চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) ছয়টি বিভাগে চলমান পরীক্ষা বর্তমানে সম্পূর্ণ বন্ধ। শ্রেণিকক্ষে পাঠদানও স্থগিত। টানা ১৩ দিনের শাটডাউনের ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের সামগ্রিক শিক্ষাপঞ্জি মারাত্মকভাবে পিছিয়ে যাচ্ছে। তবে সদ্য সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে পুনরায় পদে বসানোর দাবি থেকে সরতে রাজি নন শিক্ষার্থীরা।
এই সংকট নিরসনে সরকারের বিভিন্ন স্তরে যোগাযোগ করছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা। তাঁরা উপাচার্যকে ফিরিয়ে আনার পক্ষে জোরালো যুক্তি উপস্থাপন করেছেন। তা সত্ত্বেও এখন পর্যন্ত সমাধানের লক্ষ্যে কোনো কার্যকর আলোচনার উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
শিক্ষার্থীদের এই শাটডাউনের পাশাপাশি গতকাল রোববার বেলা ১১টা থেকে ১টা পর্যন্ত উপাচার্য ভবনের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা। তাঁদের দাবি ছিল একই। এর আগে গত শনিবার ছুটির দিনেও বিক্ষোভ মিছিল করেছেন শিক্ষার্থীরা। তাঁরা এই বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। তবে ২২ সেপ্টেম্বর শুরু হওয়া এই শাটডাউনের ত্রয়োদশ দিনেও শিক্ষা কার্যক্রমে ফেরার কোনো নির্দিষ্ট সময় নির্ধারিত হয়নি। ফলে নতুন উপাচার্য অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলম এখনো ক্যাম্পাসে প্রবেশ করতে পারেননি।
১৯৬৮ সালে একটি প্রকৌশল কলেজ হিসেবে চুয়েটের যাত্রা শুরু হয়। পরবর্তীতে প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি বা বিআইটি-তে রূপান্তরিত হয়। অবশেষে ২০০৩ সালের ১ সেপ্টেম্বর এটি পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে কার্যক্রম শুরু করে। বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৮টি বিভাগে ৬ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছেন। উপাচার্য নিয়োগ নিয়ে সৃষ্ট এই বিরোধের সরাসরি প্রভাব এখন তাঁদের পড়াশোনা ও পরীক্ষার সূচির ওপর পড়ছে।
বিষয়টি জানতে চাওয়া হলে শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক মোহাম্মদ আহসান উল্লাহ মুক্তকণ্ঠ কে বলেন, অতীতেও সংকটের পর বাড়তি ক্লাস নিয়ে শিক্ষার্থীদের ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়া হয়েছে। ১৯৯৬ ও ১৯৯৭ সালের দুটি ব্যাচের শিক্ষা কার্যক্রম একসঙ্গে চালানো হয়েছিল। করোনার সময়ও শুক্র–শনিবার ক্লাস নেওয়া হয়েছে।
অধ্যাপক আহসান উল্লাহ আরও বলেন, ‘আমাদের আশা ছিল, ২০২১–২২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীরা এ বছরই পাস করে বের হবেন। কিন্তু চলমান সংকটের কারণে তাঁদের পাস করতে আগামী বছরের মার্চ–এপ্রিল পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। শিক্ষার্থীদের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে আমরা সচেষ্ট আছি।’
এদিকে বাড়ছে শিক্ষার্থীদের উদ্বেগ। পুরকৌশল বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী নাফিস হাসান গতকাল মুক্তকণ্ঠ কে বলেন, ক্লাস–পরীক্ষা বন্ধ থাকায় প্রতিদিন তাঁদের পড়াশোনার ক্ষতি হচ্ছে। সামনে শিক্ষাবর্ষ পিছিয়ে যাওয়ার আশঙ্কাও আছে। তবু শুধু শিক্ষা কার্যক্রম চালু করার জন্য উপাচার্য পুনর্বহালের দাবি পাশ কাটিয়ে যাওয়া তাঁদের পক্ষে সম্ভব নয়। তাঁরা দ্রুত এ সমস্যার সমাধান চান।
পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক মঈনুল ইসলাম মুক্তকণ্ঠ কে বলেন, ছয়টি বিভাগের পরীক্ষা স্থগিত রয়েছে। তবে শিক্ষাপঞ্জির এই বিপর্যয় কাটিয়ে ওঠা সম্ভব। প্রতিটি ব্যাচের চূড়ান্ত পরীক্ষার পর কিছুদিন ছুটি থাকে। ওই ছুটির সময়ে শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে পিছিয়ে পড়া কাজ পুষিয়ে নেওয়া যাবে।
তিনি আরও বলেন, অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে উপাচার্য পদে পুনর্বহালের দাবির কথা বলা হয়েছে। বিভিন্ন যুক্তিও তুলে ধরা হয়েছে। আশা করি, সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নেবে।
আকস্মিক এই পরিবর্তনের নেপথ্যে কী ছিল? গত ২৭ জুলাই চুয়েটের উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পান যন্ত্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েম। পরদিন তিনি দায়িত্ব গ্রহণ করেন। দায়িত্ব পালনের মাত্র ৫৬ দিনের মাথায় ২১ সেপ্টেম্বর তাঁকে অব্যাহতি দেওয়া হয় এবং খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলমকে নতুন উপাচার্য নিয়োগ দেওয়া হয়।
ওই রাতেই শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ মিছিল করে উপাচার্য ভবনে তালা ঝুলিয়ে দেন। পরদিন প্রধান ফটক আটকে শুরু হয় সর্বাত্মক শাটডাউন। পরবর্তীতে শিক্ষক সমিতিও অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে পুনর্বহালের দাবি জানায়। একই দাবিতে কর্মবিরতিতে যান শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা।
শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলে ক্ষোভের কিছু কারণ সামনে এসেছে। তাঁদের মতে, অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েম শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ রাখতেন। বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে তাঁর সুসম্পর্কের কারণে শিক্ষার্থীরা উচ্চশিক্ষা ও চাকরির সুযোগ পেয়েছেন। উপাচার্য হওয়ার পরও তিনি তাঁদের সমস্যা শুনেছেন এবং বেশ কিছু উদ্যোগ নিয়েছেন। তাই তাঁকে কাজ করার আরও সময় দেওয়া উচিত ছিল বলে মনে করেন তাঁরা।
শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক মো. আবুল হাসান মুক্তকণ্ঠ কে বলেন, অল্প সময় কাজের সুযোগ দিয়ে হঠাৎ অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে সরানো তাঁদের কাছে অপমানজনক মনে হয়েছে। তাঁর কার্যক্রম ভালো ছিল বলে তাঁরা পুনর্বহালের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।
অনেকেই মনে করছেন, উপাচার্য পরিবর্তনের পেছনে রাজনৈতিক প্রভাব ছিল। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন জানান, একজন প্রতিমন্ত্রী তাঁর পছন্দের কাউকে চুয়েটের উপাচার্য করতে চেয়েছিলেন বলে তাঁরা শুনেছেন। শুরুতে তা সম্ভব হয়নি। ছাত্রদলের নেতাদের সঙ্গেও অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমের দূরত্ব তৈরি হয়েছিল বলে তাঁদের ভাষ্য। তবে এসবের সঙ্গে উপাচার্য পরিবর্তনের সিদ্ধান্তের কোনো নিশ্চিত যোগসূত্র পাওয়া যায়নি।
চলমান আন্দোলনে তাঁর কোনো ইন্ধন নেই বলে জানিয়েছেন অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েম। মুক্তকণ্ঠ কে তিনি বলেন, শিক্ষক, কর্মকর্তা বা কর্মচারী কাউকেই আন্দোলন বা কর্মসূচিতে যুক্ত হতে বলেননি। তিনি শিক্ষকতা উপভোগ করেন এবং তরুণ প্রজন্মকে সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার কাজ করে যেতে চান।
তবে শিক্ষকদের একটি অংশ এই আন্দোলন ও শিক্ষক সমিতির কর্মসূচিতে অংশ নিচ্ছেন না। তাঁদের একজন, যন্ত্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক আরাফাত রানা মুক্তকণ্ঠ কে বলেন, ‘সরকার উপাচার্য হিসেবে যাঁকে নিয়োগ দেবে, আমি তাঁর পক্ষে। সরকারের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কোনো আন্দোলন সমর্থন করি না। শিক্ষক সমিতির সিদ্ধান্তও যদি সরকারি সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে যায়, আমি তার সঙ্গে একমত নই।’
চুয়েটের ইতিহাসে এই বিরোধ নজিরবিহীন। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যদের তালিকা অনুযায়ী, এ পর্যন্ত ৯ জন শিক্ষক এই দায়িত্ব পেয়েছেন। তাঁদের মধ্যে দুজন নিয়োগের সময় অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত ছিলেন। অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলম হলেন দ্বিতীয়জন। প্রথমজন ছিলেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক মীর শহিদুল ইসলাম। বিআইটি থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরের পর তৎকালীন পরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক প্রথম উপাচার্যের দায়িত্ব পালন করেন। এরপর ২০০৪ সালের ২৫ জুলাই দায়িত্ব নেন অধ্যাপক মীর শহিদুল ইসলাম।
অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলম চুয়েটের প্রাক্তন শিক্ষার্থী হলেও নিয়োগের সময় তিনি কুয়েটের শিক্ষক ছিলেন। বাইরে থেকে নিয়োগের বিষয়টিও ক্ষোভের একটি কারণ বলে জানিয়েছেন আন্দোলনকারী শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা। তবে অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষককে উপাচার্য নিয়োগে কোনো আইনি বাধা নেই।
আন্দোলন চলাকালীন ২৪ সেপ্টেম্বর ক্যাম্পাসে না এসেই উপাচার্যের দায়িত্ব গ্রহণ করেন অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলম। এরপরই আন্দোলনকারীরা তাঁকে প্রত্যাখ্যানের ঘোষণা দেন। শিক্ষকদের মতে, চুয়েটে নিয়োগের পর কোনো উপাচার্য ক্যাম্পাসে প্রবেশ করতে পারেননি কিংবা বিদায়ী উপাচার্যকে ফেরাতে শিক্ষক–শিক্ষার্থীরা একসঙ্গে আন্দোলনে নেমেছেন—এমন ঘটনার কথা তাঁরা আগে শোনেননি।
নতুন উপাচার্য অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলম মুক্তকণ্ঠ কে বলেন, অচলাবস্থা নিরসনে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে তাঁর নিয়মিত যোগাযোগ রয়েছে। শিক্ষক সমিতি, জ্যেষ্ঠ শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের নিয়ে সমাধানের চেষ্টা করছেন। তিনি জানান, অনলাইনে প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। বেতন-ভাতা ছাড়ের চেষ্টা এবং পড়াশোনার ক্ষতি পুষিয়ে নিতে ডিন ও বিভাগীয় প্রধানদের সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক আলোচনা চলছে। মন্ত্রণালয় পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে এবং আলোচনার মাধ্যমে দ্রুত শিক্ষা কার্যক্রম স্বাভাবিক করার পরামর্শ দিয়েছে।
সংকট নিরসনে শিক্ষকদের সঙ্গে সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে যোগাযোগ হলেও আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কোনো আনুষ্ঠানিক বৈঠক হয়নি। একাধিক শিক্ষক জানান, বিভাগীয় কমিশনার ও প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীনের পক্ষ থেকে আলোচনার আহ্বান এসেছিল, তবে তাঁরা তাতে সাড়া দেননি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন শিক্ষক বলেন, শিক্ষার্থীদের আন্দোলন স্থগিত করার শর্তে শিক্ষা মন্ত্রণালয় শিক্ষকদের সঙ্গে আলোচনায় বসতে সম্মত হয়েছিল। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের দাবি একই হলেও শিক্ষার্থীরা আলাদাভাবে আন্দোলন করছেন। তাই তাঁদের আন্দোলন স্থগিতের শর্ত মেনে বৈঠকে যাওয়ার সুযোগ নেই বলে মনে করেন তিনি। তাঁর মতে, আলোচনায় সমাধান এলে আন্দোলন থেমে যাবে।
শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক আবুল হাসান বলেন, ‘আমরা সরকারের উচ্চপর্যায়ে যোগাযোগ করেছি। অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে উপাচার্য পদে পুনর্বহালের দাবির কথা বলা হয়েছে। বিভিন্ন যুক্তিও তুলে ধরা হয়েছে। আশা করি, সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নেবে।’
সার্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একটি উচ্চপর্যায়ের সূত্র মুক্তকণ্ঠ কে জানিয়েছে, এ বিষয়ে মন্ত্রণালয় পর্যায়ে এখনো দৃশ্যমান নতুন কোনো উদ্যোগ বা পদক্ষেপ নেই। পরিস্থিতি আগের মতোই রয়েছে।