চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) উপাচার্য অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলম জানিয়েছেন যে, তিনি পদত্যাগ করেননি এবং সুস্থ হয়ে পুনরায় বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্বভার গ্রহণ করবেন। বিভিন্ন গণমাধ্যমে তাঁর পদত্যাগের যে খবর প্রচার করা হচ্ছে, তা সম্পূর্ণ অসত্য বলে তিনি দাবি করেছেন। এছাড়া ক্যাম্পাসে আর না ফেরার শর্তে শিক্ষার্থীরা তাঁকে বের হতে দিয়েছেন—এই তথ্যের কথা বলে তিনি একে মিথ্যা বলে অভিহিত করেছেন।

আজ বুধবার দুপুরে হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে পাঠানো এক বার্তায় মুক্তকণ্ঠকে এই কথাগুলো জানান উপাচার্য। জানা গেছে, শিক্ষার্থীদের তীব্র আন্দোলনের মুখে প্রায় ৩০ ঘণ্টা ধরে নিজ কার্যালয়ে অবরুদ্ধ থাকার পর গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টার দিকে চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপার তাঁকে উদ্ধার করে নিয়ে যান। বর্তমানে তিনি চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন বলে তিনি জানিয়েছেন।

ঘটনার সূত্রপাত হয় গত সোমবার সকালে, যখন ছাত্রদল নেতাদের সঙ্গে নিয়ে তালা ভেঙে নিজের দপ্তরে প্রবেশ করেন উপাচার্য শরীফুল আলম। এর কিছুক্ষণ পর দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে শিক্ষার্থীরা তাঁকে ভেতরে রেখে ভবনের ফটকে পুনরায় তালাবদ্ধ করে দেন। সেই সঙ্গে পানি ও বিদ্যুতের সংযোগও বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়।

উল্লেখ্য, গত ২১ সেপ্টেম্বর অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে সরিয়ে অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলমকে চুয়েটের উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। এই সিদ্ধান্তের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে ২২ সেপ্টেম্বর থেকে শিক্ষার্থীরা ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি পালন করছেন। একই দাবিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরাও কর্মবিরতি পালন করছেন, যার ফলে ক্লাস ও পরীক্ষা সহ অধিকাংশ একাডেমিক কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়েছে।

আন্দোলনের মধ্যেই সোমবার সকালে ছাত্রদল নেতাদের সহায়তায় তালা ভেঙে দপ্তরে প্রবেশ করেন উপাচার্য। তবে দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে শিক্ষার্থীরা পুনরায় তাঁকে ভেতরে আটকে দিয়ে ফটকে তালা দেন এবং বিদ্যুৎ ও পানির সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেন।

এই পরিস্থিতি নিয়ে উপাচার্য শেখ শরীফুল আলম বলেন, ‘বিভিন্ন গণমাধ্যমে মিথ্যা সংবাদ প্রচার করা হচ্ছে যে আমি পদত্যাগ করেছি এবং ভবিষ্যতে কখনো চুয়েট ক্যাম্পাসে পদার্পণ করব না। এ ধরনের কোনো বক্তব্য বা বিবৃতি আমি দিইনি। কারণ, আপনারা জেনে থাকবেন, যখন আমাকে নিয়ে আসা হচ্ছিল, তখন আসলে আমি কথা বলার মতো অবস্থাতেই ছিলাম না। অসুস্থতার কারণেই আমি ক্যাম্পাস ছেড়েছিলাম। এখনো আমি অসুস্থ এবং চিকিৎসকদের নিবিড় পর্যবেক্ষণে আছি। সুস্থ হয়ে আমি আবারও বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্ব পালন করব, ইনশা আল্লাহ।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমি পুনর্ব্যক্ত করতে চাই, রাষ্ট্র আমাকে যে দায়িত্ব দিয়েছে, আমি সেই অর্পিত দায়িত্ব পালন করতেই চট্টগ্রামে এসেছি। কোনো ব্যক্তিগত স্বার্থ, বিশেষ কোনো এজেন্ডা বাস্তবায়ন কিংবা দলীয় বা স্বার্থসংশ্লিষ্ট কোনো উদ্দেশ্য নিয়ে আমি এখানে আসিনি। বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্ব পালন এবং প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রম সচল রাখার বিষয়টি আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ।’

শিক্ষার্থীদের অমূল্য শিক্ষাজীবন ও একাডেমিক কার্যক্রম যেন কোনো স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর প্ররোচনা বা ব্যবহারের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেই ইচ্ছা প্রকাশ করেন শেখ শরীফুল আলম। সেই সঙ্গে তিনি শিক্ষার্থীদের দ্রুত শ্রেণিকক্ষে ফেরার আহ্বান জানান।

অন্যদিকে, চুয়েটের শিক্ষকদের কর্মবিরতি ও ‘সর্বাত্মক অসহযোগ’ কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে বলে শিক্ষক সমিতির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। আজ দুপুর ১২টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মিলনায়তনে শিক্ষক সমিতির একটি সাধারণ সভা অনুষ্ঠিত হয়।

সভা শেষে চুয়েট শিক্ষক সমিতির যুগ্ম সম্পাদক সামিউন বাসির বলেন, ‘তালা ভেঙে উপাচার্য ভবনে প্রবেশের ঘটনায় আমরা উদ্বিগ্ন। ভবনের ভেতরে গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র রয়েছে। সেগুলো চুরি হয়েছে কি না এবং কী পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। অধ্যাপক সায়েমকে উপাচার্য পদে পুনর্বহালের দাবিতে আমরা অটল রয়েছি। আমরা কর্মবিরতি ও অসহযোগ চালিয়ে যাব।’

শিক্ষার্থীরাও জানিয়েছেন, অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে উপাচার্য পদে পুনর্বহালের দাবিতে তাঁদের ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি চলবে। আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের একজন এবং তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক কৌশল বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী মো. জাহাঙ্গীর আলম মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা অধ্যাপক সায়েম স্যারকে উপাচার্য পদে পুনর্বহালের দাবিতে আন্দোলন করে আসছি। এই আন্দোলন চালিয়ে যাব। আর সায়েম স্যারকে পুনর্বহালের দাবিতে শাটডাউন কর্মসূচি চলমান থাকবে।’

গত ২৩ দিন ধরে চুয়েট ক্যাম্পাসে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের এই আন্দোলন চলছে। এর ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের সব ধরনের একাডেমিক কার্যক্রম বন্ধ হয়ে আছে। তবে শারদীয় দুর্গাপূজার ছুটির কারণে অনেক শিক্ষার্থী ক্যাম্পাস ছাড়তে শুরু করেছেন। আজ সকালে দেখা গেছে, বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী ব্যাগ নিয়ে বাড়ির পথে রওনা দিচ্ছেন।