আমাদের দেশ অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত উন্নতির দিকে এগিয়ে গেলেও, মানবিক মূল্যবোধ এবং প্রাণিকুলের প্রতি মমত্ববোধ যেন ক্রমশ হ্রাস পাচ্ছে। শহরের ব্যস্ত রাস্তায় কাদার পানি চেটে খেতে দেখা যায় পথকুকুরদের। খাবারের দোকানের সামনে একরাশ আশা নিয়ে তাকিয়ে থাকা অবলা প্রাণীরা হয়তো খুঁজছে এমন কাউকে, যে মায়াবশত তাদের এক টুকরো খাবার দেবে। কিন্তু এই যান্ত্রিক শহরে তাদের করুণার আবেদন শোনার মতো মানুষ কি আর আছে?
টাকার বিনিময়ে উন্নত জীবনযাপনের সব উপকরণ পাওয়া গেলেও, আমরা পাশের মানুষের দিকে তাকানোর সময় পাচ্ছি না। ঢাকা এখন দিল্লি, লন্ডন বা সিঙ্গাপুরের মতো ব্যস্ত। এই ব্যস্ততার ভিড়ে পথশিশু কিংবা পথপ্রাণীরা হয়ে পড়েছে চরম উপেক্ষিত। তবে কেবল প্রাণীরাই নয়, মানুষের মধ্যেও এক ভয়াবহ একাকীত্ব দানা বাঁধছে। শহরেই অনেক বৃদ্ধ বাবা-মা নিঃসঙ্গ অবস্থায় মারা যাচ্ছেন। তাঁদের সন্তানরা উচ্চশিক্ষিত ও প্রতিষ্ঠিত হয়েও ভুলে গেছেন সেই মানুষদের, যাঁরা তাঁদের হাত ধরে হাঁটতে শিখিয়েছিলেন। এমনকি তরুণ প্রজন্মের মধ্যেও এই নিঃসঙ্গতার মৃত্যু দেখা যাচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হাজারো বন্ধু থাকলেও, বাস্তব জীবনে তারা হয়ে পড়ছেন একা। আমরা কি সত্যিই এতটাই ব্যস্ত, নাকি অনুভব করার ক্ষমতাটাই হারিয়ে ফেলছি?
মানবিকতা আসলে একটি অভ্যাস। যে মানুষটি একটি ক্ষুধার্ত কুকুরকে খাবার দেয়, সে সাধারণত একজন ক্ষুধার্ত মানুষকেও ফিরিয়ে দেয় না। কারণ সে ক্ষুধার কষ্ট চিনতে পারে। একইভাবে, যে আহত পাখিকে বাঁচাতে ছুটে যায়, সে দুর্ঘটনায় পড়া অচেনা মানুষকে সাহায্য করতেও দ্বিধাবোধ করে না। দয়া মানুষের এমন এক বৈশিষ্ট্য যা বিভক্ত হয় না।
বর্তমান সময়ে প্রযুক্তি আমাদের সংযুক্ত করলেও হৃদয়গুলোকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে। আমরা হাজারো মানুষের ছবি দেখি, ভিডিওতে ‘লাইক’ দিই, কিন্তু পাশের মানুষের চোখের পানি দেখার সময় পাই না। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিস্ময় আমাদের মুগ্ধ করলেও, আমরা হারিয়ে ফেলছি প্রকৃত মানবিকতা। মানবসভ্যতার ইতিহাসে ধর্ম, ভাষা বা প্রযুক্তি বদলেছে, কিন্তু সহানুভূতি ছাড়া কোনো সভ্যতা টিকে থাকেনি। পৃথিবীর সব মহান ধর্ম ও দর্শন একমত যে, মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব তার শক্তিতে নয়, বরং তার মায়া ও দয়ায়। যে দুর্বলকে রক্ষা করতে পারে, সেই প্রকৃত শক্তিশালী।
প্রকৃতির এক নীরব নিয়ম রয়েছে। আজ আমরা প্রকৃতির প্রতি যে আচরণ করব, আগামীকাল প্রকৃতি তার প্রতিধ্বনি ফিরিয়ে দেবে। নদী দূষণ, বন উজাড় এবং প্রাণিহত্যা আমাদের সামনে জলবায়ু পরিবর্তন, তাপপ্রবাহ ও মহামারীর মতো বিপর্যয় ডেকে আনছে। আজ আমরা যদি বৃদ্ধ বাবা-মায়ের একাকীত্ব উপেক্ষা করি, তবে আগামীতে আমাদের সন্তানরাও হয়তো একই শিক্ষা নিয়ে বড় হবে। জীবন প্রতিশোধ নেয় না, বরং জীবন আমাদের আচরণের প্রতিফলন ঘটায়।
তাই সন্তানদের কেবল বিজ্ঞান, গণিত বা প্রযুক্তি শেখালেই চলবে না। একটি অর্থপূর্ণ জীবনের জন্য প্রয়োজন অন্যের চোখের ভাষা বুঝতে পারা। অবলা প্রাণীর আর্তনাদ, মরে যাওয়া নদী, দূষিত বাতাস এবং ক্ষয়ে যাওয়া পাহাড়ের ভাষা বুঝতে হবে। নিজের স্বার্থেই আমাদের ইকোসিস্টেম রক্ষা করা জরুরি, যাতে পরবর্তী প্রজন্মের জন্য নিশ্বাস নেওয়ার যোগ্য বাতাস এবং পান করার উপযোগী পানি থাকে।
— ফারজানা আলম, শিক্ষক ও উদ্যোক্তা
(মতামত লেখকের নিজস্ব)