কুমিল্লায় কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য দমন করতে গিয়ে পাঁচ কিশোর ও তরুণকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। পুলিশ জানিয়েছে, গ্রেপ্তারকৃতরা তিনটি ভিন্ন কিশোর গ্যাংয়ের মূল হোতা হিসেবে পরিচিত। গতকাল রোববার কুমিল্লা নগর, চৌদ্দগ্রাম এবং মনোহরগঞ্জ থানা এলাকায় পৃথক অভিযান চালিয়ে তাঁদের আটক করা হয়।
গ্রেপ্তারকৃতদের পরিচয় পাওয়া গেছে। তাঁরা হলেন কুমিল্লা নগরের নুরপুর এলাকার ‘স্ম্যাশ স্কোয়াড’ গ্যাংয়ের প্রধান জিসান (১৯) এবং ওই গ্যাংয়ের অন্যতম নেতা শহরতলির আড়াইওড়ার সাইফুল ইসলাম (২০)। এছাড়া চৌদ্দগ্রামের ‘১২০৭’ গ্যাংয়ের প্রধান তারেক হোসেন সৈকত (১৯) ও জাফর আহমদ (২৩) এবং মনোহরগঞ্জের ‘PX 10’ (পিএক্স ১০) গ্যাংয়ের প্রধান ১৭ বছর বয়সী এক কিশোরকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
আজ সোমবার দুপুরে কুমিল্লা জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য প্রকাশ করেন জেলা পুলিশের মিডিয়া কর্মকর্তা ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার লুৎফর রহমান। তিনি জানান, গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তিরা নিজ নিজ এলাকায় কিশোর গ্যাং পরিচালনা করে চাঁদাবাজি, মারামারি এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টির মতো বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত ছিলেন। তাঁদের বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট থানায় প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
পুলিশের দেওয়া বিস্তারিত তথ্যমতে, জিসানের বাড়ি নগরের তেলিকোনা গোবিন্দ পুকুরপাড় এলাকায় এবং সাইফুলের বাড়ি আড়াইওড়া সমিতিপাড়া এলাকায়। তারেকের বাড়ি চৌদ্দগ্রামের নলিশ্বর এবং জাফরের বাড়ি কোমারডোগা মধ্যমপাড়া এলাকায়। অন্যদিকে, মনোহরগঞ্জের পোমগাঁও এলাকার বাসিন্দা ওই ১৭ বছর বয়সী কিশোরকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার লুৎফর রহমান বলেন, “কুমিল্লায় কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য রোধ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা এবং জনমনে স্বস্তি ফিরিয়ে আনতে কাজ করছে জেলা পুলিশ। জেলার প্রতিটি ইউনিট কিশোর গ্যাংয়ের সক্রিয় অপরাধীদের আইনের আওতায় আনতে ধারাবাহিক অভিযান পরিচালনা করে আসছে। এরই ধারাবাহিকতায় গতকাল রাতে কুমিল্লা কোতোয়ালি, চৌদ্দগ্রাম ও মনোহরগঞ্জ থানা এলাকা থেকে তিনটি কুখ্যাত কিশোর গ্যাংয়ের পাঁছজন সক্রিয় মূল হোতাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।”
তিনি আরও জানান, সাধারণ মানুষের জানমাল রক্ষা এবং সমাজকে অপরাধমুক্ত রাখতে কিশোর গ্যাং ও অন্যান্য অপরাধ দমনে জেলা পুলিশের এ ধরনের অভিযান অব্যাহত থাকবে।
উল্লেখ্য, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকের সন্তান সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের পর গত ২৩ সেপ্টেম্বর থেকে কুমিল্লা নগরসহ জেলার ১৮টি থানায় কিশোর গ্যাংবিরোধী বিশেষ অভিযান শুরু করে পুলিশ। পাঁচ দফার এই ব্যাপক অভিযানে এখন পর্যন্ত দুই হাজারের বেশি মানুষকে আটক করা হয়েছে।
জেলা পুলিশের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রথম দফায় ৬২৪, দ্বিতীয় দফায় ২৫৪, তৃতীয় দফায় ৪১৫, চতুর্থ দফায় ৩৭৯ এবং পঞ্চম দফায় ৩৭০ জনকে আটক করা হয়। সব মিলিয়ে মোট আটক করা হয়েছে ২ হাজার ৪২ জনকে। তাঁদের মধ্যে ১ হাজার ৪০৯ জনকে মুচলেকায় পরিবারের জিম্মায় ছেড়ে দেওয়া হয়েছে এবং বাকিদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
পঞ্চম দফার অভিযানে কুমিল্লার আলোচিত ‘রতন গ্রুপ’ বা ‘আর স্কোয়াড’-এর প্রধান ইমরান হোসেন ওরফে রতনসহ চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পুলিশের ভাষ্যমতে, রতনের বিরুদ্ধে খুনসহ গুরুতর অভিযোগে মোট ৯টি মামলা রয়েছে।
পুলিশ আরও জানিয়েছে, আটক ব্যক্তিদের কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ততা, মাদক সেবন বা ব্যবসা, পূর্ববর্তী মামলা, গ্রেপ্তারি পরোয়ানা এবং অন্যান্য অপরাধে জড়িত থাকার তথ্য যাচাই করা হচ্ছে। এই যাচাই প্রক্রিয়া শেষ হলে তাঁদের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।