ইসলামি শরিয়তে কোনো খাদ্যের হালাল বা হারাম হওয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত কেবল মহান আল্লাহর হাতে ন্যস্ত। মুসলমানদের জন্য যেসব প্রাণীর মাংস খাওয়া বৈধ করা হয়েছে, গরু তার মধ্যে অন্যতম। তবে একটি হাদিস বেশ প্রচলিত যেখানে মহানবী (সা.) গরুর মাংস খেতে নিরুৎসাহিত করেছেন অথবা একে ‘রোগ’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। এই বিষয়টি সামনে আসায় অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগে যে, গরুর মাংস যদি ধর্মীয়ভাবে হালাল হয়, তবে নবীজি (সা.) কেন এমন কথা বললেন? নিচে এই বিষয়ের বিস্তারিত বিশ্লেষণ তুলে ধরা হলো।
প্রথমত, গরুর মাংস খাওয়া যে ধর্মীয়ভাবে সম্পূর্ণ হালাল, এ বিষয়ে ইসলামি আইনশাস্ত্রের বিশেষজ্ঞ বা ফকিহদের মধ্যে কোনো দ্বিমত নেই। পবিত্র কোরআনের সুরা বাকারার নামকরণের ইতিহাস এবং কোরবানির পশুর বিষয়ে আলোচনার ক্ষেত্রে গরুর কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া মহানবী (সা.) বিদায় হজের সময় তাঁর স্ত্রীদের পক্ষ থেকে গরু কোরবানি দিয়েছেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৭০৯)। সুতরাং, ইসলামে গরুর মাংসকে হারাম বা নিষিদ্ধ মনে করার কোনো সুযোগ নেই।
তবে মাংস হালাল হওয়া সত্ত্বেও স্বাস্থ্যগত দিক বিবেচনা করে নবীজির একটি হাদিস বর্ণিত হয়েছে। তিনি বলেছেন, ‘তোমরা গরুর দুধ পান করো এবং এর মাখন (ঘি) ব্যবহার করো; কারণ এর দুধে রয়েছে প্রতিষেধক এবং মাখনে রয়েছে আরোগ্য। তবে এর মাংস থেকে বেঁচে থাকো, কারণ এর মাংসে রয়েছে রোগ।’ (আল-মুসতাদরাক আলাস সহিহাইন, হাদিস: ৮২২৫)।
এই হাদিসের সত্যতা ও সনদ নিয়ে প্রাচীন মুহাদ্দিসদের মধ্যে কিছুটা মতভেদ থাকলেও নাসিরুদ্দিন আলবানিসহ অনেক মুহাদ্দিস এটিকে হাসান বা সহিহ অর্থাৎ গ্রহণযোগ্য বলে মত দিয়েছেন। হাদিস বিশেষজ্ঞ ও ফকিহদের মতে, এই বক্তব্যের অর্থ এই নয় যে গরুর মাংস নিষিদ্ধ করা হয়েছে; বরং এটি একটি স্বাস্থ্যগত নির্দেশনা বা তিব্বে নববি। আরবের প্রচণ্ড উষ্ণ আবহাওয়া এবং তৎকালীন সময়ের শারীরিক পরিশ্রমের ধরন অনুযায়ী অতিরিক্ত গরুর মাংস খাওয়া স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর ছিল। (আব্দুর রউফ আল-মুনাভি, ফাইজুল কাদির শারহুল জামিউস সগির , ৩/২৫০, আল-মাকতবাতুত তিজারিয়্যাহ আল-কুবরা, মিসর)।
ইমাম তিরমিজি এই বিষয়ে লিখেছেন, “উদ্ভিদের মধ্যে থাকা ক্ষতিকর উপাদানগুলো পশুর মাংসের মধ্যে বেশি জমা হয় (যেহেতু মাংস সরাসরি শরীরের ভারী টিস্যু গঠন করে), যা মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। সেই গাছপালার নির্যাস ও সার পরিশোধিত হয়ে যখন দুধে বা ঘিয়ে রূপ নেয়, তখন তা অনেক বেশি পুষ্টিকর, বিশুদ্ধ এবং মানবদেহের জন্য নিয়ামক হিসেবে কাজ করে।” (আত–তিরমিজি, নাওয়াদিরুল উসুল ফি মারিফাতি আহাদিসির রাসুল, পৃষ্ঠা ২৬৪, দারুল জিল, বৈরুত)।
অন্যদিকে ইবনুল কাইয়িম লিখেছেন, “গরুর মাংস ঠাণ্ডা ও শুষ্ক, হজম করতে কষ্টকর, ধীরে হজম হয় এবং তা কালো রক্ত উৎপন্ন করে; এটি শুধু কঠোর পরিশ্রমী মানুষের জন্যই উপযোগী। যারা নিয়মিত এটি খান বা এর ক্ষতিকর প্রভাব এড়াতে চান, তারা যদি এর সাথে গোলমরিচ, রসুন, দারুচিনি বা আদার মতো গরম মসলা ব্যবহার করেন, তবে এর ক্ষতি থেকে রক্ষা পাওয়া যায়।” (ইবনুল কাইয়িম, জাদুল মাআদ, ৪/৩২৪, মুয়াসসাসাতুর রিসালাহ, বৈরুত, ১৯৯৮)।
আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানও এই ধারণাকে সমর্থন করে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার রিপোর্ট অনুযায়ী, অতিরিক্ত রেড মিট বা লাল মাংস হৃদ্রোগ, উচ্চ রক্তচাপ ও ক্যানসারের মতো মারাত্মক রোগের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। (আইএআরসি, রেড মিট অ্যান্ড প্রসেস্ড মিট, খ. ১১৪, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, লিয়ন, ফ্রান্স, ২০১৮)।
ইসলামের মূলনীতি অনুযায়ী, কোনো হালাল খাবার যদি নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তির জন্য ক্ষতিকর প্রমাণিত হয় বা চিকিৎসকেরা তা নিষেধ করেন, তবে তার জন্য তা পরিহার করাই ইসলামের দাবি, যদিও তা সাধারণভাবে সবার জন্য হালাল। (ইবনে আবিদিন, রদ্দুল মুহতার আলাদ দুররিল মুখতার, ৬/৩৪০, দারুল ফিকর, বৈরুত, ১৯৯২)।
মহানবী (সা.) সাধারণত দুম্বা বা ছাগলের মাংস বেশি পছন্দ করতেন। তবে এর অর্থ এই নয় যে তিনি গরুর মাংসকে খাদ্যতালিকা থেকে পুরোপুরি বাদ দিয়েছেন। বরং ইসলাম আমাদের পরিমিতিবোধ শেখায়। আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন, ‘তোমরা আহার করো ও পান করো; কিন্তু অপচয় বা সীমালঙ্ঘন কোরো না।’ (সুরা আরাফ, আয়াত: ৩১)।
পরিশেষে বলা যায়, হালাল বস্তু খাওয়া যাবে, তবে তা যেন শরীরের ক্ষতির কারণ না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখাই হলো সুন্নত। গরুর মাংস ধর্মীয়ভাবে সম্পূর্ণ হালাল এবং উৎসব বা কোরবানিতে এটি খাওয়া আনন্দের অংশ। তবে দৈনন্দিন খাদ্যাভ্যাসে অতিরিক্ত গরুর মাংস পরিহার করে পরিমিতিবোধ বজায় রাখা এবং গরুর দুধ ও ঘিয়ের প্রতি বেশি গুরুত্ব দেওয়াই নবীজির বক্তব্যের মূল উদ্দেশ্য। হালালকে হারাম না বানিয়ে স্বাস্থ্যের প্রতি সচেতন হওয়াই একজন মুমিনের প্রকৃত কাজ।