‘আমি খুব ব্যস্ত’—কথাটি বর্তমান সময়ে কেবল একটি তথ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয় না, বরং অনেক ক্ষেত্রে কাউকে এড়িয়ে যাওয়ার এক মার্জিত সামাজিক কৌশলে পরিণত হয়েছে। কর্মব্যস্ততা, ডিজিটাল স্ক্রিনের প্রতি আসক্তি, ডেডলাইনের চাপ আর যান্ত্রিক জীবনের অন্তহীন ছোটাছুটিতে আমরা সবাই এক ক্লান্তিকর সময়ের মধ্য দিয়ে অতিবাহিত করছি।

এমন এক যুগে, যেখানে প্রত্যেকেই কেবল নিজের কথা বলতে কিংবা অন্যের ওপর নিজের মত চাপিয়ে দিতে ব্যাকুল, সেখানে অন্যকে থামিয়ে মন দিয়ে শোনার মতো মানুষের খুব অভাব। অথচ গভীর মনোযোগ দিয়ে অন্যকে শোনা কেবল আধুনিক যুগের মানসিক স্বাস্থ্যসেবা বা যোগাযোগের কোনো কৌশল নয়; বরং এটি ছিল প্রিয় নবীজির জীবনের এক অনন্য আদর্শ।

বর্তমান সময়ে কেউ যখন তার বুকের জমানো কষ্টের কথা বলতে আসে, সে অধিকাংশ ক্ষেত্রে কোনো তাৎক্ষণিক সমাধান প্রত্যাশা করে না। সে কেবল এমন একজন মানুষকে খোঁজে, যে কোনো বিচার-বিশ্লেষণ ছাড়াই তার কথাগুলো মন দিয়ে শুনবে।

মদিনার এক অতি সাধারণ নারী ছিলেন হজরত খাওলা বিনতে সালাবা (রা.)। তৎকালীন সমাজব্যবস্থার এক নির্মম প্রথা ‘জিহার’-এর শিকার হয়ে তিনি নিজেকে নিঃস্ব ও অসহায় বোধ করছিলেন। নিজের ভেঙে যাওয়া সংসার বাঁচানোর করুণ আকুতি নিয়ে তিনি হাজির হলেন নবীজির দরবারে।

একজন সাধারণ নারীর সেই ফিসফিসানি, যা ঘরের ভেতরের মানুষের কান পর্যন্তও পুরোপুরি পৌঁছাল না—আসমান থেকে নেমে এল তার জবাব। নবীজির ছোট কামরার এক কোণে বসা ছিলেন আয়েশা (রা.)। খাওলা এত বিনীত আর নিচু স্বরে কথা বলছিলেন যে পাশে বসেও তাঁর সব কথা তিনি শুনতে পাচ্ছিলেন না। (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ১৮৮)

সেই নিচু স্বরে বলা কথাগুলোরই উত্তর হিসেবে আল্লাহ-তাআলা নাজিল করলেন, “‘আল্লাহ অবশ্যই সেই নারীর কথা শুনেছেন, যে তার স্বামীর বিষয়ে আপনার সঙ্গে বাদানুবাদ করছিল এবং আল্লাহর কাছে নিজের অভিযোগ নিবেদন করছিল। আল্লাহ আপনাদের উভয়ের কথোপকথন শুনছিলেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা।” (সুরা মুজাদালাহ, আয়াত: ১)

আয়েশা (রা.) পরবর্তীতে এই ঘটনায় অভিভূত হয়ে বলতেন, ‘মহিমান্বিত সেই সত্তা, যার শ্রবণক্ষমতা পুরো মহাবিশ্বকে পরিবেষ্টন করে রেখেছে!’ (ইবনে কাসির, তাফসিরুল কুরআনিল আজিম , ৮/৩৭, দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ, বৈরুত)

সমগ্র উম্মাহর দায়িত্ব ছিল নবীজির কাঁধে। ওহি গ্রহণ, রাষ্ট্র পরিচালনা, সামাজিক বিচার, শত্রুদের মোকাবিলা থেকে শুরু করে ইসলাম প্রচার—ইতিহাসের সবচেয়ে ব্যস্ত মানুষ ছিলেন তিনি। অথচ এত কাজের চাপের মধ্যেও কোনো সাধারণ শিশু, প্রবীণ ব্যক্তি বা অসহায় নারী এসে দাঁড়ালে তিনি কখনো বলেননি, ‘আমার এখন সময় নেই।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬০৬১)

সবাই যেখানে কথা বলতে ব্যাকুল, সেখানে নিজেকে একজন গভীর ও সহমর্মী শ্রোতা হিসেবে গড়ে তোলাই হতে পারে এই কোলাহলময় যুগে নবীজির চরিত্রকে লালন করার সবচেয়ে সুন্দর উপায়। কারো কথা শোনার সময় নবীজি (সা.) শুধু কান পাততেন না; বরং পুরো শরীর ঘুরিয়ে সেই মানুষের দিকে মন দিয়ে দাঁড়াতেন। (শামায়িলে তিরমিজি, হাদিস: ৮)

তাঁর এই অখণ্ড মনোযোগের কারণে প্রতিটি মানুষ মনে করত, পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষের কাছে সে-ই বুঝি সবচেয়ে প্রিয় ও গুরুত্বপূর্ণ। (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৭১১)

আমরা এমন এক মুখর যুগে বাস করছি, যেখানে শোনার চেয়ে বলার মানুষের ভিড় অনেক বেশি। আমরা অন্যকে বোঝার জন্য শুনি না; বরং শুনি শুধু উত্তর দেওয়ার জন্য বা নিজের পাল্টা যুক্তি দাঁড় করানোর জন্য। অথচ ইসলামি আখলাক আমাদের শেখায়, মনোযোগ দিয়ে শোনা নিজেই একটি ইবাদত। কারও মনের ভার হালকা করতে সব সময় বড় কোনো উপদেশের প্রয়োজন হয় না। শুধু নীরব সহমর্মিতায় এটুকু বার্তা দেওয়া প্রয়োজন যে, ‘আমি তোমার কথা শুনছি, তুমি একা নও’।

সবাই যেখানে বলতে ব্যাকুল, সেখানে নিজেকে একজন গভীর ও সহমর্মী শ্রোতা হিসেবে গড়ে তোলাই হতে পারে এই কোলাহলময় যুগে নবীজির চরিত্রকে লালন করার সবচেয়ে সুন্দর উপায়।