কুমিল্লায় কিশোর গ্যাং, মাদক ব্যবসায়ী এবং ছিনতাইকারীদের দমনে আবারও একযোগে বিশেষ অভিযান পরিচালনা করেছে পুলিশ। গতকাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত মোট ছয় ঘণ্টার এই অভিযানে ৩৫১ জনকে আটক করা হয়েছে। আটককৃতদের মধ্যে ১৩২ জনের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে এবং বাকি ২১৯ জনকে মুচলেকার বিনিময়ে পরিবারের জিম্মায় ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
আজ শুক্রবার দুপুরে জেলা পুলিশের মিডিয়া কর্মকর্তা ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার লুৎফর রহমান মুক্তকণ্ঠকে এই তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, গতকাল সন্ধ্যা ৬টা থেকে দিবাগত রাত ১২টা পর্যন্ত জেলার ১৮টি থানা এবং গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) সমন্বয়ে এই ব্যাপক অভিযান চালানো হয়।
পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, আটক ব্যক্তিদের কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে কোনো সম্পৃক্ততা আছে কি না, তারা মাদক বা অন্য কোনো অপরাধে জড়িত কি না এবং তাদের বিরুদ্ধে কোনো গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি আছে কি না—তা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে।
জেলা পুলিশ সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, গত ২৩ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হওয়া ধারাবাহিক অভিযানে এখন পর্যন্ত মোট ৫ হাজার ২৪৬ জনকে আটক করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ৬ হাজার ১৫১ জনকে মুচলেকা নিয়ে অভিভাবকদের জিম্মায় ছেড়ে দেওয়া হয়েছে এবং বাকি ২ হাজার ৯৫ জনের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার লুৎফর রহমান বলেন, “কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা আছে—এমন স্থানগুলোর পাশাপাশি মাদক ব্যবসায়ী ও ছিনতাইকারীদের বিরুদ্ধে এ অভিযান চালানো হয়। এতে জেলার ১৮টি থানার সব ইউনিট ও গোয়েন্দা পুলিশ অংশ নেয়। পুলিশ সুপারসহ জেলা পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সরাসরি অভিযানে ছিলেন।” তিনি আরও উল্লেখ করেন, “আটক ব্যক্তিদের অপরাধে সম্পৃক্ততার বিষয়টি যাচাই-বাছাই করে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। নিরপরাধ কেউ যাতে হয়রানির শিকার না হন, সে বিষয়েও কঠোর নজরদারি রাখা হচ্ছে।”
এর আগে ২২ ও ২৩ অক্টোবর টানা দুই রাতের অভিযানে পুলিশ মোট ৪৫০ জনকে আটক করেছিল। এর মধ্যে ২৩ অক্টোবর ২৭৫ জন আটক হন, যাদের ১৪২ জনের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়। অন্যদিকে ২২ অক্টোবর আটক করা হয়েছিল ১৭৫ জনকে।
উল্লেখ্য, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক নাহিদা বেগমের ছেলে এবং সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমের হত্যাকাণ্ডের পর জেলায় কিশোর গ্যাংবিরোধী অভিযান জোরদার করেছে পুলিশ। গত ১৮ সেপ্টেম্বর নিখোঁজ হওয়ার পরদিন কুমিল্লা সদর দক্ষিণ উপজেলার সানন্দা এলাকার লালমাই পাহাড়ের একটি জঙ্গল থেকে অপ্রতিমের লাশ উদ্ধার করা হয়।
এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডে দুই কিশোরসহ চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। পরবর্তীতে তিনজন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদান করেন। পুলিশের তদন্তে অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিদের কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ততার বিষয়টি সামনে আসে। এরপরই কিশোর অপরাধ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জোরালো হয়। এই দাবির পরিপ্রেক্ষিতেই ২৩ সেপ্টেম্বর থেকে জেলার ১৮টি থানায় বিশেষ অভিযান শুরু করে জেলা পুলিশ।
পুলিশ জানিয়েছে, আটক ব্যক্তিদের কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ততা, মাদক ও বিভিন্ন অপরাধে জড়িত থাকার তথ্য এবং তাঁদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা আছে কি না, তা যাচাই করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে। কিশোর অপরাধ নিয়ন্ত্রণে এ ধরনের অভিযান অব্যাহত থাকবে। এ ছাড়া মুচলেকায় ছেড়ে দেওয়া ব্যক্তিদের পুলিশি নজরদারিতে রাখা হচ্ছে।