লিওনেল মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের বিদায়ী মুহূর্তে এক গভীর আবেগের চাদরে ঢাকা পড়ে পুরো আর্জেন্টিনা। বেনিনের বিপক্ষে ৩-০ গোলের বড় জয়ের পর মনুমেন্তাল স্টেডিয়ামের পরিবেশ হয়ে ওঠে অত্যন্ত আবেগঘন।

ম্যাচ শেষ হওয়ার পর মাঠের মাঝখানে সমর্থকদের উদ্দেশ্যে কথা বলেন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক মেসি। তাঁর বিদায়ী বক্তব্যের সময় নিজেদের আবেগ ধরে রাখতে পারেননি সতীর্থরা। তবে সবার চেয়ে বেশি ভেঙে পড়তে দেখা যায় এনজো ফার্নান্দেজকে। মেসির কথা বলার সময় অঝোরে কাঁদছিলেন আর্জেন্টিনার এই মাঝমাঠের কারিগর। প্রিয় অধিনায়কের বিদায়বেলায় তাঁকে বারবার কাঁদতে দেখা যায়, যার ভিডিও দ্রুতই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এবং বিশ্বজুড়ে ফুটবলপ্রেমীদের হৃদয় স্পর্শ করে।

স্টেডিয়াম ত্যাগ করার সময় আর্জেন্টাইন সংবাদমাধ্যম টিওয়াইসি স্পোর্টসের সঙ্গে কথা বলেন ফার্নান্দেজ। এই ঐতিহাসিক রাতের অনুভূতি জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, ‘সত্যি বলতে, দিনটা খুব আবেগের ছিল। অনেক রকম অনুভূতি একসঙ্গে কাজ করছিল। আশা করি, লিওও রাতটা উপভোগ করেছে। আমরা তাকে খুব মিস করব।’

মেসির প্রতি ফার্নান্দেজের এই গভীর অনুরাগ দীর্ঘদিনের। ২০১৬ সালে মাত্র ১৫ বছর বয়সে মেসিকে জাতীয় দল থেকে অবসর না নেওয়ার অনুরোধ জানিয়ে একটি আবেগঘন চিঠি লিখে আলোচনায় এসেছিলেন তিনি। তখন তাঁর একমাত্র স্বপ্ন ছিল একদিন আর্জেন্টিনার জার্সিতে মেসির পাশে মাঠ ভাগ করে নেওয়া।

বাস্তবে সেই স্বপ্ন তিনি পূরণ করতে পেরেছেন। মেসির সঙ্গে খেলেছেন, একই ড্রেসিংরুম ভাগ করেছেন এবং একসঙ্গে বিশ্বকাপ জয়ের গৌরব অর্জন করেছেন। আর এখন সেই স্বপ্নের নায়ককেই জাতীয় দলের জার্সিতে শেষবারের মতো বিদায় জানাতে হচ্ছে তাঁকে। সম্ভবত এই কারণেই ফার্নান্দেজের আবেগ ছিল অন্য সবার চেয়ে তীব্র।

গত ৩১ আগস্ট মেসি আনুষ্ঠানিকভাবে আর্জেন্টিনা জাতীয় দল থেকে অবসরের ঘোষণা দেন। সেই সময়েও মেসিকে উদ্দেশ্য করে চিঠি লিখেছিলেন ফার্নান্দেজ। সেই চিঠিতে তিনি লিখেছিলেন, ‘লিও, ২০১৬ সালে তুমি যখন বলেছিলে যে জাতীয় দল ছেড়ে যাচ্ছ, আমি খুব কষ্ট পেয়েছিলাম। আমি তখন একটা বাচ্চা ছিলাম। তোমার বয়স আর আমার বয়স হিসাব করতাম, ভাবতাম কোনো একদিন তোমার সঙ্গে খেলতে পারব কি না। ব্যাপারটা পাগলামির মতো শোনায়, কিন্তু আমি সত্যিই হিসাব করতাম। ভাবতাম, তোমার আর কত বছর খেলা বাকি থাকতে পারে, আর আমার কত বছর লাগবে প্রথম বিভাগে পৌঁছাতে। স্বপ্ন দেখতাম, অন্তত একবার হলেও আর্জেন্টিনার জার্সিতে আমরা একসঙ্গে খেলতে পারব। ভাগ্য ভালো, তুমি ফিরে এসেছিলে।’

ফার্নান্দেজ আরও লিখেছেন, ‘আমি শুধু তোমার সঙ্গে খেলতেই পারিনি। আমরা একসঙ্গে ক্যাম্প করেছি, ড্রেসিংরুম ভাগ করেছি, কথা বলেছি, আলিঙ্গন করেছি, কঠিন সময় পার করেছি, অসাধারণ মুহূর্ত উপভোগ করেছি এবং শেষ পর্যন্ত একসঙ্গে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হয়েছি। কিন্তু সবচেয়ে বেশি, আমি সব সময় তোমার প্রতি কৃতজ্ঞ থাকব—আমি দলে আসার পর থেকে তুমি যেভাবে আমার সঙ্গে ছিলে, তার জন্য।’

চিঠির শেষাংশে ফার্নান্দেজের ভাষায়, ‘আজ আমি তোমাকে ছাড়া পরের ক্যাম্পটা কল্পনাই করতে পারছি না। মাঠে গিয়ে সামনে তাকিয়ে তোমাকে না দেখা, ১০ নম্বর জার্সিতে তোমাকে না দেখা—এটা ভাবাই অসম্ভব। এত বছর ধরে তোমাকে সেখানে দেখে এসেছি যে অন্য কিছু কল্পনা করাই কঠিন। আমরা তোমাকে খুব মিস করব, অধিনায়ক।’

এনজো ফার্নান্দেজের এই অশ্রুসিক্ত বিদায় জানানোর দৃশ্যটি প্রমাণ করে, তিনি এখনই তাঁর প্রিয় অধিনায়ক মেসিকে মিস করা শুরু করে দিয়েছেন।