সদ্য বিদায়ী উপাচার্যকে পুনর্বহালের দাবিতে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের তীব্র আন্দোলনের মুখে ১৫ দিন ধরে অচলাবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (চুয়েট)। এই উত্তাল পরিস্থিতির কারণে নতুন উপাচার্য এখনো ক্যাম্পাসে প্রবেশ করতে পারেননি। তবে ক্যাম্পাসে উপস্থিত হতে না পারলেও সংশ্লিষ্ট ব্যাংকে ই-মেইল পাঠিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বেতন-ভাতা আটকে দিয়েছেন তিনি।
গত ২৯ সেপ্টেম্বর সোনালী ব্যাংকের চুয়েট শাখার ব্যবস্থাপক জয়ন্ত ভৌমিককে একটি ই-মেইল প্রেরণ করেন নতুন উপাচার্য অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলম। ওই ই-মেইলে তিনি শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বেতন বন্ধ রাখার নির্দেশনা দেন। বেতন-ভাতা আটকে যাওয়ায় চরম ভোগান্তির মুখে পড়েছেন চুয়েটের কর্মরত শিক্ষক ও কর্মচারীরা। বিশেষ করে আসন্ন শারদীয় দুর্গোৎসবের আগে এই সিদ্ধান্ত হিন্দুধর্মাবলম্বী শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য বড় ধরনের সংকট তৈরি করেছে।
ঘটনার সূত্রপাত ২১ সেপ্টেম্বর, যখন অধ্যাপক ড. আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে সরিয়ে চুয়েটের উপাচার্য হিসেবে খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলমকে নিয়োগ দেওয়া হয়। এই নিয়োগের পর অধ্যাপক আবু সাদাতকে পুনর্বহালের দাবিতে ২২ সেপ্টেম্বর থেকে শিক্ষার্থীরা ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি শুরু করেন। পরবর্তীতে একই দাবিতে শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরাও কর্মবিরতিতে যান। এই আন্দোলনের মুখে ক্যাম্পাসে না গিয়েই ২৪ সেপ্টেম্বর যোগদান করেন নতুন উপাচার্য অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলম। তিনি জানান, রাষ্ট্রপতি ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব বরাবর যোগদানপত্র পাঠিয়ে তিনি দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ২৯ সেপ্টেম্বর উপাচার্যের ই-মেইল পাওয়ার পর ৫ অক্টোবর সোনালী ব্যাংক চুয়েট শাখার ব্যবস্থাপক জয়ন্ত ভৌমিক একটি ফিরতি ই-মেইল পাঠান। সেখানে তিনি উল্লেখ করেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পট্রোলার ও উপ-কম্পট্রোলারের স্বাক্ষরসহ শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বেতন বিল তিনি পেয়েছেন। এর জবাবে উপাচার্য পুনরায় ই-মেইল করে জানান, উপাচার্যের পূর্বানুমোদন ছাড়া ব্যাংকে বেতনের বিল পাঠানো ‘অননুমোদিত ও বেআইনি’।
উপাচার্য তাঁর ই-মেইলে আরও উল্লেখ করেন, চুয়েট আইন ২০০৩-এর ধারা ১৩(৭) অনুযায়ী উপাচার্যের সুস্পষ্ট অনুমোদন ছাড়া যেকোনো আর্থিক লেনদেন আইনত অবৈধ। এই অননুমোদিত লেনদেনের ফলে কোনো আর্থিক অনিয়ম, অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি বা আইনি জটিলতা সৃষ্টি হলে এর জন্য উপাচার্য বা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ কোনো আইনগত, প্রশাসনিক বা আর্থিক দায়ভার বহন করবে না। অনুমোদনবিহীন এসব নথি প্রস্তুত ও প্রেরণের মাধ্যমে যে লঙ্ঘন ঘটেছে, তার একক ও সম্পূর্ণ দায়ভার সংশ্লিষ্ট ওই দুই কর্মকর্তার ওপরই বর্তাবে। পাশাপাশি এর জন্য সোনালী ব্যাংক কর্তৃপক্ষও দায়ী থাকবে।
সোনালী ব্যাংক চুয়েট শাখার ব্যবস্থাপক জয়ন্ত ভৌমিক ই-মেইলের সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, ‘উপাচার্যের ই-মেইলের পর বেতন বন্ধ রাখা হয়েছে। উনি বাংলাদেশ ব্যাংক, সোনালী ব্যাংকের মহাব্যবস্থাপক-উপমহাব্যবস্থাপক সবাইকে জানিয়ে মেইল করেছেন। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানানো হয়েছে, সেখান থেকে সমাধান আসবে।’
এই বিষয়ে মুক্তকণ্ঠকে অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলম বলেন, 'আমি কম্পট্রোলারসহ সংশ্লিষ্টদের সভার জন্য ডেকেছিলাম। কিন্তু তাঁরা কেউ আসেননি। পরে আমি ব্যাংকের ব্যবস্থাপককে মেইল দিয়েছি। সেখানে বলা হয়েছে, এই লেনদেনের ফলে কোনো আর্থিক অনিয়ম, অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি বা আইনি জটিলতা সৃষ্টি হলে এর জন্য উপাচার্য বা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ কোনো আইনগত, প্রশাসনিক বা আর্থিক দায়ভার বহন করবে না। এই মেইল দেখেই ব্যাংক কর্তৃপক্ষ বেতন স্থগিত রেখেছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমি কম্পট্রোলারসহ সংশ্লিষ্টদের সভার জন্য ডেকেছিলাম। কিন্তু তাঁরা কেউ আসেননি। পরে আমি মেইল দিয়েছি ব্যাংকের ব্যবস্থাপককে।’
তবে চুয়েটে এত দিন যেভাবে বেতন উত্তোলন করা হয়েছে, সেটিকে আইনত অবৈধ বলে দাবি করেছেন উপাচার্য। তিনি মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘এত দিন যেভাবে বেতন নিয়ে আসা হচ্ছিল, তা আইনত বৈধ নয়। নিয়ম অনুসারে উপাচার্যের অনুমতি নিতে হয়। কিন্তু এত দিন এই নিয়ম মানা হয়নি।’
অন্যদিকে, চুয়েট কর্মকর্তা সমিতির সভাপতি প্রকৌশলী সৈয়দ মোহাম্মদ ইকরাম মুক্তকণ্ঠকে জানান, ‘প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী বেতন-বোনাস পরিশোধে উপাচার্যের স্বাক্ষরের প্রয়োজন হয় না। যদি কারও বেতন বৃদ্ধি বা পদোন্নতি হয়, তখন উপাচার্যের স্বাক্ষরের প্রয়োজন হতে পারে। এত দিন এভাবেই বেতন-ভাতা পরিশোধ হয়ে আসছিল।’
বেতন-ভাতা আটকে যাওয়া প্রসঙ্গে চুয়েট শিক্ষক সমিতির যুগ্ম সম্পাদক সামিউন বাসির মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘চুয়েটের চিরাচরিত নিয়মানুসারে কম্পট্রোলারের মাধ্যমেই সেপ্টেম্বর মাসের বেতন বিল পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু উপাচার্যের হস্তক্ষেপে এখন পর্যন্ত কেউ বেতন পাননি।’ তিনি আরও অভিযোগ করেন, ‘নতুন উপাচার্য হয়তো তাঁর ক্ষমতা প্রদর্শনের জন্য বেতন আটকে রেখেছেন। এত দিন যেভাবে বেতন নেওয়া হচ্ছিল, তা যদি নিয়মের বাইরে হয়, তাহলে উনি এ পর্যন্ত যাঁরা যত বেতন নিয়েছেন, সব কেটে নিক। সবাই তো কর্মবিরতিতে আছেন, উনার সঙ্গে সভা করতে যাবেন কেন।’