বিদায়ের মুহূর্তগুলোও কখনো কখনো নির্দিষ্ট সময়সূচি মেনে চলে। মিনিট ধরে ধরে সাজানো হয় প্রতিটি মুহূর্ত। যেন এক নিখুঁত পরিকল্পনা।
সন্ধ্যা সাড়ে পাঁচটায় শুরু হবে কার্যক্রম। এরপর ৫টা ৪০, ৫টা ৫০, ৬টা এবং ৬টা ১০ মিনিট। প্রতিটি সময়ের পাশে একটি করে নাম। এই তালিকাটি দেখলে মনে হয় যেন কোনো রেলস্টেশনের সময়সূচি, যেখানে ট্রেন আসবে এবং যাবে। তবে এখানে একটি ট্রেন চলে গেলে আর কখনোই ফিরবে না।
বুয়েনস আইরেসের স্থানীয় সময় মঙ্গলবার রাত আটটায় (বাংলাদেশ সময় বুধবার ভোর পাঁচটায়) মনুমেন্তাল স্টেডিয়ামে শেষবারের মতো নীল-সাদা জার্সিতে মাঠে নামবেন লিওনেল মেসি। তাঁর প্রতিপক্ষ বেনিন। তবে এই বিদায়ী ম্যাচের মূল আকর্ষণ কেবল মাঠের লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ নয়; বরং ম্যাচের অনেক আগে থেকেই শুরু হয়ে যাবে নানা আয়োজন, যা চলবে খেলা শেষ হওয়ার পরেও।
এই বিশেষ অনুষ্ঠানে ঠিক কী কী থাকছে? আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (এএফএ) আজ তাদের ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টে একটি ফটোকার্ডের মাধ্যমে পুরো সূচি প্রকাশ করেছে। বুয়েনস আইরেসের স্থানীয় সময় অনুযায়ী সাজানো এই তালিকাটিকে তিন ভাগে ভাগ করা হয়েছে— ম্যাচের আগে, বিরতির সময় এবং ম্যাচ শেষে। পুরো আয়োজনের একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য হলো গান এবং আলোর ঝলকানি।
অনুষ্ঠানের শুরুর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে আর্জেন্টিনার জনপ্রিয় মিউজিক্যাল শো ‘উন পোকো দে রুইদো’র শিল্পীদের। বাংলায় ‘উন পোকো দে রুইদো’ মানে ‘একটু শব্দ’। নাম শুনে খুব সাদামাটা মনে হলেও, ২০২২ বিশ্বকাপ ফাইনালে কাতারের লুসাইল স্টেডিয়ামে উপস্থিত থাকা ব্যক্তিরা ভালোই জানেন যে আর্জেন্টিনার গ্যালারির ‘একটু শব্দ’ আসলে কতটা শক্তিশালী হতে পারে।
এরপরের সময়টুকু একে একে ভাগ করে নেবেন আর্জেন্টিনার জনপ্রিয় বেশ কয়েকজন শিল্পী ও ব্যান্ড দল। তালিকায় স্থান পেয়েছেন সেবাস্তিয়ান মেন্দোসা, রোমান এল ওরিহিনাল, আমার আসুল, সান্তি কাইরো, কিউলোকুরা ও দামাস গ্রাতিস। এই তালিকার অধিকাংশ নামই আর্জেন্টিনার ঐতিহ্যবাহী কুম্বিয়া সংগীত ঘরানার সাথে যুক্ত, যে গানগুলো বুয়েনস আইরেসের প্রতিটি পাড়ায় পাড়ায় শোনা যায়।
মেসির বিদায় আসরে খুব বেশি জাঁকজমকপূর্ণ বা ভারী আয়োজন রাখা হয়নি; বরং রাখা হয়েছে পাড়ার উৎসবের মতো এক উষ্ণ পরিবেশ। এরপর আসবে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ, যার জন্য সূচির সবচেয়ে সাধারণ লাইনটি বরাদ্দ করা হয়েছে। রাত আটটায় শুরু হবে ‘হিমনো’। ম্যাচ শুরুর আগে জাতীয় সংগীত গাইবেন ফাবিও সান্তানা, যিনি মালভিনাস যুদ্ধের (ফকল্যান্ড যুদ্ধ) একজন সাবেক সৈনিক। সেই মুহূর্তে ঢাকায় তখন ভোর পাঁচটা। ফুটবলপ্রেমীরা যারা জেগে থাকবেন, তারা জানেন কেন এই মুহূর্তটি এত গুরুত্বপূর্ণ।
ম্যাচের বিরতির সময় গান গাইবেন গাসপার বেনেগাস। তবে মূল আকর্ষণ সাজানো হয়েছে অনুষ্ঠানের শেষ লগ্নে। সূচি অনুযায়ী, রাত ১০টা ৩ মিনিটে আকাশ ভরে উঠবে ড্রোন এবং আতশবাজির আলোয়। ১০টা ১০ মিনিটে মঞ্চে আসবেন আর্জেন্টিনার জনপ্রিয় লোকসংগীতশিল্পী ‘লা সোলে’। এরপর ১০টা ১৫ মিনিটে উপস্থিত হবেন আর্জেন্টিনার জনপ্রিয় কুয়ার্তেতো গায়ক ও গীতিকার উলিসেস বুয়েনো।
এরপরের ঘটনাটি সবচেয়ে রহস্যময়। রাত ১০টা ৩০ মিনিটে তালিকার একেবারে শেষ লাইনে লেখা রয়েছে: ‘সোরপ্রেসা’। বাংলায় যার অর্থ হলো, চমক। সেখানে কোনো নাম নেই, কোনো বিস্তারিত ব্যাখ্যা নেই, কেবল একটি শব্দ।
কিংবদন্তির বিদায় সম্ভবত এমনই হয়। শেষ লাইনটি কেউ লিখে দিতে পারে না; সেটি লিখে দেয় গ্যালারির হাজার হাজার মানুষের আবেগ ও ভালোবাসা।