প্রাণী পালন নিয়ে আমাদের সমাজে একটি কথা অত্যন্ত প্রচলিত যে—‘কুকুর পোষা পাপ, আর বিড়াল পোষা সুন্নত’। সাধারণ মানুষের মনে এই ধারণাটি এতটাই বদ্ধমূল হয়ে দাঁড়িয়েছে যে, অনেকেই কুকুরকে ঘৃণার চোখে দেখেন এবং অন্যদিকে বিড়ালকে পরম আদরে ঘরে স্থান দেন। তবে ইসলাম মূলত সব সৃষ্টির প্রতি দয়া ও সহমর্মিতার ধর্ম। প্রাণী পালনের ক্ষেত্রে ইসলামের সুস্পষ্ট এবং ভারসাম্যপূর্ণ কিছু নীতিমালা রয়েছে। প্রচলিত এই ধারণার ভিত্তি এবং কুকুর ও বিড়াল পালনের প্রকৃত ইসলামি বিধানটি নিচে বিস্তারিত বিশ্লেষণ করা হলো।

ইসলামি বিধান অনুযায়ী, বিনা প্রয়োজনে শুধু শখ করে বা আভিজাত্য প্রকাশ করতে ঘরের ভেতর কুকুর পোষা নিষিদ্ধ। এ বিষয়ে মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘যে ঘরে কুকুর বা প্রাণী ও মানুষের ছবি থাকে, সে ঘরে রহমতের ফেরেশতা প্রবেশ করেন না।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩২২৫)। এছাড়া হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, ‘যে ব্যক্তি শিকার করা বা গবাদিপশু পাহারা দেওয়ার উদ্দেশ্য ছাড়া কুকুর পোষে, তার আমল থেকে প্রতিদিন দুই ‘কিরাত’ পরিমাণ পুণ্য কমে যায়।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৫৭৫)। মূলত কুকুরের লালা অপবিত্র এবং এর মাধ্যমে বিভিন্ন রোগ ছড়ানোর ঝুঁকির কারণে ইসলাম একে মানুষের বাসস্থানে রাখতে নিরুৎসাহিত করেছে।

তবে ঘরে রাখা নিষিদ্ধ হওয়ার অর্থ এই নয় যে, কুকুরকে ঘৃণা করতে হবে বা অকারণে কষ্ট দিতে হবে। পিপাসার্ত কুকুরকে পানি পান করানোর কারণে এক পাপী নারীর বেহেশত লাভের বিখ্যাত ঘটনা হাদিসে বর্ণিত হয়েছে। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৩২১)। অর্থাৎ, সৃষ্টির অংশ হিসেবে কুকুরের প্রতি দয়া দেখানো সওয়াবের কাজ।

কুকুর পোষা মানেই পাপ—এই ঢালাও ধারণাটি সঠিক নয়। ইসলামে আত্মরক্ষা, ফসল পাহারা, গবাদিপশুর নিরাপত্তা, অপরাধী শনাক্ত করা এবং শিকারের মতো যৌক্তিক ও বিশেষ প্রয়োজনে কুকুর পোষার সুস্পষ্ট অনুমতি দেওয়া হয়েছে। পবিত্র কোরআনে শিকারি কুকুরের কথা সম্মানের সঙ্গে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘তোমরা যেসব শিকারি প্রাণীকে আল্লাহর দেওয়া জ্ঞান থেকে শিক্ষা দিয়ে শিকার করা শিখিয়েছ, তারা তোমাদের জন্য যা ধরে আনে, তা থেকে তোমরা খাও।’ (সুরা মায়িদা, আয়াত: ৪)। নিরাপত্তা, শিকার বা পাহারার মতো যৌক্তিক প্রয়োজনে কুকুর পালন করা ইসলামে সম্পূর্ণ বৈধ; তবে এসব ক্ষেত্রেও কুকুরকে মানুষের থাকার ঘরের বাইরে আলাদা স্থানে রাখতে হবে। (ইবনে আবিদিন, রদ্দুল মুহতার আলাদ দুররিল মুখতার, ৬/৩৮৭, দারুল ফিকর, বৈরুত, ১৯৯২)।

অন্যদিকে, বিড়াল পালনের অনুমতি থাকলেও এর প্রতি নিষ্ঠুরতা প্রদর্শন ইসলামে বড় অপরাধ। একটি বিড়ালকে আটকে রেখে অনাহারে মেরে ফেলার কারণে এক নারীর দোজখে যাওয়ার ঘটনা মহানবী (সা.) বর্ণনা করেছেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৪৮২)। বিড়াল একটি পরিষ্কার ও পরিচ্ছন্ন প্রাণী। নবীজির প্রিয় সাহাবি আবদুর রহমানের একটি বিড়ালছানা ছিল, যে কারণে তিনি তাঁকে আদর করে ‘আবু হোরাইরা’ বলে ডাকতেন। বিড়ালের এঁটো বা লালা অপবিত্র নয়। মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘বিড়াল অপবিত্র নয়; এরা তো তোমাদের আশপাশেই ঘোরাফেরা করে।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৭৫)।

তবে ‘বিড়াল পোষা সুন্নত’—এমন কথা কোথাও বলা হয়নি। ইসলামি ফিকহের পরিভাষায় বিড়াল পোষা একটি বৈধ বা ‘মোবাহ’ কাজ। ইমাম নববি লিখেছেন, বিড়াল পালন করা বৈধ এবং এটি পবিত্র প্রাণী; কেউ যদি বিড়াল পোষে এবং তাকে পর্যাপ্ত খাবার ও পানি দিয়ে দয়া প্রদর্শন করে, তবে সে এর বিনিময়ে সওয়াব লাভ করবে। (নববি, আল-মিনহাজ শারহু সহিহ মুসলিম, ৩/২১৩, দারুল ইহইয়াইত তুরাস আল-আরাবি, বৈরুত, ১৩৯২ হি.)। তবে একে ধর্মীয় ইবাদত বা ‘সুন্নত’ মনে করার কোনো ভিত্তি নেই। তাই শখ করে বিড়াল পুষলে তার খাবার, পানি ও চিকিৎসার সঠিক যত্ন নেওয়া মুমিনের ওপর আবশ্যক।

পরিশেষে বলা যায়, শখ করে ঘরের ভেতর কুকুর রাখা নিষেধ হলেও বিশেষ প্রয়োজনে বাইরে পালন করা বৈধ। অন্যদিকে বিড়াল পোষা বৈধ হলেও এটি সরাসরি কোনো সুন্নত নয়। ইসলাম প্রতিটি প্রাণীর অধিকার ও প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় মুমিনকে সচেতন হওয়ার শিক্ষা দেয়।