্য ওপরে বসবাস করছেন। তাঁরা যেকোনো অর্থনৈতিক ধাক্কায় দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যেতে পারেন। বিশেষ করে বন্যাসহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ, কাজের সুযোগ সীমিত হওয়া কিংবা চালসহ নিত্যপণ্যের দাম হঠাৎ বেড়ে যাওয়ার মতো পরিস্থিতিতে অনেকেই দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যান। তখন তাঁদের আয়ের সুযোগ কমে যায় এবং এই বিপুলসংখ্যক মানুষ চরম ঝুঁকির মধ্যে থাকেন।

বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান এই পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, “বাংলাদেশের দারিদ্র্য পরিস্থিতির একটি উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরেছে বিশ্বব্যাংক। উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিশেষ করে খাদ্যপণ্যের দামের চাপ, প্রকৃত মজুরির ক্ষয়, দুর্বল বেসরকারি বিনিয়োগ এবং পর্যাপ্ত উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান না হওয়ায় নিম্ন ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ভেঙে পড়ছে। অধিকাংশ কর্মসংস্থান অনানুষ্ঠানিক হওয়ায় চাকরি হারানো, অসুস্থতা বা নতুন মূল্যবৃদ্ধির মতো একটি ধাক্কাই অনেক পরিবারকে দারিদ্র্যের দিকে ঠেলে দিতে পারে।”

উল্লেখ্য যে, ২০০১ সালে বাংলাদেশের প্রায় অর্ধেক মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করতেন এবং তখন দারিদ্র্যের হার ছিল ৪৮ দশমিক ৯ শতাংশ। পরবর্তী দুই দশকে দারিদ্র্য বিমোচনে বাংলাদেশ বেশ সফল হয়েছিল এবং ২০২২ সালে দারিদ্র্য হার নেমে এসেছিল ১৮ শতাংশে।

গত দুই দশকের সেই ধারাবাহিক পতন ২০২২ সালের পর পাল্টে যেতে শুরু করে। দারিদ্র্য কমার পরিবর্তে উল্টো বাড়তে থাকে, যা বর্তমান আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতিতে প্রবল চাপ সৃষ্টি করছে।

বিবিএসের জনশুমারি অনুযায়ী, ২০২২ সালে দেশের জনসংখ্যা ছিল ১৬ কোটি ৯৮ লাখ এবং পরিবারের সংখ্যা ছিল ৪ কোটি ১০ লাখ। জনসংখ্যার ওই হিসাব বিবেচনায় আনলে দেশে এখন কমপক্ষে পৌনে পাঁচ কোটি মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করছেন। গত তিন বছরে জনসংখ্যাও বেড়েছে। বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা প্রায় সাড়ে ৫ কোটি।

বিবিএস মূলত খাদ্য, বস্ত্র ও বাসস্থানের মতো মৌলিক চাহিদা পূরণের ব্যয়ের ওপর ভিত্তি করে দারিদ্র্য পরিমাপ করে। একজন মানুষের দৈনিক গড়ে ২ হাজার ১২২ ক্যালরি খাদ্যগুণসম্পন্ন খাবার কিনতে এবং খাদ্যবহির্ভূত খরচ মেটাতে যে পরিমাণ অর্থের প্রয়োজন হয়, তা আয় করতে না পারলে ওই ব্যক্তিকে দরিদ্র হিসেবে গণ্য করা হয়। তবে খাবারের দাম এলাকাভেদে ভিন্ন হয়ে থাকে।

সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে কথা বলে সানেমের নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান বলেন, “সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা এখনো মূলত দরিদ্র হয়ে যাওয়ার পর সীমিত সহায়তা দেওয়ার মধ্যে আটকে আছে। কিন্তু ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারকে আগেই সুরক্ষা দেওয়া, সামাজিক বিমা ও আয়-ঝুঁকি মোকাবিলার ব্যবস্থা দুর্বল। ফলে দারিদ্র্যের এই বৃদ্ধি শুধু সাময়িক সংকট নয়, বরং প্রবৃদ্ধির গুণগত দুর্বলতা ও শ্রমবাজারের গভীর সমস্যার প্রকাশ। শুধু জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার নয়, সেই প্রবৃদ্ধি কতটা কর্মসংস্থান সৃষ্টি করছে, প্রকৃত আয় বাড়াচ্ছে এবং ঝুঁকিপূর্ণ মানুষকে সুরক্ষা দিচ্ছে, সেটিই এখন নীতির প্রধান বিবেচনা হওয়া উচিত।”