প্রিয় খেলোয়াড়ের প্রতি ভালোবাসা প্রমাণ করতে মানুষ কত দূর যেতে পারে? বিশেষ করে সেই ফুটবলার যখন সর্বকালের অন্যতম সেরা হিসেবে স্বীকৃত, তখন সেই উন্মাদনা আরও বেড়ে যায়। ফুটবল বিশ্বের কিংবদন্তি লিওনেল মেসির প্রতি সেই অদম্য ভালোবাসারই এক অনন্য উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়েছেন কেরালার বাসিন্দা ইয়াদিল ইকবাল। আর্জেন্টিনার জার্সিতে মেসির শেষ ম্যাচটি দেখার জন্য তিনি পাড়ি দিয়েছেন দীর্ঘ ১৫ হাজার কিলোমিটার পথ।

অনলাইনে টিকিট না পেয়ে বিকল্প পথ খুঁজতে দেরি করেননি ইকবাল। কেরালার কোদুনগালুর গ্রাম থেকে শুরু হয় তাঁর এই দীর্ঘ যাত্রা। লন্ডন ও নিউইয়র্ক হয়ে তিনি পৌঁছান আর্জেন্টিনার বুয়েনস আইরেসে। প্রায় ৪০ ঘণ্টার এই দীর্ঘ ভ্রমণে তাঁর খরচ হয়েছে প্রচুর। ইনস্টাগ্রামে ১৭ লাখ অনুসারীর জন্য পুরো যাত্রার ছবি ও ভিডিও নথিভুক্ত করেন এই কনটেন্ট নির্মাতা। বুয়েনস আইরেসে যাওয়ার সময় তিনি সাথে করে নিয়ে যান নীল-সাদা রঙের একটি ঘড়ি, যা তিনি মেসিকে উপহার দেওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন। দীর্ঘ যাত্রায় বিভিন্ন বিমানবন্দরে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হলেও তাঁর মনে ক্লান্তি বা উৎকণ্ঠার লেশমাত্র ছিল না। ২০২২ বিশ্বকাপের স্মৃতি মনে করে আল-জাজিরাকে ইকবাল বলেন, ‘সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা করেছিলাম মেসি যেন বিশ্বকাপ জেতে। চার বছর আগে সে এটা অর্জন করেছে এবং আমি নিজের চোখেই দেখেছি। এখন কিছুই আর বড় চ্যালেঞ্জ মনে হয় না।’

সাহস আর ধৈর্যের ফল পান ইকবাল। আর্জেন্টিনায় পৌঁছানোর কয়েক ঘণ্টা পরেই রিসেল মার্কেট বা পুনর্বিক্রির বাজার থেকে শেষ মুহূর্তে একটি টিকিট সংগ্রহ করতে সক্ষম হন তিনি। তবে সেই টিকিটের জন্য তাঁকে ব্যয় করতে হয় এক হাজার ডলার। টিকিটের দাম প্রসঙ্গে ইকবাল জানান, এটি ছিল ‘মূল দামের তিন গুণ’।

মেসির প্রতি ইকবালের এই ভালোবাসা কেবল ভ্রমণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। তিনি তাঁর সন্তানের নাম রেখেছেন ‘লিয়ান মেসিল’। কেরালার পাশাপাশি ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের কলকাতা শহরেও মেসির ব্যাপক জনপ্রিয়তা রয়েছে। রোজারিওতে জন্ম নেওয়া মেসি যেন কেরালার মানুষের কাছে হয়ে উঠেছেন একদম আপনজন। ইকবালের ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে তিনি ৩২ মিটার লম্বা এবং ২০ ফুট প্রস্থের একটি বিশাল ম্যুরাল তৈরি করেছেন, যেখানে মেসির বিভিন্ন ট্রফি জয়ের মুহূর্তগুলো ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। এই ম্যুরাল সম্পর্কে ইকবাল বলেন, ‘আর্জেন্টিনা ২০২১ সালের কোপা আমেরিকা জেতার পর আমি বাড়ির কাছে এটি তৈরি করিয়েছিলাম। তবে চলতি বছরের জুনে জন্মদিনে শুভেচ্ছা জানানোর পর ইনস্টাগ্রামে এটি দেখতে পান মেসি। সেটাই ছিল আমার জীবনের সেরা দিন।’

টাইমস অব ইন্ডিয়ার প্রতিবেদন অনুযায়ী, কোদুনগালু থেকে সড়কপথে ১৩ ঘণ্টা ভ্রমণ করে বেঙ্গালুরু যান ইকবাল। সেখান থেকে বিমানে লন্ডন ও নিউইয়র্ক হয়ে বুয়েনস আইরেসে পৌঁছান তিনি। বাংলাদেশ সময় গতকাল ভোরে মনুমেন্তাল স্টেডিয়ামে জাতীয় দলের হয়ে শেষ ম্যাচটি খেলেন মেসি। বেনিনের বিপক্ষে এই প্রীতি ম্যাচে আর্জেন্টিনার ৩-০ গোলের জয়ে একটি গোল করার পাশাপাশি আরও দুটি গোল করান মেসি।

তিনটি রেস্টুরেন্টের মালিক ইকবাল সংবাদমাধ্যমটিকে বলেন, ‘জানি বড় ঝুঁকি নিয়েছি। ভারতে টিকিটের খোঁজ করেছি। প্রতারণার শিকার হতে পারি সেটাও জানতাম। তাই সেরা উপায় ছিল সেখানে গিয়ে টিকিট সংগ্রহ করা। সৌভাগ্যবশত একটি পেয়ে যাই, তবে তিনগুণ বেশি দাম দিতে হয়েছে। এই (মেসি) মানুষটা আমার জীবন পাল্টে দিয়েছে। আমার হৃৎস্পন্দনে শুধু তারই দখল।’

মনুমেন্তাল স্টেডিয়ামের গ্যালারির পঞ্চম সারিতে বসে মেসির শেষ ম্যাচটি উপভোগ করেন ইকবাল। তাঁর ভাষায়, ‘খুব কাছাকাছিই ছিলাম তার। প্রায় ১০ মিটারের দূরত্ব। এটা আমার জীবনের অন্যতম সেরা মুহূর্ত হয়ে থাকবে। হয়তো কিংবদন্তিদের ম্যাচে আমরা মেসিকে আবারও দেখব। কিন্তু (জাতীয় দলে) প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচে তো আর দেখা যাবে না।’

কেরালার ফুটবল সংস্কৃতি মূলত ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার সমর্থক কেন্দ্রিক। মেসি ও আর্জেন্টিনার সমর্থক হওয়ায় ২০২১ সাল পর্যন্ত ব্রাজিল সমর্থকদের অনেক কটাক্ষ সহ্য করতে হয়েছে ইকবালকে। সেই অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে তিনি বলেন, ‘ব্রাজিলের সমর্থকেরা অনেক জ্বালিয়েছে। তারা বলত মেসি অভিশপ্ত। সে কখনোই আর্জেন্টিনার হয়ে ট্রফি জিতবে না। ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো (২০১৬) ইউরো জেতায় পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়। ২০২১ কোপা আমেরিকা ফাইনালের আগে তারা বলেছিল, ব্রাজিলের জার্সি পরে আমার রেস্টুরেন্টে এসে খাবার খাবে। আমি তাদের বলেছি, আর্জেন্টিনার জার্সি পরে এলে বিনা মূল্যে খাবার সরবরাহ করব। আর্জেন্টিনা শেষ পর্যন্ত জিতল এবং ভক্তরাও উদ্‌যাপনের উপলক্ষ পেয়ে যান।’

২০২১ সালের কোপা আমেরিকার পর ফিনালিসিমা, বিশ্বকাপ এবং ২০২৪ সালের কোপা আমেরিকা জয় করেছে আর্জেন্টিনা। এর আগে ২০২২ কাতার বিশ্বকাপের মাধ্যমেই প্রথমবার বিদেশ সফরে গিয়েছিলেন ইকবাল।