মুসলিম সমাজে একটি দৃশ্য অত্যন্ত পরিচিত—কেউ যদি পশ্চিম দিকে পা ছড়িয়ে বসলে বা ঘুমালে বয়োজ্যেষ্ঠরা দ্রুত তাকে সতর্ক করেন। বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর ভৌগোলিক অবস্থান অনুযায়ী পবিত্র কাবা শরিফ বা কিবলা পশ্চিম দিকে অবস্থিত হওয়ায়, এই দিকের প্রতি সাধারণ মানুষের মনে গভীর শ্রদ্ধা ও সম্মান কাজ করে। তবে এই সামাজিক রীতির কারণে অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগে, পশ্চিম দিকে পা দেওয়া কি সত্যিই কোনো বড় পাপ কিংবা ইসলামে এটি কি সম্পূর্ণ হারাম হিসেবে গণ্য?
ইসলামি বিশ্বাস অনুযায়ী পবিত্র কাবা বা কিবলার মর্যাদা অপরিসীম। মুমিনরা প্রতিদিন পাঁচবার এই দিকে মুখ করে মহান প্রভুর দরবারে সেজদা করেন। ইসলামের একটি মৌলিক নীতিমালা হলো, ইসলামের যেকোনো পবিত্র বস্তুকে সম্মান করা ইমানের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এই বিষয়ে আল্লাহ তাআলা কোরআনে ঘোষণা করেছেন, ‘আর কেউ আল্লাহর নিদর্শনসমূহের সম্মান করলে তা তো তার হৃদয়ের তাকওয়া থেকেই উৎসারিত।’ (সুরা হজ, আয়াত: ৩২)। এই আয়াতের আলোকে ফকিহ বা ইসলামি আইনবিদগণ একমত যে, কাবা শরিফের দিককে সম্মান করা একজন মুমিনের আত্মিক দায়িত্ব।
তবে কোরআন বা হাদিসে সরাসরি এমন কোনো কথা উল্লেখ নেই যে, কিবলার দিকে পা দেওয়া হারাম বা মহাপাপ। তবে মহানবী (সা.) কিবলার সম্মান রক্ষার্থে মলমূত্র ত্যাগের সময় সেদিকে মুখ বা পিঠ দিতে নিষেধ করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘তোমরা যখন মলমূত্র ত্যাগ করতে যাও, তখন শুধুার দিকে মুখ বা পিঠ করে বসবে না..।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৯৪)। এই হাদিসের অন্তর্নিহিত শিক্ষার ওপর ভিত্তি করে ইসলামি আইনবিশারদেরা বিনা প্রয়োজনে কিবলার দিকে পা ছড়িয়ে বসাকে ‘মাকরুহ’ বা অপছন্দনীয় হিসেবে সাব্যস্ত করেছেন।
ইমাম ইবনে আবিদিন তাঁর লেখায় উল্লেখ করেছেন, পবিত্র কোরআন, কাবা শরিফ বা কেবলার দিকে ইচ্ছাকৃতভাবে পা ছড়িয়ে দেওয়া মাকরুহ; কারণ এটি আদবের পরিপন্থী এবং এতে পবিত্র নিদর্শনের প্রতি একধরনের অবজ্ঞা প্রকাশ পায়। (ইবনে আবিদিন, রদ্দুল মুহতার আলাদ দুররিল মুখতার, ১/৬৫৫, দারুল ফিকর, বৈরুত, ১৯৯২)।
তবে বিশেষ পরিস্থিতির কথা বিবেচনা করা হয়েছে ইসলামে। যদি কোনো ব্যক্তি অসুস্থ হন এবং পশ্চিম দিক ছাড়া অন্য কোনো দিকে পা ছড়িয়ে বসা বা ঘুমানো তাঁর জন্য কষ্টদায়ক হয়, তবে তাঁর জন্য কোনো পাপ নেই। এমনকি অসুস্থ অবস্থায় দাঁড়িয়ে বা বসে নামাজ পড়তে অক্ষম ব্যক্তির জন্য কেবলামুখী হয়ে শুয়ে ইশারায় নামাজ পড়ার বিধান রয়েছে, যেখানে তাঁর পা কেবলার দিকেই থাকে। আল্লাহ বলেন, ‘আল্লাহ কারও ওপর তার সাধ্যাতীত কোনো কাজের ভার চাপিয়ে দেন না।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ২৮৬)। এছাড়া জায়গার স্বল্পতা বা নিরুপায় হয়ে যদি কাউকে পশ্চিম দিকে পা দিয়ে ঘুমাতে হয়, তবে ইসলামে তা পুরোপুরি মার্জনীয়।
ইসলামি আইন অনুযায়ী, যা ‘মাকরুহ’ বা শুধু অপছন্দনীয়, তাকে মানুষের ওপর ‘হারাম’ বা নিষিদ্ধ বস্তুর মতো চাপিয়ে দেওয়া ধর্মে সীমালঙ্ঘনের শামিল। এমন কঠোরতা সাধারণ মানুষকে ধর্মের প্রতি বীতশ্রদ্ধ করে তুলতে পারে। অনেক সময় মানুষ ঘুমের ঘোরে অবচেতনভাবেই পশ্চিম দিকে পা দিয়ে ফেলে। ইসলামি আইনে অনিচ্ছাকৃত কোনো কাজের জন্য মানুষকে দায়ী করা হয় না। কোরআনের সুস্পষ্ট ঘোষণা হলো, ‘তোমরা ভুলবশত যা করো, তাতে তোমাদের কোনো অপরাধ নেই; কিন্তু তোমাদের অন্তর যা সংকল্প করে (তা অপরাধ)।’ (সুরা আহজাব, আয়াত: ৫)। তাই কেউ যদি ঘুম থেকে উঠে দেখেন যে তাঁর পা পশ্চিম দিকে চলে গেছে, তবে এতে নিজেকে পাপী ভাবার কোনো কারণ নেই।
আমাদের সমাজে পশ্চিম দিকে পা দেওয়াকে অনেক সময় এত বড় অপরাধ হিসেবে দেখা হয় যে, বয়োজ্যেষ্ঠরা ছোটদের বকাঝকা করেন। এটি ইসলামের ভারসাম্যপূর্ণ আচরণের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। কিবলার সম্মান রক্ষা করা অবশ্যই একটি মহৎ ‘আদব’, তবে এটি এমন কোনো বিষয় নয় যার জন্য কাউকে দোজখের ভয় দেখাতে হবে। ইমাম শাতিবি সতর্ক করে লিখেছেন, ইসলামে যা ‘মাকরুহ’ বা শুধু অপছন্দনীয়, তাকে মানুষের ওপর ‘হারাম’ বা নিষিদ্ধ বস্তুর মতো চাপিয়ে দেওয়া ধর্মে সীমালঙ্ঘনের শামিল, যা সাধারণ মানুষকে ধর্মের প্রতি বীতশ্রদ্ধ করে তোলে। (আশ-শাতিবি, আল-মাওয়াফাকাত ফি উসুলিশ শারিয়াহ, ২/৩১২, দার ইবনি আফফান, সৌদি আরব, ১৯৯৭)।
পরিশেষে বলা যায়, বিনা প্রয়োজনে, ইচ্ছাকৃতভাবে ও তাচ্ছিল্যভরে কিবলার দিকে পা ছড়িয়ে বসা মুমিনের আদব নয়; এটি মাকরুহ। সম্মান ও ভালোবাসার জায়গা থেকে পশ্চিম দিকে পা দেওয়া থেকে বিরত থাকাই ইমানের দাবি। তবে অসুস্থতা, স্থানসংকুলান না হওয়া বা অনিচ্ছাকৃত ভুলের কারণে পা সেদিকে চলে গেলে তা কোনোভাবেই পাপ নয়।