ছাত্রজীবনের শুরুর কথা মনে পড়লে চোখে ভেসে ওঠে সেই পরিচিত বাক্যটি— ‘ছাত্রানাং অধ্যয়নং তপঃ’। এর সহজ অর্থ হলো, অধ্যয়নই ছাত্রদের প্রকৃত তপস্যা। জ্ঞান অর্জনের জন্য ছাত্রজীবনই হলো সবচেয়ে উপযুক্ত সময়, কারণ এই সময়ে সাধারণত সাংসারিক জটিলতা বা মানসিক চাপের বোঝা থাকে না। ফলে কঠোর অধ্যবসায়ের মাধ্যমে একজন শিক্ষার্থী তার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জন করতে পারে এবং দেশের ভবিষ্যৎ হিসেবে নিজেকে একজন যোগ্য নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার সুযোগ পায়।

কিন্তু সাম্প্রতিক এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফল আমাদের দীর্ঘদিনের এই ধারণাকে সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছে। গত ২২ বছরের ইতিহাসে এমন ভয়াবহ অবনতি পুরো দেশকে স্তব্ধ করে দিয়েছে। কেবল সামগ্রিক ফলাফলের অবনতিই নয়, জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যাও আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পেয়েছে। এমন অনেক প্রতিষ্ঠান এখন সামনে এসেছে যেখানে একজন শিক্ষার্থীও পাস করতে পারেনি। অন্যদিকে, শতভাগ সাফল্যের হার ধরে রাখা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা কমেছে। দেশের ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের এবারের এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফলে এই হতাশাজনক চিত্রটি স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এ বছর জিপিএ-৫ পেয়েছেন মাত্র ৩৫ হাজার শিক্ষার্থী, যেখানে গত বছর এই সংখ্যা ছিল ৬৩ হাজার। এর সরাসরি প্রভাব পড়বে উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে; অনেক মেধাবী শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষায় ভর্তির প্রবল ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও প্রয়োজনীয় যোগ্যতার অভাবে ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিতে পারবেন না।

মোট পরীক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল প্রায় সাড়ে ১০ লাখ, যার বিপরীতে পাস করেছেন মাত্র ৫ লাখ ৪০ হাজার শিক্ষার্থী। অর্থাৎ, প্রায় অর্ধেক শিক্ষার্থীই অকৃতকার্য হয়েছেন! এই পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক এবং একে কোনোভাবেই হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই। সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে এই বিপর্যয়ের মূল কারণগুলো খুঁজে বের করা এখন সময়ের দাবি। শিক্ষার্থীদের জীবনের এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষায় এমন বিপর্যয় পুরো বাংলাদেশের জন্য লজ্জাজনক এবং একটি অশনিসংকেত। প্রশ্ন জাগে, আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের ভবিষ্যৎ কি তবে অন্ধকার? এই সব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে এবং অগ্রাধিকার ভিত্তিতে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে।

এই বিপর্যয়ের পেছনে অবকাঠামোগত ত্রুটি, পাঠদানের ঘাটতি, শিক্ষকের অভাব এবং প্রতিকূল আবহাওয়ার কথা বলা হয়। তবে আমি এর পাশাপাশি আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ কারণ উল্লেখ করতে চাই।

২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান এবং তার পরবর্তী সময়ে অনেক কোমলমতি শিক্ষার্থী বিভিন্ন রাজনৈতিক আন্দোলনে জড়িয়ে পড়ে। কিছু পক্ষ তাদের এই কাজে উৎসাহিতও করেছে। এর ফলে অনেকের পড়াশোনায় বড় ধরনের ব্যাঘাত ঘটে। কথায় কথায় আন্দোলনে জড়িয়ে পড়া, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের লাগামহীন ব্যবহার, অপরিণত বয়সে মুঠোফোনের আসক্তি, অভিভাবকদের গাফিলতিতে কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার এবং তথ্যপ্রযুক্তির অপব্যবহার—এই সব বিষয় এবারের ফল বিপর্যয়ের জন্য অনেকাংশে দায়ী।

বর্তমানে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের হাতেও মুঠোফোন দেখা যাচ্ছে। এর ফলে বাড়ছে মুঠোফোন-আসক্তি এবং পাল্লা দিয়ে বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি। এসব কুফলই এবারের ফল বিপর্যয়ের অন্যতম প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনিয়ন্ত্রিত ফেসবুক ব্যবহার, কিছু অভিভাবকের অতিরিক্ত প্রশ্রয় এবং সঠিক সময়ে সন্তানকে নিয়ন্ত্রণে রাখার ব্যর্থতা কিশোরসমাজকে বিপথগামী করেছে। এর নেতিবাচক প্রভাব সরাসরি পড়েছে পড়াশোনায়, যার প্রমাণ ২০২৬ সালের এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফলে। উচ্চশিক্ষার ভর্তি পরীক্ষায় এর মারাত্মক প্রভাব পরিলক্ষিত হবে।

ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ ও ইউনিভার্সেল নার্সিং কলেজ—এই দুটি চিকিৎসা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালনার অভিজ্ঞতায় আমি লক্ষ্য করেছি যে, অনেক বাবা-মায়ের দায়িত্বহীনতা ও শৈথিল্য তাদের সন্তানের স্বাভাবিক ছাত্রজীবনকে বাধাগ্রস্ত করছে। অনেক শিক্ষার্থী ক্লাসে অনুপস্থিত থাকে এবং পড়াশোনায় চরম অনাগ্রহ দেখায়। যখন কলেজ কর্তৃপক্ষ অভিভাবকদের সাথে যোগাযোগ করে, তখন অধিকাংশ ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়। এমনকি অনেক অভিভাবক সন্তানের অছাত্রসুলভ আচরণের পক্ষেই অবস্থান নেন। এই ধরনের আচরণ পেশাগত পরীক্ষার ফল বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়ায় এবং উজ্জ্বল ভবিষ্যতের পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়। আমরা যখন ছাত্র ছিলাম, তখন এমন ঘটনা কল্পনা করাও অসম্ভব ছিল। অভিভাবকেরা জানতে পারলে আমাদের রক্ষা ছিল না!

আমার বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইলে। সেখানে আমি গত ১৫ বছর ধরে আমার পিতার স্মৃতি রক্ষার্থে ‘আশুতোষ চক্রবর্ত্তী স্মারক শিক্ষাবৃত্তি’ প্রদান করে আসছি। স্থানীয় ১০ থেকে ১৫টি সেরা স্কুলের ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণির প্রথম স্থান অধিকারী শিক্ষার্থীদের মধ্য থেকে প্রতিবছর ১০০ জনকে এই বৃত্তি দেওয়া হয়। জাতীয় পর্যায়ের এই অনুষ্ঠানে একজন মন্ত্রী বা সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার উপস্থিতি থাকে এবং একটি স্মরণিকা প্রকাশিত হয়, যেখানে বৃত্তিপ্রাপ্তদের ছবি ও ফলাফলের বিবরণ থাকে।

দুঃখজনক হলেও সত্য যে, স্মরণিকা সম্পাদনা করতে গিয়ে আমি দেখেছি—কোনো কোনো স্কুলের প্রথম স্থান অধিকারী শিক্ষার্থীও জিপিএ-৫ পায়নি। এই তথ্যটি দেশের সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থার মান নিয়ে গভীর উদ্বেগের জন্ম দেয়। তাই রাষ্ট্রকে এই সংকটময় পরিস্থিতি গভীরভাবে উপলব্ধি করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।

আমার মনে হয়, শুধু রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলেই হবে না; সামাজিক ও পারিবারিক নজরদারি বাড়ানো এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এতদিন আমরা কেবল আইনশৃঙ্খলার অবনতি নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়েছি, কিন্তু সামাজিক অবক্ষয়, মানহীন শিক্ষা এবং নজরদারির অভাবের বিষয়টি এড়িয়ে গেছি। এই ক্রান্তিলগ্নে ২০২৬ সালের উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার ফল বিপর্যয় নতুন সংকটের জন্ম দিয়েছে। এর সাথে যুক্ত হতে পারে হতাশাজনিত আত্মহত্যার মতো ঘটনা, যা কখনোই কাম্য নয়।

তাই শুধু সরকারের ওপর নির্ভর না করে একটি সুশিক্ষিত সমাজ গড়তে প্রতিটি পরিবার ও অভিভাবককে এগিয়ে আসতে হবে। সন্তানের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের কথা ভেবে তাকে মানবিক মূল্যবোধে গড়ে তুলতে এবং পড়াশোনায় মনোযোগী করতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে—এটাই আমাদের প্রত্যাশা। কারণ, একটি সুন্দর বাংলাদেশ গড়তে হলে প্রয়োজন আলোকিত মানুষ, যারা আগামী দিনের বাংলাদেশ নির্মাণ করবে।

— ডা. আশীষ কুমার চক্রবর্ত্তী
ব্যবস্থাপনা পরিচালক
ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, ঢাকা এবং
ইউনিভার্সেল মেডিকেল সার্ভিসেস লিমিটেড, ব্রাহ্মণবাড়িয়া

*মতামত লেখকের নিজস্ব