বর্তমান যুগে গুগল ম্যাপের ব্যাপক প্রচারে পথ হারানো কিংবা পথ জিজ্ঞেস করার প্রয়োজনীয়তা যেন অনেকটা কমে গিয়েছে। তবে সব সময় প্রযুক্তি পাশে থাকে না; কখনো নেটওয়ার্কের সমস্যা হয়, কখনো ম্যাপ ভুল মোড় দেখায়, আবার কখনো অচেনা শহরের গোধূলি বেলায় মানুষ দিশেহারা হয়ে পড়ে।

এমন পরিস্থিতিতে ফোন পকেটে রেখে আমাদের নির্ভর করতে হয় পাশের মানুষটির ওপর। তবে পথ জিজ্ঞেস করতে গিয়ে এখন অনেকেই বিরক্ত মুখ দেখতে পান, কখনো অবজ্ঞা সহ্য করতে হয়, আবার কখনো ভুল ইশারা দেওয়া হয়। অথচ ইসলামের দৃষ্টিতে এবং মহানবী (সা.)-এর শিক্ষায় পথহারা মানুষকে সঠিক পথ দেখানোকে ইবাদত হিসেবে গণ্য করা হয়েছে।

রাস্তায় বসে আড্ডা দেওয়া প্রসঙ্গে সাহাবিদের সঙ্গে নবীজির একটি কথোপকথন হাদিসে বর্ণিত হয়েছে। নবীজি (সা.) বলেছিলেন, ‘তোমরা রাস্তায় বসা থেকে সতর্ক থাকো।’ এর উত্তরে সাহাবিরা জানান যে, তাঁদের তো মজলিসে বসতেই হয় এবং সেখানেই তাঁদের কথাবার্তা হয়ে থাকে।

তখন তিনি নির্দেশ দেন, ‘যদি বসতেই হয়, তবে রাস্তার হক আদায় করো।’ রাস্তার হক আসলে কী, তা জানতে চাইলে তিনি বলেন, দৃষ্টি অবনত রাখা, কাউকে কষ্ট না দেওয়া, সালামের জবাব দেওয়া, সৎ কাজের আদেশ করা ও অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করা। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৪৬৫)

এই বর্ণনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ অন্য একটি হাদিসে সালামের জবাব, হাঁচির জবাব, দৃষ্টি অবনত রাখা এবং ‘পথহারাকে পথ দেখানো’র কথা উল্লেখ করা হয়েছে। (সুনান আবু দাউদ, হাদিস: ৪৮১৬)

বিভিন্ন বর্ণনা বিশ্লেষণ করে ইবনে হাজার আসকালানি (রহ.) রাস্তার হক হিসেবে মোট ১৪টি আদব বা শিষ্টাচারের কথা উল্লেখ করেছেন। এর মধ্যে রয়েছে বিপদগ্রস্তকে সাহায্য করা, মজলুমকে সহযোগিতা করা, ভারী বোঝা বহনে সহায়তা করা, সুন্দর কথা বলা এবং পথহারা মানুষকে সঠিক দিকনির্দেশনা দেওয়া। (ফাতহুল বারি, ১১/১৬)

এর অর্থ হলো, একজন পথিককে সঠিক পথ বলে দেওয়া রাস্তার একটি স্বীকৃত হক বা অধিকার হিসেবে গণ্য।

সাধারণত আমরা সদকা বলতে কেবল টাকা বা সম্পদ দান করাকে বুঝি। কিন্তু হাদিসের পরিভাষায় সদকার পরিধি অত্যন্ত বিস্তৃত। নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘তোমার ভাইয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসা তোমার জন্য সদকা, সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করা সদকা, পথহারা মানুষকে পথ দেখানো সদকা, দুর্বল দৃষ্টির মানুষকে সাহায্য করা সদকা, রাস্তা থেকে পাথর, কাঁটা ও হাড় সরানো সদকা এবং তোমার বালতির অবশিষ্ট পানি ভাইয়ের বালতিতে ঢেলে দেওয়াও সদকা।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ১৯৫৬)

এই হাদিসের মূল আরবিতে ‘ইরশাদুকার রাজুলা ফি আরদিদ দালাল’ কথাটি ব্যবহৃত হয়েছে, যার অর্থ হলো পথ হারানো ভূমিতে মানুষকে সঠিক দিকনির্দেশনা দেওয়া।

পথ না বলে দেওয়া এক কথা, আর ভুল পথ বলে দেওয়া সম্পূর্ণ ভিন্ন ও গুরুতর বিষয়। বিশেষ করে দুর্বল দৃষ্টির মানুষকে ভুল পথে পাঠানোর ব্যাপারে নবীজি (সা.) কঠোর সতর্কবার্তা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘যে অন্ধকে পথ থেকে বিচ্যুত করে, তার ওপর আল্লাহর অভিশাপ।’ (আল-আদাবুল মুফরাদ, হাদিস: ৮৯২)

যদিও এই হাদিসের প্রত্যক্ষ ক্ষেত্র দৃষ্টিহীন ব্যক্তি, তবে আলেমদের মতে এর মর্মার্থ হলো—কেউ সাহায্য চাইলে তাকে জেনেশুনে বিভ্রান্ত করা মারাত্মক অপরাধ। যদি সঠিক পথ জানা না থাকে, তবে সততার সাথে ‘আমি জানি না’ বলাই শ্রেয়।

প্রযুক্তি আমাদের জীবনকে সহজ করলেও মানুষের পারস্পরিক ভরসা ও সামাজিক বন্ধন কমিয়ে দিয়েছে। কাউকে পথ বলে দেওয়ার জন্য কোনো আর্থিক খরচ হয় না, প্রয়োজন হয় কেবল সামান্য কিছু মুহূর্ত এবং একটু সদিচ্ছা।

অনেকে ইসলামকে চিনে থাকেন মুসলমানদের আচরণের মাধ্যমে। যখন কোনো দিশেহারা মানুষ সাহায্য চায় এবং তাকে বিরক্ত মুখে ফেরত পাঠানো হয়, তখন সেটি কেবল ব্যক্তিগত রূঢ়তা থাকে না, বরং তা সামগ্রিক ভাবমূর্তির ওপর প্রভাব ফেলে।

পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা নবীজি (সা.)-কে উদ্দেশ্য করে বলেছেন, আল্লাহর রহমতেই আপনি তাদের প্রতি কোমল হয়েছেন। আপনি রূঢ় ও কঠোরচিত্ত হলে তারা আপনার কাছ থেকে সরে যেত। (সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৫৯)

মানুষের হৃদয়ে ফিরে আসার পথ কেবল কোমলতার মাধ্যমেই তৈরি হয়। প্রযুক্তি আমাদের অনেক সুবিধা দিলেও পরস্পরের ওপর ভরসা করার অভ্যাস কমিয়ে দিয়েছে। অথচ পথ বলে দেওয়ার মতো ছোট একটি কাজে কোনো খরচ লাগে না, লাগে শুধু কয়েক মুহূর্ত ও সদিচ্ছা।

এই ছোট অভ্যাসটিই অচেনা মানুষের মনে নিরাপত্তার অনুভূতি তৈরি করে। নবীজির শিক্ষা আমাদের শেখায় যে, এসব সামান্য কাজও আল্লাহর কাছে সদকার মর্যাদা লাভ করে।