‘কাবার ছায়ায় নবীজির দাদা আবদুল মুত্তালিবের জন্য বিশেষ একটি আসন বিছানো থাকত। তাঁর সম্মানার্থে তাঁর কোনো সন্তান এ আসনে বসতেন না। মহানবী (সা.) এসে সে আসনেই বসতেন।’ (হাকিম নিশাপুরি, আল-মুসতাদরাক আলাস সহিহাইন, ২/৬০৬, দারুল কুতুব আল-ইলমিয়া, বৈরুত, ১৯৯০)

মায়ের মৃত্যুর পর মক্কায় ফিরে ছোট্ট মুহাম্মদ (সা.) চলে এলেন দাদার স্নেহতলে। দাদার সাহচর্যে তিনি আশ্রয় পেলেন কাবার ছায়ায়। অতি ছোটকালে যখন সবে জন্ম হয়েছে, তখনো দাদা একবার তাঁকে নিয়ে একেবারে কাবার ভেতরে প্রবেশ করেছিলেন।

এখন নিয়মিত দাদার গৃহ ও কাবার আঙিনাই হয়ে উঠল তাঁর নিকেতন। বাবা ছিলেন না, মাও নেই আর। এতিম মুহাম্মদ। তবে তিনি রয়েছেন কাবার সান্নিধ্য ও প্রতিপালকের অতি নিকটে।

আল্লাহ যেন এই অবস্থাকেই নবীজি (সা.)-কে একবার স্মরণ করিয়ে দিয়েছিলেন, ‘তিনি কি আপনাকে এতিম অবস্থায় পাননি? অতঃপর তিনি আশ্রয় দিয়েছেন।’ (সুরা দোহা, আয়াত: ৬)

আবদুল মুত্তালিব নবীজিকে সার্বক্ষণিক নিজের সঙ্গে রাখতেন। তিনি যখন ঘুমাতেন, তখন সেখানে কাউকে প্রবেশ করতে দিতেন না। নিজে কখনো নবীজিকে পাশে ছাড়া ঘুমাতেন না; ঘর থেকে নবীজিকে ছাড়া বের হতেন না

এই আয়াতের সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা হলো, আপনার জন্মের আগেই পিতার মৃত্যু হয় এবং ছোট থাকতেই মা মারা যান। অতঃপর আমি আপনাকে আশ্রয় দিয়েছি। প্রথমে পিতামহ আবদুল মুত্তালিব ও পরবর্তীকালে পিতৃব্য আবু তালিব যত্নসহকারে আপনাকে লালন-পালন করেছেন। (ইবনে সালিহ আল-উসাইমিন, তাফসিরুল উসাইমিন, পৃষ্ঠা ৪৫০)

আল্লাহর আশ্রয়ের বাস্তব রূপ ছিল এই যে আবদুল মুত্তালিব নবীজিকে সার্বক্ষণিক নিজের সঙ্গে রাখতেন। তিনি যখন ঘুমাতেন, তখন সেখানে কাউকে প্রবেশ করতে দিতেন না।

নিজে কখনো নবীজিকে পাশে ছাড়া ঘুমাতেন না; ঘর থেকে নবীজিকে ছাড়া বের হতেন না; তাঁর একটি বৈঠকখানা ছিল, যাতে নবীজি (সা.) ছাড়া কাউকে বসতেন দিতেন না।

ইবনে ইসহাক বলেন, ‘মহানবী (সা.) তাঁর দাদা আবদুল মুত্তালিবের সঙ্গেই ছিলেন। আব্বাস ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে মাবাদ তাঁর পারিবারিক সূত্রে বর্ণনা করেন, কাবার ছায়ায় নবীজির দাদা আবদুল মুত্তালিবের জন্য বিশেষ একটি আসন বিছানো থাকত। তাঁর সম্মানার্থে তাঁর কোনো সন্তান এ আসনে বসতেন না।

‘নবীজি সেখানে এসে সে আসনেই বসতেন। তাঁর চাচারা তাঁর হাত ধরে তাঁকে সেই আসন থেকে নামিয়ে দিতে যেতেন; কিন্তু তাঁর দাদা আবদুল মুত্তালিব বলতেন, “আমার এই বৎসকে ছেড়ে দাও!”

‘অতঃপর তাঁর পিঠে পরশ বুলিয়ে বলতেন, “আমার এই সন্তানটির উচ্চ মর্যাদা রয়েছে।” এরপর আবদুল মুত্তালিব ইন্তেকাল করেন। তখন নবীজি (সা.) আট বছরের কিশোর—হস্তিবর্ষেরও আট বছর পর। (ইবনে হিশাম, আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যা, ১/১৬২-১৬৪, দারুল কুতুব আল-ইলমিয়া, বৈরুত, ২০০১)

আবদুল মুত্তালিব ইবনে হাশিমের একটি উট হারিয়ে গিয়েছে। ফলে তিনি তাঁর নাতিকে সেটির খোঁজে পাঠিয়েছেন। সে এখনো ফিরে আসেনি। এ যাবৎ তিনি তাকে যে কাজেই পাঠিয়েছেন, সে সব সময় ওই কাজ সম্পন্ন করেই ফিরেছে।

দাদার সঙ্গে নবীজির (সা.) জীবন কেমন করে এবং কোথায় কেটেছে? নবী-জীবনে এ সময়কার অভিজ্ঞতা কেমন ছিল? কিনদির ইবনে সাইদ তাঁর পিতার সূত্রে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন, জাহিলি যুগে আমি হজ সম্পাদন করেছিলাম। তখন দেখলাম এক ব্যক্তি কাবার চারদিকে তাওয়াফ করছে এবং স্বতঃস্ফূর্তভাবে আবৃত্তি করছে—

‘হে রব, আমার অশ্বারোহী মুহাম্মদকে ফিরিয়ে দাও,

তাকে আমার কাছে ফিরিয়ে দাও এবং আমার একটি হাতে পরিণত করো।’

আমি বললাম, ইনি কার কথা বলছেন? এক ব্যক্তি বলল, ‘আবদুল মুত্তালিব ইবনে হাশিমের একটি উট হারিয়ে গিয়েছে। ফলে তিনি তাঁর নাতিকে সেটির খোঁজে পাঠিয়েছেন। সে এখনো ফিরে আসেনি। এ যাবৎ তিনি তাকে যে কাজেই পাঠিয়েছেন, সে সব সময় ওই কাজ সম্পন্ন করেই ফিরেছে।’

এ কথা বলতে না বলতেই নবীজি (সা.) উট নিয়ে হাজির!। তখন আবদুল মুত্তালিব বলে উঠলেন, ‘নাতি আমার, আমি তোমার জন্য নারীদের ন্যায় দুশ্চিন্তায় পড়ে গিয়েছিলাম; এমন এক দুশ্চিন্তা, যা আমাদের কাছ থেকে কখনো দূর হওয়ার নয়।’ (আত-তবারানি, আল-মুজামুল কাবির, ৫/৫২৪, মাকতাবাতুজ জাহরা, মসুল, ১৯৮৩)

নবীজির বয়স যখন আট বছর দুই মাস দশ দিন, তখন তাঁর দাদা আবদুল মুত্তালিব ইন্তেকাল করেন। এই দুঃখ-শোকের মুহূর্তে বেদনার বোঝা লাঘব করতে এগিয়ে এলেন চাচা আবু তালিব।

হৃষ্টচিত্তে তিনি আপন কাঁধে তুলে নিলেন বালক মুহাম্মদের (সা.) লালন-পালনের সব দায়িত্ব। বৃদ্ধ আবদুল মুত্তালিব মৃত্যুর আগে আবু তালিবকেই সেই ওসিয়ত করে গিয়েছিলেন। (ইবনে হিশাম, আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যা, ১/১৪৯)

চাচার সঙ্গে নবীজির (সা.) জীবনের স্মৃতি অগণিত। তবু নবী-জীবনের কিশোর বয়সের একটি বিশেষ অভিজ্ঞতা উল্লেখ করা আবশ্যক।

ইবনে আসাকির, জালহুমাহ ইবনে উরফুতাহ থেকে বর্ণনা করেছেন, ‘আমি একবার মক্কায় আগমন করলাম। দুর্ভিক্ষের কারণে মানুষ তখন নাজেহাল ও সংকটাপন্ন অবস্থায় নিপতিত ছিল। কোরাইশরা আবু তালিবের কাছে এসে বললেন, “হে আবু তালিব, আরববাসীরা দুর্ভিক্ষজনিত আকালের সম্মুখীন হয়েছেন। চলুন, সবাই মিলে বৃষ্টির জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করি।”

‘এ কথা শুনে আবু তালিব এক বালককে সঙ্গে নিয়ে বের হলেন। ওই বালককে আকাশে মেঘাচ্ছন্ন এমন এক সূর্য বলে মনে হচ্ছিল, যা থেকে ঘন মেঘমালা যেন এখনই আলাদা হয়ে গেল। সেই বালকের আশপাশে আরও অন্যান্য বালকও ছিল, কিন্তু এই বালকটির মুখমণ্ডল থেকে এক বিশেষ জ্যোতি ছড়িয়ে পড়ছিল।

‘আবু তালিব সে বালককে হাত ধরে কাবাগৃহের নিকট নিয়ে গেলেন এবং কাবার দেয়ালের সঙ্গে তাঁর পিঠ লাগিয়ে তাঁকে দাঁড়িয়ে থাকতে বললেন। বালক তাঁর চাচার হাতের আঙুল ধরে দাঁড়িয়ে থাকলেন। সে সময় আকাশে এক টুকরা মেঘও ছিল না।

‘কিছুক্ষণের মধ্যেই মেঘে মেঘে আকাশ ছেয়ে গিয়ে আঁধার ঘনিয়ে এল এবং মুষলধারে বৃষ্টিপাত শুরু হলো। বৃষ্টিপাতের পরিমাণ এত বেশি হলো যে উপত্যকায় প্লাবনের সৃষ্টি হয়ে গেল এবং এর ফলে শহর ও মরু অঞ্চল পুনরায় সতেজ-সজীব হয়ে উঠল।’ (আবদুল্লাহ ইবনে মুহাম্মদ, মুখতাসারুস সিরাহ, পৃষ্ঠা ১৫-১৬)

এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে আবু তালিব বালক নবীজির (সা.) প্রশংসায় যে কবিতা পাঠ করেছিলেন, তার মূল অংশটি হলো, ‘তিনি সৌন্দর্যমণ্ডিত। তাঁর চেহারা মোবারক দ্বারা রহমতের বৃষ্টি অন্বেষণ করা হয়ে থাকে; তিনি এতিমদের আশ্রয়স্থল এবং স্বামীহারাদের রক্ষক।’

ইবনে কাসির (র.) আবু তালিবের পঠিত দীর্ঘ কবিতাকে বহুশ্রুত সাবআ মুআল্লাকা র কবিতাসমূহের চাইতেও অধিক উত্তম ও সারগর্ভ বলে মত প্রকাশ করেছেন।

অবশ্য আবু তালিব এই শ্লোক পাঠ করেছিলেন নবীজির নবুয়ত লাভের পর কোরাইশদের হুমকির সময়। এর মাধ্যমে তিনি মক্কার নেতাদের তাঁর প্রতি আকৃষ্ট করতে চেয়েছিলেন এবং বলতে চেয়েছিলেন যে কোনো অবস্থাতেই তিনি মুহাম্মদকে তাঁদের দাবি অনুযায়ী তাঁদের হাতে ছেড়ে দেবেন না। (ইবনে হিশাম, আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যা, ১/২৭২-২৮০)

নবীজি (সা.) মদিনায় গিয়ে অনাবৃষ্টির সময় মানুষের অনুরোধে জুমার খুতবায় মিম্বরে দাঁড়িয়ে বৃষ্টি প্রার্থনা করেছেন এবং সেই বৃষ্টিতে মদিনা সিক্ত হয়েছে। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১০২১, ১০২৯)

নবীজির বৃষ্টি প্রার্থনার সময় আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) আবু তালিবের পঠিত ওপরের কবিতার লাইনটি পাঠ করতেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১০০৮)

ইবনে কাসির (র.) আবু তালিবের পঠিত দীর্ঘ কবিতাকে বহুশ্রুত সাবআ মুআল্লাকা র কবিতাসমূহের চাইতেও অধিক উত্তম ও সারগর্ভ বলে মত প্রকাশ করেছেন। (ইবনে কাসির, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৩/৫৭, দারুল ফিকর, বৈরুত, ১৯৮৬)

সেই হাদিসে নবীজির একটি কথা থেকে বাল্যকালে কাবার দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে বৃষ্টি প্রার্থনার স্মৃতি অটুট থাকার প্রমাণ মেলে। তিনি বলেন, ‘যদি আজ আবু তালিব বেঁচে থাকতেন, তবে তাঁর দুটি চোখ শীতল হয়ে যেত।’ অতঃপর তিনি বলেন, ‘কে আমাদের তাঁর সেই কথাগুলো শোনাবেন?’

তখন আলী (রা.) দাঁড়িয়ে বলেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল, সম্ভবত আপনি তাঁর কবিতার সেই কথা বলছেন, যেখানে তিনি বলেছেন, “তিনি সৌন্দর্যমণ্ডিত। তাঁর চেহারা মোবারক দ্বারা রহমতের বৃষ্টি অন্বেষণ করা হয়ে থাকে; তিনি ইয়াতিমদের আশ্রয়স্থল এবং স্বামীহারাদের রক্ষক।”’ (বাইহাকি, দালায়িলুন নুবুয়ত, পৃষ্ঠা ২৩৮)