শারীরিক অসুস্থতার কারণে অনেক মানুষকে দীর্ঘমেয়াদে ক্যাথেটার ব্যবহার করতে হয়। এই প্রক্রিয়ায় মূত্রথলির সাথে সংযুক্ত একটি নলের মাধ্যমে প্রস্রাব সরাসরি ইউরিন ব্যাগে জমা হতে থাকে। এমন অবস্থায় ইবাদতের পবিত্রতা বজায় রাখা নিয়ে অনেকের মনেই নানা প্রশ্ন ও উদ্বেগ তৈরি হয়। বিশেষ করে “এ সময় অজু কীভাবে করবেন, ব্যাগে প্রস্রাব জমে থাকলে অজু হবে কি না, অজুর পর আবার প্রস্রাব ব্যাগে চলে গেলে অজু থাকবে কি না—এসব বিষয় নিয়ে অনেকে চিন্তিত থাকেন।”
ইসলামি শরিয়ত মানুষের সামর্থ্যের বাইরে কোনো কঠিন নিয়ম চাপিয়ে দেয় না। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ-তাআলা ঘোষণা করেছেন, ‘আল্লাহ তোমাদের জন্য সহজ করতে চান, কঠিন করতে চান না।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ১৮৫)। অনিয়ন্ত্রিতভাবে নাপাকি নির্গত হওয়ার সমস্যায় শরিয়তে বিশেষ ছাড় বা বিধান রাখা হয়েছে, যা ক্যাথেটার-নির্ভর রোগীদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে।
সাধারণত ক্যাথেটার ব্যবহারকারী রোগীরা শরিয়তের দৃষ্টিতে ‘অপারগ’ বা ‘মাজুর’ ব্যক্তির অন্তর্ভুক্ত। কারণ, যাদের প্রস্রাব স্বাভাবিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা থাকে না, তারাই এই চিকিৎসা পদ্ধতি গ্রহণ করেন। তবে হানাফি ফিকহ অনুযায়ী, মাজুর হওয়ার মানদণ্ড হলো—একটি পূর্ণ ফরজ নামাজের ওয়াক্ত এমনভাবে অতিবাহিত হওয়া, যাতে অজু করে ফরজ নামাজ পড়ার মতো অপবিত্রতামুক্ত সময়টুকুও পাওয়া না যায়। (রদ্দুল মুহতার আলা আদ-দুররিল মুখতার, ১/৫০৪, দারু আলামিল কুতুব, রিয়াদ, ২০০৩)।
মাজুর ব্যক্তির অজুর নিয়ম সাধারণ মানুষের চেয়ে কিছুটা ভিন্ন। তিনি নামাজের ওয়াক্ত শুরু হওয়ার পর অজু করবেন। উদাহরণস্বরূপ, জোহরের ওয়াক্ত শুরু হলে তিনি অজু করে জোহরের নামাজ পড়বেন। ওই একটি অজু দিয়েই তিনি ওই ওয়াক্তের ফরজ, সুন্নত, নফলসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় ইবাদত সম্পন্ন করতে পারবেন। এমনকি একই অজু দিয়ে ওই ওয়াক্তের একাধিক নামাজও পড়া যাবে। তবে যখন পরবর্তী ওয়াক্ত শুরু হবে, তখন পুনরায় নতুন করে অজু করতে হবে। যেমন, আসরের ওয়াক্ত শুরু হলে আসরের জন্য নতুন করে অজু করতে হবে। (রদ্দুল মুহতার আলা আদ-দুররিল মুখতার, ১/৫০৫ ও ৫০৭, দারু আলামিল কুতুব, রিয়াদ, ২০০৩)।
এই বিষয়ে একটি হাদিসের উল্লেখ পাওয়া যায়। ফাতিমা বিনতে আবি হোবাইশ (রা.) অনবরত রক্তস্রাবের সমস্যায় নবীজি (সা.)-এর কাছে নামাজের নিয়ম জানতে চান। রাসুল (সা.) তাঁকে নামাজ ছেড়ে দিতে বলেননি, বরং পবিত্র হয়ে নামাজ পড়ার নির্দেশ দেন। বর্ণনার শেষে এসেছে, ‘এরপর তুমি প্রত্যেক নামাজের জন্য অজু করবে, যতক্ষণ না পরবর্তী ওয়াক্ত আসে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২২৮)। এই হাদিসের আলোকে ফকিহগণ ধারাবাহিক ওজরগ্রস্ত ব্যক্তির জন্য প্রতি ওয়াক্তে নতুন অজুর বিধান দিয়েছেন।
সেই হিসেবে, ক্যাথেটার ব্যবহারকারী মাজুর ব্যক্তি অজু করার পর ওই ওয়াক্তের মধ্যে প্রস্রাব ব্যাগে জমা হলেও তাঁর অজু নষ্ট হবে না। কারণ যে সমস্যার জন্য তাঁকে মাজুরের মর্যাদা দেওয়া হয়েছে, শরিয়ত সেই নির্দিষ্ট ওজরের ব্যাপারে তাঁকে ছাড় দিয়েছে। তবে মনে রাখতে হবে, এই ছাড় কেবল ক্যাথেটারের মাধ্যমে প্রস্রাব বের হওয়ার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। অন্য কোনো কারণে (যেমন: মলত্যাগ, বায়ু নির্গমন বা ঘুম) অজু ভেঙে গেলে পুনরায় অজু করতে হবে। (রদ্দুল মুহতার আলা আদ-দুররিল মুখতার, ১/৫০৭, দারু আলামিল কুতুব, রিয়াদ, ২০০৩)।
নামাজের আগে ইউরিন ব্যাগে প্রস্রাব জমে থাকলে, তা খালি করা সম্ভব হলে এবং এতে রোগীর কোনো কষ্ট বা চিকিৎসাগত সমস্যা না হলে খালি করে নেওয়া উচিত। হানাফি ফিকহ অনুযায়ী, ওজরগ্রস্ত ব্যক্তির ক্ষেত্রেও সামর্থ্য থাকলে নাপাকি কমানো বা অপসারণের চেষ্টা করা উচিত। তবে ব্যাগ খালি করতে গিয়ে যদি ক্যাথেটার খুলে যাওয়ার ভয় থাকে, ব্যথা হয়, চিকিৎসকের নির্দেশের পরিপন্থী হয় কিংবা শারীরিক ক্ষতির আশঙ্কা থাকে, তবে কেবল নামাজের জন্য ব্যাগ বা ক্যাথেটার খোলার প্রয়োজন নেই। এটি চিকিৎসার অংশ হিসেবে গণ্য হবে। তাই শরীর ও ব্যাগে প্রস্রাব থাকা অবস্থায় নামাজ পড়া বৈধ। এমনকি ব্যাগটি যদি সুরক্ষিতভাবে আবৃত থাকে এবং মসজিদ অপবিত্র হওয়ার কোনো ঝুঁকি না থাকে, তবে শুধু ব্যাগে প্রস্রাব থাকার কারণে তাঁকে মসজিদে প্রবেশে বাধা দেওয়া হবে না। (ইবনে নুজাইম মিসরি, আল-বাহরুর রায়িক শারহ কানজ আদ-দাকায়িক, ১/৩৭৪, দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ, বৈরুত, ১৯৯৭)।
এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করা প্রয়োজন যে, ইউরিন ব্যাগে প্রস্রাব জমা হওয়া আর প্রস্রাব বাইরে লিক হয়ে শরীর বা পোশাকে লাগা এক বিষয় নয়। যদি প্রস্রাব বাইরে লিক হয়, তবে সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী তা পরিষ্কার করতে হবে। রোগীর সাধ্যমতো ক্যাথেটার ও ব্যাগ এমনভাবে রাখতে হবে যাতে অপ্রয়োজনে প্রস্রাব ছড়িয়ে না পড়ে। তবে মাজুর ব্যক্তির ক্ষেত্রে যদি লিকেজ এমন পর্যায়ে হয় যে, পরিষ্কার করার পর খুব দ্রুতই পুনরায় পোশাক নাপাক হয়ে যায় এবং প্রতিবার ধোয়া কষ্টকর হয়ে পড়ে, তবে প্রতি নামাজের আগে কাপড় ধোয়া বা পরিবর্তন করা আবশ্যক নয়। (ইবনে নুজাইম মিসরি, আল-বাহরুর রায়িক শারহ কানজ আদ-দাকায়িক, ১/৩৭৪, দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ, বৈরুত, ১৯৯৭)।
—তথ্যসূত্র: ফয়জুল্লাহ রিয়াদ, শিক্ষক, জামিয়া আরাবিয়া দারুস সুন্নাহ রাজাবাড়ী, ঢাকা।