রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনযাত্রা মুমিনদের জন্য সর্বোত্তম আদর্শ। ইবাদত-বন্দেগি থেকে শুরু করে পোশাক-পরিচ্ছদ, চলাফেরা এবং দৈনন্দিন জীবনের নানা বিষয়ে তাঁর জীবনে রয়েছে অনুসরণীয় শিক্ষা। হাদিস গ্রন্থসমূহ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, রাসুল (সা.) কখনো শুধুমাত্র টুপি পরতেন, আবার কখনো বা টুপির ওপর পাগড়িও ব্যবহার করতেন।

বিভিন্ন হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, নবীজির তিন ধরনের টুপি ছিল: সাদা নকশাদার টুপি, ইয়েমানি কাপড়ের তৈরি টুপি এবং কানযুক্ত টুপি, যা তিনি সফরের সময় পরতেন। (আবদুল্লাহ আসফাহানি, আখলাকুন-নবী ওয়া আদাবুহু, ১১৮ পৃষ্ঠা, দারুল হাদিস, কায়রো, ২০০৭)

আয়েশা সিদ্দিকা (রা.) বলেন, ‘আল্লাহর রাসুল সাদা রঙের এমন একটি টুপি পরতেন, যা তাঁর মাথার সঙ্গে লেগে থাকত।’ (সুয়ুতি, জামে ছগির, হাদিস: ৭১৪৯)

উপরোক্ত হাদিসগুলো থেকে স্পষ্ট হয় যে, নবীজির টুপিতে বৈচিত্র্য ছিল। তাই একটি নির্দিষ্ট রং বা ধরনকে অপরিহার্য মনে করার কোনো সুযোগ নেই। তবে নবীজির সাদা পোশাক পছন্দের বিষয়টি পৃথক হাদিসে এসেছে, যা সাদা রঙের পোশাক উত্তম হওয়ার প্রমাণ দেয়।

টুপির পাশাপাশি পাগড়ি পরার বিষয়টিও হাদিসে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখিত। মক্কা বিজয়ের দিন তিনি কালো পাগড়ি পরে মক্কায় প্রবেশ করেন। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৩৫৮)

আমর ইবনে হুরাইস মাখজুমি (রা.) বলেন, ‘আমি যেন এখনো নবীজিকে মিম্বরের ওপর দেখছি, তাঁর মাথায় কালো পাগড়ি, যার দুই প্রান্ত দুই কাঁধের মাঝখানে ঝুলিয়ে রাখা।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৩৫৯)

সাহাবিদের অভ্যাস থেকে জানা যায়, পাগড়ি সাধারণত টুপির ওপরই বাঁধা হতো, আলাদাভাবে নয়। সোলাইমান ইবনে আবু আবদিল্লাহ বলেন, তিনি প্রথম যুগের মুহাজিরদের দেখেছেন, তাঁরা বিভিন্ন রঙের পাগড়ি পরতেন এবং পাগড়ির নিচে টুপি রেখে তার ওপর পাগড়ি জড়িয়ে নিতেন। (আল-মুসান্নাফ লিইবনি আবি শাইবা, ৮/৩১৩, আল-ফারুক আল-হাদিসা, কায়রো, ২০০৮)

হাসান বসরি (রহ.) বলেন, ‘সাহাবিরা পাগড়ি ও টুপির ওপরও সিজদা করতেন।’ (সহিহ বুখারি, প্রচণ্ড গরমের কারণে কাপড়ের ওপর সিজদা করা অধ্যায়)

সাহাবি ওয়াবিসা ইবনে মাবাদের মাথায় দুই কানবিশিষ্ট, মাথার সঙ্গে লেগে থাকা টুপি দেখা গেছে। হেলাল ইবনে ইয়াসাফ বর্ণনা করেন, ‘তখন তাঁর মাথায় দুই কানবিশিষ্ট, মাথার সঙ্গে লেগে থাকা একটি টুপি ছিল।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৯৪৯)

শিক্ষণীয় বিষয় হলো, নির্দিষ্ট রং বা নকশার টুপিকে অপরিহার্য মনে করার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো মাথা ঢেকে শালীনতা বজায় রাখার মূল সুন্নতটি অনুসরণ করা।

তাবেয়ি ইমাম সাইদ ইবনুল মুসাইয়িবের পোশাক প্রসঙ্গে মুহাম্মাদ ইবনে হিলাল বলেন, ‘আমি তাঁকে দেখেছি, তিনি একটি পাতলা টুপি পরার পর তার ওপর সাদা পাগড়ি বাঁধতেন।’ (ইবনে সাদ, আত-তাবাকাতুল কুবরা, ৫/১০৫, দারুল কুতুব আল-ইলমিয়্যাহ, বৈরুত, ১৯৯৭)

কাসিম ইবনে মালিক এক ব্যক্তির সূত্রে বলেন, ‘আমি জাহহাকের মাথায় পশমের টুপি দেখেছি।’ (ইবনে সাদ, আত-তাবাকাতুল কুবরা, ৬/৩০৩, দারুল কুতুব আল-ইলমিয়্যাহ, বৈরুত, ১৯৯৭)

এসব বর্ণনা থেকে বোঝা যায়, ইসলামের প্রাথমিক যুগে টুপির যে ধরন ছিল, পরে তাতে বৈচিত্র্য এসেছে। তবে টুপি পোশাকের পরিচিত অংশ ছিল, কখনো এককভাবে, আবার কখনো পাগড়ির সঙ্গে যুক্ত হয়ে। নবীজির টুপিতে রঙে, আকৃতিতে কিংবা পাগড়ির সংযোগেও বৈচিত্র্য ছিল।

এখান থেকে শিক্ষণীয় বিষয় হলো, নির্দিষ্ট রং বা নকশার টুপিকে অপরিহার্য মনে করার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো মাথা ঢেকে শালীনতা বজায় রাখার মূল সুন্নতটি অনুসরণ করা। ধর্মের অন্যান্য বিষয়ের মতো টুপির ক্ষেত্রেও আমরা আমাদের স্বর্ণোজ্জ্বল অতীতের সঙ্গে সম্পৃক্ত।

(ফয়জুল্লাহ রিয়াদ : মুহাদ্দিস, জামিয়া আরাবিয়া দারুস সুন্নাহ রাজাবাড়ী, ঢাকা)