দীর্ঘ ৩৩ দিনের ক্লাস বর্জন ও শাটডাউন কর্মসূচি প্রত্যাহার করে অবশেষে ক্লাসে ফেরার ঘোষণা দিয়েছেন চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা। তবে এই প্রত্যাবর্তনের পাশাপাশি তারা পূর্বের উপাচার্যকে পুনর্বহাল এবং নতুন উপাচার্যের নিয়োগ বাতিলের দাবিতে আন্দোলন অব্যাহত রাখার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, আজ রোববার বেলা ১১টার দিকে একটি খোলা চিঠির মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা প্রথমে ক্লাসে ফেরার সিদ্ধান্তের কথা জানান। শিক্ষার্থীদের এই পদক্ষেপের পর দুপুর ১২টার দিকে শিক্ষক সমিতির একটি সাধারণ সভা অনুষ্ঠিত হয়। বেলা দুইটায় ওই সভা শেষ হলে শিক্ষকরাও শিক্ষার্থীদের সাথে একমত হয়ে ক্লাসে ফেরার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন।

শিক্ষার্থীদের পাঠানো খোলা চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, দীর্ঘদিনের আন্দোলন এবং ক্যাম্পাসের অচলাবস্থার কারণে তাঁদের শিক্ষাজীবন ক্রমাগত পিছিয়ে যাচ্ছে। তাঁরা আর নিজেদের শিক্ষা ও ভবিষ্যৎকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে ইচ্ছুক নন, তাই একাডেমিক কার্যক্রম স্বাভাবিক করতে ক্লাসে ফিরছেন। তবে চিঠিতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, ক্লাসে ফেরার অর্থ এই নয় যে তাঁরা আন্দোলন থেকে সরে এসেছেন। শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারী ও শিক্ষার্থীদের এই সম্মিলিত আন্দোলনের এক দফা দাবি অবশ্যই মানতে হবে। তাঁদের দাবি, অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে পুনরায় উপাচার্য পদে পুনর্বহাল করতে হবে এবং এই দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে।

চিঠিতে আরও সতর্ক করা হয়েছে যে, নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত উপাচার্য অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলম যদি ক্যাম্পাসে প্রবেশ করেন, তবে আবারও কঠোর আন্দোলন গড়ে তোলা হবে। নিজেদের যৌক্তিক দাবি আদায়ে শিক্ষার্থীরা ঐক্যবদ্ধ থাকার অঙ্গীকার করেছেন।

শাটডাউন প্রত্যাহারের বিষয়ে যন্ত্রকৌশল বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী যুলক্বার নাইন মিহাদ মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘দীর্ঘদিন ক্লাস-পরীক্ষা বন্ধ থাকায় আমাদের শিক্ষাজীবন ও ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। আমরা চাই, দ্রুত স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম ফিরে আসুক। আমরা সংঘাত নয়, সংকটের সম্মানজনক সমাধান চাই। আশা করি, আমাদের শিক্ষাজীবন সচল রাখার পাশাপাশি দাবির বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হবে।’

অন্যদিকে, শিক্ষক সমিতির যুগ্ম সম্পাদক সামিউন বাসির মুক্তকণ্ঠকে জানান, ‘আমাদের সাধারণ সভায় শিক্ষার্থীদের ক্লাসে ফেরার আহ্বান জানানোর ব্যাপারে সিদ্ধান্ত হয়েছে। শিক্ষার্থীরাও ক্লাসে ফিরতে চান বলে তাঁরা জানিয়েছেন। আর বাকি সিদ্ধান্তগুলো বিবৃতি দিয়ে জানানো হবে। ক্লাস শুরু কবে হবে এটা স্ব স্ব বিভাগে ঠিক করবে।’

উল্লেখ্য যে, গত ২১ সেপ্টেম্বর চুয়েটের উপাচার্য অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে সরিয়ে কুয়েটের অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলমকে নতুন উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে ২২ সেপ্টেম্বর থেকে শিক্ষার্থীরা সর্বাত্মক শাটডাউন কর্মসূচি শুরু করেন। একই দাবিতে শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরাও কর্মবিরতি ও অসহযোগ কর্মসূচি পালন করেন। এর ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস-পরীক্ষাসহ অধিকাংশ একাডেমিক কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়ে এবং সাতটি বিভাগের মোট ৩৪টি পরীক্ষা স্থগিত হয়ে যায়।

আন্দোলনের মধ্যেই গত ১২ অক্টোবর সকাল ৯টার দিকে ক্যাম্পাসে প্রবেশ করেন উপাচার্য অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলম। ছাত্রদল নেতাদের সহায়তায় তিনি উপাচার্য ভবনের তালা ভেঙে নিজ দপ্তরে প্রবেশ করেন। খবর পেয়ে সকাল সাড়ে নয়টার দিকেই আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা উপাচার্য ভবনের সামনে অবস্থান নেন এবং দুপুর ১২টার মধ্যে তাঁকে কার্যালয় ত্যাগ করার আলটিমেটাম দেন। নির্ধারিত সময় পার হলে শিক্ষার্থীরা ভবনের ফটকে তালা ঝুলিয়ে দেন এবং বিদ্যুৎ-সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।

এই ঘটনায় উপাচার্যসহ মোট ১১ জন ভবনের ভেতরে আটকা পড়েন। পরদিন উপাচার্য অসুস্থ বোধ করায় দুই চিকিৎসক তাঁকে পরীক্ষা করতে যান। প্রায় ৩০ ঘণ্টা অবরুদ্ধ থাকার পর তাঁদের উদ্ধার করা হয় এবং অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলমকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। গত বৃহস্পতিবার তিনি হাসপাতাল থেকে মুক্তি পান এবং শুক্রবার নগরের সার্কিট হাউসে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সভা আহ্বান করেন।